আজ পবিত্র রথযাত্রা। আর রথযাত্রা বলতেই আমাদের মনে প্রথমেই আসে পার্শবর্তী রাজ্য ওডিশার পুরীর কথা। এই রথযাত্রা নিয়ে লিখলেন আত্রেয়ী দো

পুরীর আষাঢ় মানেই বাতাসে ধ্বনি—”জয় জগন্নাথ!” মন্দিরের গম্ভীর ঘণ্টা, শঙ্খের অনুরণন আর লক্ষ মানুষের পদধ্বনিতে কেঁপে ওঠে ধর্মতট। রথযাত্রা একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক উল্লাস, তেমনই এক শিল্প, স্থাপত্য আর সাংস্কৃতিক বিস্ময়।
এই যাত্রার প্রধান তিন চরিত্র—জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। কিন্তু তাঁদের বাহন, তিনটি রথ, কেবল বাহন নয়—তাঁরাও যেন দেবতাদের মতোই জড়িয়ে আছেন ইতিহাস ও রহস্যের জালে।
চলুন, এক ঝলকে ফিরে দেখা যাক সেই তিন রথের পরিচয়, যাত্রার ক্রম ও তাদের গোপন কথা—
কোন রথ আগে যায়?
রথযাত্রার শুরু হয় বলরামের রথ তালধ্বজ দিয়ে। তারপর রওনা দেয় সুভদ্রার রথ দর্পদলন, এবং সবশেষে যাত্রা শুরু করে জগন্নাথের রথ নন্দীঘোষ।
এই ধারাবাহিকতা শুধু আচারগত নয়, এর মধ্যে এক সূক্ষ্ম প্রতীকী বার্তাও নিহিত—বলরাম সামনে, যেন রক্ষাকর্তা বড় ভাই; সুভদ্রা মাঝখানে, যেন পরিবারের শান্তিপূর্ণ কোমল হৃদয়; এবং সবশেষে জগন্নাথ, যিনি সকলকিছুর কেন্দ্র।

নন্দীঘোষ: জগন্নাথ দেবের রথ
লাল ও হলুদে রাঙানো ৪৫ ফুট দীর্ঘ এই বিশাল কাঠের রথ জগন্নাথ দেবের বাহন। ১৬টি চাকা, চারটি ঘোড়া (শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম), চালক দারুক, আর মাথায় কপিলধ্বজ পতাকা।
এই রথ কখনো অন্যের রথকে অনুসরণ করে না। সে নিজেই পথ দেখায়—যেন জগন্নাথ স্বয়ং ভক্তের প্রাণপথ আলোকিত করছেন।
কথিত আছে, এই রথ টানার সময় দড়ি ছিঁড়ে গেলে সেটি শুভ লক্ষণ, কারণ তখন বিশ্বাস করা হয়, ভগবান নিজে তাঁর রথ টানছেন।
তালধ্বজ: বলরামের রথ
নীল ও লালের ছোঁয়া নিয়ে ১৪ চাকার এই রথে যাত্রা করেন জগন্নাথের দাদা বলরাম। ঘোড়ার নাম—তীব্র, বল্লব, দ্রুত ও ঘোরা। চালক ‘মৎস্য’। পতাকা ‘উননী’।
তালধ্বজে থাকে কৃষির প্রতীক ‘হল’ চিহ্ন, যা বলরামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বলরামকে ‘শক্তির মূর্তি’ হিসেবে পূজা করা হয়, এবং রথে তিনি থাকেন সর্বদা জগন্নাথের ডানদিকে—যেন রক্ষাকর্তা।
কিংবদন্তি অনুসারে—রথ যাত্রার পথে কোনো সংঘর্ষ এড়াতে প্রথম বলরামের রথ দাঁড়ায়, যাতে তিনি নিজের ভাই ও বোনের পথ রক্ষা করেন।
দর্পদলন: সুভদ্রার রথ
কালো ও লাল বর্ণে মণ্ডিত, ১২ চাকার এই রথ সবচেয়ে শান্ত, সবচেয়ে সরল। ঘোড়ার নাম—জয়া, বিজয়া, অজয় ও অপরাজিতা। চালক ‘অর্জুন’। পতাকা ‘নাদম্বিকী’। দর্পদলন শব্দের অর্থ—“অহংকার বিনাশকারী।”
এই রথে চড়েন একমাত্র নারী দেবতা। রথের নিচে নারীরা স্নান করে পুণ্য অর্জনের আশায়—বিশ্বাস, মাতৃরূপী সুভদ্রার আশীর্বাদে পরিবারে শান্তি আসে।এই রথের পথচলা শুরু হয় একটু দেরিতে, অনেকটা যেন নারীশক্তির নীরব, কিন্তু অটুট আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে।

রথ- এক জীবন্ত পুরাণ
প্রতিটি রথ প্রতিবছর নতুন কাঠে তৈরি হয়, পেরেক বা নাট-বল্টু ছাড়াই। দড়ি, খাঁজ কাটা কাঠ আর প্রাচীন মন্ত্রে নির্মিত এই রথ তিনটি যেন চলমান মন্দির- যেখানে দেবতা নিজেরাই বেরিয়ে আসেন ভক্তের কাছে।
গজপতি রাজা নিজ হাতে সোনার ঝাঁটা দিয়ে রথ পরিষ্কার করেন-এই ‘ছেরা পাহারা’ মনে করিয়ে দেয়, ঈশ্বরের সামনে সবাই সমান।
তিনটি রথ, তিনটি রং, তিনটি গল্প—কিন্তু একটাই বার্তা: ভক্তি, সমতা, এবং আত্মনিবেদন।
এই রথগুলি যেন কেবল কাঠের তৈরি বাহন নয়, বরং ভারতীয় সভ্যতার গোপন চেতনাকে বহন করে নিয়ে চলে—আবারও মনে করিয়ে দেয়, ঈশ্বর কখনও আমাদের দূরে রাখেন না, বরং প্রতি বছর তিনি নিজেই আসেন… আমাদের পথের পাশে দাঁড়িয়ে।
জয় জগন্নাথ! “আসুক রথের চাকা ঘুরে, ভরে উঠুক হৃদয় জয় জগন্নাথের আনন্দধ্বনিতে।”
সকলকে জানাই রথযাত্রার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও প্রণাম।
