কন্ঠ

সংবাদ প্রতিখনের সাহিত্য পাতায় বাস্তব জীবনের ধারাবাহিক গল্প নিয়ে হাজির হলেন পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুর থেকে অন্তরা সিংহরায়। আজ প্রথম পর্ব

 

ছেলেটাকে টিউশন দিয়ে কিছুক্ষণ চতুরঙ্গ মাঠের গাছতলাতে বসা। এই টিউশনটা বাড়ি থেকে প্রায় নয় কিলোমিটার দূরে। ছেলের ব্যাচ শুরু বিকেল পাঁচটা থেকে, শেষ সাড়ে ছটায়। বাড়ি থেকে যেতে স্কুটিতে প্রায় ১৫-২০ মিনিট সময় লাগে। তাই ছেলেকে টিউশন দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে একেবারেই ওকে নিয়েই বাড়ি ফিরি। তখন ওই বিশাল বিস্তৃত মাঠের পাশে বসে নয় কবিতা লিখি না হলে নিউজ লিখি আর উন্মুক্ত এক বাতাবরণের আনন্দ নিই। এক তৃপ্তিকর পরিবেশের স্বাদে কিছুক্ষণ নিজের মতো করে কাটাই আর কি! বড় গাছটির চারপাশে বসার জায়গা বাঁধানো আছে।

একদিন হলো কি আমার ঠিক পেছনে গাছের অপরপ্রান্তে একজন বসে ফোনে কোন এক মহিলার সাথে কথা বলছেন। ভদ্রলোকের অপূর্ব কণ্ঠস্বর। স্পষ্ট, গভীর ও বৈচিত্র্যময়, উচ্চারণ ও আবেগের সঠিক ব্যবহার। ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর শুনে মনে হল আকাশবাণীর কোন এক সকালের অনুষ্ঠানের কন্ঠ শুনছি। উনি যার সাথে কথা বলছেন সেই মহিলা তার বিবাহিত জীবনের নানা সমস্যা, নানা জটিলতা উনার কাছে উজাড় করছেন। তার ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে। হয়তো ভদ্রলোক ফোনটি স্পিকারে রেখে কথা বলছিলেন।

ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর এর বৈচিত্র্যে আকর্ষিত আমি তাদের কথোপকথনে কান দিলাম। মাঝবয়সী ভদ্রমহিলার এক প্রকৃত বন্ধু উনি অথবা প্রকৃত স্বজন হয়তো বা স্বজনের থেকেও একটু বেশি কেউ। বুঝলাম তাদের সম্পর্কটার মাধ্যম শুধুমাত্র এই মোবাইল ফোনটি। হয়তো তাদের দেখা হয়নি সামনাসামনি। মনে হলো আসলে এক কণ্ঠস্বরের বন্ধু আর এক কণ্ঠস্বর। এক কন্ঠস্বর আশ্বাস দিচ্ছে সমস্ত সমস্যা সমাধানের, সুস্থ জীবনের ভরসা জোগাচ্ছেন। সংসারের চাপে মানসিক বিভ্রান্ত নারীটিকে একটু গুছিয়ে দিচ্ছেন।

একজন নারীকে সংসার আষ্টেপিষ্টে বেঁধে রাখে আর আছড়ে আছড়ে ফেলে। কর্তব্য, দায়িত্ব, সন্তান প্রতিপালন, অপমান, লাঞ্ছনা শ্বশুরবাড়ির কটুক্তি যা মাকড়সার জালের মতো জড়িয়ে একটু একটু করে মারে। পরিবারের আপন বলতে যে সমস্ত সদস্যরা তারা অনেক ক্ষেত্রেই আবেগ- অনুভূতির বা অভিযোগের কোন গুরুত্বই দেয় না। তখনই হয়তো নারীর মন বাহিরমুখী হয়ে ওঠে। আসলে  নারীমন আশ্রয় চায়, আশ্বাস চায়, ভরসা চায়। চায় একজন পথপ্রদর্শক।  নিজের বক্তব্য খুলে বলার মত একজন বন্ধু চাই। মনের গুরুত্ব পেলেই একজন নারী অজস্র সমস্যার  মধ্যেও এক সুখী সংসার গড়ে তুলতে পারেন।

সেই মুহূর্তে বসে আমার মনে হয়েছিল হয়তো এই রকমই এক কণ্ঠস্বর কোন এক নারীকে  জীবনের লড়াই করার শক্তি জোগাচ্ছে। এসব ভেবে ভদ্রলোককে দেখতে আমি উৎসুক হলাম একটু জায়গা পরিবর্তন করে বসলাম যাতে তাকে দেখতে পাই। দেখে তো একটু অবাকই হলাম উচ্চতা চার ফুট, কালো, মাথায় চুল নেয়। একেবারে অন্যরকম দেখতে। কোন মেয়ে এক ঝলকে যে পাত্তা দেবে বা পছন্দ করবে এমনটা নয় অথচ তার অপূর্ব কন্ঠস্বরের যাদুতে আটকা রয়েছে ওই ভদ্রমহিলা। যাই হোক ভদ্রলোকের কথা শেষ হলো।

তখন আমিও ঠিক বসে বসে ফোনে নিউজ টাইপ করছি। কথা শেষ করে ভদ্রলোক এদিক ওদিক দেখতেই বুঝতে পারলেন তিনি এক সুন্দরী মহিলার সাথে বসে ছিলেন এতক্ষণ। এবার উনি আমার সাথে কথা বলতে উৎসুক হয়ে উঠলেন। হয়তো ভাবলেন আমারও বুঝি উনার মতো একজনকে— ।

বললেন, ম্যাডাম আপনি কি করেন!

প্রথমে তো উনাকে বেপাত্তা করলাম।  অনেকবার জিজ্ঞাসা করার পর বললাম নিউজ করি। যাতে একটু সংযত হয়ে আমার থেকে একটু দূরে থাকেন বা ভয় পান।

আপনি তবে তো সাংবাদিক?

বললাম হ্যাঁ। তারপর উনার একাধিক প্রশ্ন, উৎসুকমন। কোনটার উত্তর দিচ্ছি আবার কোনটার নিজের কাজের মিথ্যে চাপ দেখানোর চেষ্টা করছি। উনি ঠিক বুঝতেই পারলেন যে আমি হয়তো উনাকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছি না তাই একটু অন্য ধরনের বিষয় উনি আমার কাছে খুললেন।

ম্যাডাম আপনার পেপারে এ্যাড দেওয়া হয় না?  আসলে আমাদের কোম্পানির অনেক এ্যাড দিতে হয় যদি আপনি একটু সহযোগিতা করেন আপনার ফোন নাম্বারটা দেন—

ক্রমশঃ

 

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading