পান্তাভাত, শুধু খাবারই নয় বাঙালির ঐতিহ্য

আত্রেয়ী দো: এক থালা ঠান্ডা ঠান্ডা পান্তা ভাত, এক টুকরো কাঁচা পেঁয়াজ, একটা কাঁচা লঙ্কা আর সামান্য লবণ-ঠিক যেন অমৃত। গরমে পান্তাভাত শুনলে জিভে জল আসে না এরকম বাঙালি খুঁজে পাওয়া বেশ মুশকিল। পান্তাভাত প্রাচীন এবং ভীষন জনপ্রিয় একটি খাবার। মূলত রাতের রান্না করা ভাতের মধ্যে ঠান্ডা জল ও লবণ রেখে দিয়ে দিয়ে পরের দিন সকালে খাওয়া হয়, একেই আমরা পান্তাভাত বলে থাকি।

সাধারণভাবে, পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা, সরষের তেল, লবণ, লেবু ও নানান রকমের ভাজা-ভুজি সহযোগে এটি খাওয়া হয়ে থাকে। আবার শাক-ভাজা, ডালের-বড়া, মাছ-ভাজা বা তরকারি দিয়েও পান্তা খাওয়া হয়। বাংলার চাষিদের কাছে পান্তাভাত যে শুধুমাত্র সকালের জলখাবার নয়, দিনের প্রধান খাবার হিসেবেও ব্যবহার হয়। পান্তা ভাতের তরল অংশকে বলে আমানি। আলাদা করে এই আমানি খাওয়ারও চল আছে। আর কাঞ্জী হলো পান্তা ভাত বা পান্তা ভাতের জল।

‘চন্ডীমঙ্গল’এ উল্লেখ্য ব্যাধপত্নী গর্ভবতী নিদয়ার গরম ভাত ফেলে পান্তা আর আমানি খেতে ভালো লাগছে। পান্তাভাত খেয়ে জিরোনোর ফাঁকতালে চলুন জেনে নিই এই পান্তাভাতের ইতিহাস।

পান্তাভাতের ইতিহাস

পান্তাভাতের ইতিহাস আনুমানিক ২০০০ বছরেরও বেশি পুরনো, তবে অনেক ঐতিহাসিকের মতে মুঘল আমলে এর প্রচলন বৃদ্ধি পায়। জানা যায় মুঘল শাসনকালে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পান্তা ভাত পরিবেশন করা হতো। এও শোনা যায় তৎকালীন ইংরেজ গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসও নাকি এই পান্তাভাত খেতে পছন্দ করতেন এবং  নিয়মিত খেতেন। এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “জীবনস্মৃতি”তে তাঁর নতুন বৌঠানের হাতে তৈরি পান্তা ভাতের কথা উল্লেখ করেছেন।

প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজের খাবার

পান্তাভাতের শুরু হয়েছিল বাঙালি কৃষক সমাজে। দিনের পর দিন মাঠে-ঘাটে কাজ করার পর, রান্না করে খাবার সময় হতো না। তাই রাতের ভাত রেখে দিতেন ঠান্ডা জলে, আর সকালে সেই ভাতেই হতো জলযোগ। সহজ, সাশ্রয়ী আর হজমে সহযোগী—পান্তাভাত হয়ে ওঠে প্রতিদিনের সঙ্গী।

ঔষধি গুণাগুণ

দীর্ঘ সময় জলে ভিজিয়ে রাখার ফলে এতে সামান্য গাঁজন (fermentation) হয়, যা হজমে সহায়ক এবং প্রোবায়োটিক উপাদানে পরিপূর্ণ। এতে থাকে ল্যাক্টিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। পান্তাভাতে থাকা পুষ্টিকর পদার্থগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে। এতে থাকা আয়রন দেহে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ায়। ক্যালসিয়াম শরীরের হাড়কে শক্ত করে। ম্যাগনেসিয়াম শরীরে নিঃসৃত এনজাইমকে সক্রিয় করতে সাহায্য করে।

পান্তাভাতে প্রচুর পরিমাণে বিটা-সিটোস্টেরল, কেম্পেস্টেরোলের মতো মেটাবলাইটস রয়েছে যা শরীরকে প্রদাহ থেকে রক্ষা করে। এটি কোলেস্টেরল কমাতেও সাহায্য করে। এতে থাকা(Isorhamnetin 7-glucoside) আইসোরহ্যামনেটিন-সেভেন-গ্লুকোসাইড ফ্ল্যাভোনয়েডের মতো মেটাবলাইটস ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে।

একটি বিষয়, সারা রাত বিশেষ করে প্রায় ১২ ঘণ্টারও বেশি ভাত জলে ভিজলে এবং এর ফলে ফারমেন্টেশনের জন্য সৃষ্টি হয় অ্যালকোহলের এবং তাই পান্তাভাত খাওয়ার পর আমাদের শরীর ম্যাজ-ম্যাজ করে এবং ঘুমও পেতে পারে। পান্তা ভাত যদি পরিষ্কার পাত্রে বিশুদ্ধ জল দিয়ে তৈরি করা না হয়,  তাহলে সেখানে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া তৈরি হতে পারে। সেই ভাত খেলে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাই পান্তাভাত প্রস্তুতির আগে এইগুলো মাথায় রাখা ভীষন রকম প্রয়োজন।

আঞ্চলিক বৈচিত্র্য

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে এটি পান্তাভাতই নামে পরিচিত। তবে আসামে একে “পোকা ভাত” বলা হয়। উড়িষ্যা ও বিহারে একে “পাখালা” বলা হয়। দক্ষিণ ভারতের কেরালা ও তামিলনাড়ুতে প্রায় অনুরূপ খাদ্য প্রচলিত, যার নাম”পাঝান্ন কান্নি”।

আধুনিক জনপ্রিয়তা

এক সময় পান্তাভাত ছিল ‘গরিবের খাবার’। কিন্তু সময় বদলেছে। আজ পয়লা বৈশাখে পান্তাভাত- ইলিশ আর আলুভর্তা না হলে যেন উৎসবই অসম্পূর্ণ। পাঁচতারা হোটেলেও পরিবেশিত হচ্ছে এই ‘লোকাল ডিলিকেসি’। এটা আমাদের ঐতিহ্যের সম্মান। সবশেষে এটুকুই বলার “পান্তাভাত শুধু এক থালা খাবার নয়—এটা বাঙালির ইতিহাস, সংগ্রাম, স্বাস্থ্য আর সংস্কৃতির প্রতীক।”

তথ্য সূত্র : ইন্টারনেট
error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading