“তোমার দুঃখের পাশে বসে আছি”— কবি শঙ্খ ঘোষ

সদ্য কয়েকদিন আগে আমরা হারিয়েছি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি শঙ্খ ঘোষকে। প্রয়াত এই কবির স্মরণে পারমিতা চক্রবর্তী ভট্টাচার্য্য

‘হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়/সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়/এ কথা খুব সহজ, কিন্তু কে না জানে/সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়’।
সহজ হয়েও আসলে সত্যিই যে সহজ নয়, এমন কাব্য করে লিখে যাওয়া তাঁর কিছু কিছু লেখা আজ প্রবাদে পরিণত।তেমন ভাবেই তাঁর সৃষ্টি আর একটি বাক্য বন্ধনে দেখি—
‘মাঝে মাঝে শুধু খসে পড়ে মাথা/কিছু-বা পুরনো কিছু-বা তরুণ/হাঁক দিয়ে বলে কনডাকটর/পিছনের দিকে এগিয়ে চলুন’।
এক গভীর জীবনদর্শনের চেতনা থেকে এমন কথা বলা যায়, কন্ডাকটরের মুখে বসানো এই সামান্য একটি অতি পরিচিত কথা কাব্যিক পরিবেশনায় সমসাময়িক দুঃসময়ের, সামাজিক ও রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থার ইঙ্গিতবহ হয়ে দাঁড়ায় । মাঝে মাঝে চলার পথে প্রতিনিয়ত কিছু প্রাণ যায় অকালেই, তার কারণ তো সবসময় স্বাভাবিক নয়, সভ্যতার অগ্রগতির মুখে প্রশ্ন চিন্হ ফেলে যাওয়া এক অতি বাস্তব নির্মম জগৎ আজ উপস্থিত, তাই কন্ডাকটরের মুখ দিয়ে কবি বুঝিয়ে দেন, এগিয়ে চলা আজ প্রকৃত অগ্রগতি নয় বরং পিছনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। 
জীবনানন্দ পরবর্তী সময়ে বাংলা আধুনিক কবিতা জগতের পঞ্চপান্ডব বলা হয় যে পাঁচ জন স্বনামধণ্য কবি লেখকদের সেই শক্তি-সুনীল-শঙ্খ-উৎপল-বিনয় এর চারজন চলে গিয়েছিলেন আগেই। গত ২১ শে এপ্রিল সেই পঞ্চপান্ডবের শেষ জন, কবি শঙ্খ ঘোষ চলে গেলেন ৮৯ বছর বয়সে।
রবীন্দ্র পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার(২০১৬), সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার, সরস্বতী পুরস্কার ও পদ্মভূষণ পুরস্কার(২০১১) প্রাপ্ত কবি শঙ্খ ঘোষের জন্ম ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী অধুনা বাংলাদেশের চাঁদপুরে। আসল নাম যদিও ছিল চিত্তপ্ৰিয় ঘোষ তবু পরিচিত ছিলেন ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন তাঁর ডাকনাম (শঙ্খ ঘোষ)দিয়েই। কবিতা লেখার পাশাপাশি তিনি একাধারে কাব্য সমালোচক ও অন্যদিকে রবীন্দ্র গবেষকও।
১৯৫১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে সন্মানিক স্নাতকতা ও ১৯৫৪য় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়ে পাশ করেন। পেশাগত ভাবে যুক্ত ছিলেন অধ্যাপনার কাজে। সুদীর্ঘ কর্মজগতে কখনো তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবাসী কলেজ, সিটি কলেজে আবার কখনো যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কখনো আবার তিনি শিক্ষকতা করেছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার কখনও সিমলার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিসেও। কর্মজীবনের অবসর গ্রহণ করেন তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই।
অধ্যাপনার পাশাপাশি চলেছে তার কলমও। লেখার শুরু সেই কলেজ জীবন থেকেই, প্রথম কাব্যগ্রন্থ ছিল ১৯৫৬ তে প্রকাশিত “দিনগুলি রাতগুলি”। ১৯৭৭ সালের সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারটি আসে তাঁর লেখা “বাবরের প্রার্থনা “এর হাত ধরেই । দ্বিতীয় সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার অর্জিত হয় ১৯৯৯ সালে তাঁর একটি অনুবাদের হাত ধরে, কন্নড় ভাষার একটি নাটক তিনি রক্তকল্যাণ নামে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন।
তাঁর লেখা কিছু উল্লেখযোগ্য কাব্য এর মধ্যে নাম করা যায়—‘মূর্খ বড়ো সামাজিক নয়’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘মাটি’, ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’, ‘ধুম লেগেছে হৃৎকমলে’, ‘লাইনেই ছিলাম বাবা’, ‘মাটিখোঁড়া পুরোনো করোটি’, ‘শুনি নীরব চিৎকার’।  
ব্যক্তিগত ভাবে প্রচার বিমুখ হলেও তিনি সচেতন ছিলেন সামাজিক বাস্তব সমস্যাগুলি নিয়ে। তাই মাঝে মধ্যেই তাঁর কলম থেকে নিঃসৃত শব্দবদ্ধরা প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠতো বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরুদ্ধাচরণের প্রতিবাদে। কখনো নন্দীগ্রামের পুলিশি অত্যাচারের ইস্যুতে, কখনো শিক্ষাকর্মীদের আন্দোলনের সঙ্গে সহমত জানিয়ে, আবার কখনো বা জুনিয়র ডাক্তারদের ওপর বর্বরতার প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন তিনি। বছর দুই আগে যখন রাজ্যসভায় পাশ হয়েছে সংশোধিত নাগরিকত্ব বিল তখনও একইভাবে তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছেন তাঁর কাব্যের মাধ্যমে—“মাটি” কবিতায় ধরা দেয় দেশের প্রতি তার নাগরিকদের টান ও অধিকার বোধের ছোঁয়া। তারই কিছু ছত্রে ফুটে ওঠা কবির আবেগ এরকমই—


“আমারই হাতের স্নেহে ফুটেছিল এই গন্ধরাজ/যে–কোনো ঘাসের গায়ে আমারই পায়ের স্মৃতি ছিল/আমারই তো পাশে পাশে জেগেছিল অজয়ের জল/আবারও সে নেমে গেছে আমারই চোখের ছোঁয়া নিয়ে/কোণে পড়ে–থাকা ওই দালানে দুপুরে/ভাঙা থামে, আমারই নিঃশ্বাস থেকে কবুতর তুলেছিল স্বর/শালবন–পেরোনো/এ খোলা মাঠে মহফিল শেষে/নিথর আমারই পাশে শুয়েছিল প্রতিপদে চাঁদ।
তোমাদের পায়ে পায়ে আমারও জড়ানো ছিল পা তোমরা জানোনি তাকে, ফিরেও চাওনি তার দিকে দুধারে তাকিয়ে দেখো/ভেঙে আছে সবগুলি সাঁকো কোনখানে যাব আর যদি আজ চলে যেতে বলো।
গোধূলিরঙিন মাচা, ও পাড়ায় উঠেছে আজান এ–দাওয়ায় বসে ভাবি দুনিয়া আমার মেহমান।
এখনও পরীক্ষা চায় আগুনসমাজ এ–মাটি আমারও মাটি সেকথা সবার সামনে কীভাবে প্রমাণ করব আজ।”

সম্প্রতি ভুগছিলেন বার্ধক্যজনিত অসুখে। এবছরের শুরুতে হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়েছিল। বিগত কদিন ধরে আবারো শরীর খারাপ হওয়াতে কোভিড পরীক্ষা করা হয়। ১৪ এপ্রিলে তিনি কোভিড আক্রান্ত জানা যায় তাই ডাক্তারের পরামর্শে ছিলেন হোম আইসোলেশনে। কোভিড আক্রান্ত কবি শঙ্খ ঘোষ এর কলম স্তব্ধ হলো আজ চিরকালের জন্য। তাঁরই লেখা—

“ঝরে পড়ার শব্দ জানে তুমি আমার নষ্ট প্রভু” থেকে কিছু ছত্র দিয়ে অনুভব করা যায় কবির মনের গভীরতা ও প্রসারতা, যা জেগে রইলো তাঁর সৃষ্ট হরফে অবিনশ্বর হয়ে—
“সকল প্রতাপ হলো প্রায় অবসিত
জ্বালাহীন হৃদয়ের একান্ত নিভৃতে
কিছু মায়া রয়ে গেলো দিনান্তের,
শুধু এই-
কোনোভাবে বেঁচে থেকে প্রণাম জানানো
পৃথিবীকে।
মূঢ়তার অপনোদনের শান্তি,
শুধু এই-
ঘৃণা নেই, নেই তঞ্চকতা,
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু।”

 

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading