রবির মাসে ‘রবি’র আসা

বৈশাখ মানেই রবীন্দ্রনাথবাঙ্গালির জীবনের প্রতিটা ক্ষণেই জড়িয়ে রয়েছেন তিনিবিশ্বকবির ১৬৪ তম জন্ম দিবসশকে স্মরণ করে কবিকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করলেন 

অরুণ চট্টোপাধ্যায়

রবির মাস মানে রবি অর্থাৎ সূর্যের প্রভা আর দাপট যখন সবচেয়ে বেশি।  বাংলার প্রথম মাস বৈশাখ। সেই মাসের এই ধরাধামে ‘রবি’ অর্থাৎ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথেরও আসা। বছরের প্রথমে যিনি এলেন সারা বছরের ঋতুচিত্র তো তিনি আঁকবেনই। হ্যাঁ, আঁকবেন কথাটাই সঠিক কারণ রবীন্দ্রনাথের গান যখন সুরে, তালে, লয়ে পরিবেষ্টিত হয়ে আমাদের কানে এসে পৌঁছোয় তখন আমাদের কান আমাদের চোখকে দিয়ে দেয় উপলব্ধির দায়িত্ব। আর আমরা যেন আমাদের কল্পনার চোখ দিয়ে দেখি এক একটি নয়নাভিরাম চিত্রকে।

পয়লা বৈশাখ বৈশাখের প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়েই হয় বছরের গোড়াপত্তন। তার আগে চৈত্রের চিতায় যখন বিগত বছর পোড়ে তখন কবি লেখেনঃ

“ দারুণ অগ্নিবাণে রে হৃদয় তৃষায় হানে রে ।।

রজনী নিদ্রাহীন, দীর্ঘ দগ্ধ দিন

আরাম নাহি জানে রে ।। …  “

আর তাই তো তাঁর কলম আমন্ত্রণ জানায় বৈশাখকে। কবির আশা যদি নতুন বছর কিছু দিশা দিতে পারে মানুষকে। সন্ধান দিতে পারে এই সংকট মোচনের। তাই তিনি আহবান করেন বৈশাখকেঃ

 “ এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।

তাপনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,

বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।…”

কিন্তু বৈশাখ যেন প্রকৃতির এক রোষ নিয়ে উপস্থিত হয় আমাদের সামনে। উত্তাপের উন্মাদনায় অস্থির হয়ে উঠি আমরা। কবির কলম উপলব্ধি করেন এই সত্যটাকে। এই সত্যের প্রতিফলনও ঘটে অচিরে।

কবি লিখলেনঃ

“প্রখর তাপনতাপে   আকাশ তৃষায় কাঁপে,

বায়ু করে হাহাকার।…”

কিন্তু এটাও খুব সত্যি যে এমনই প্রচন্ড দাবদাহের দিনে পৃথিবীতে এসেছিলেন কবি। এসেছিলেন যেন আমাদের সকলের সঙ্গে দাবদাহের এই কষ্টটাকে নিজের অঙ্গীভূত করতে। ২৫শে বৈশাখ ১২৬৮ সালে তাঁর জন্ম। বৈশাখের প্রখর রশ্মির মতই প্রখর প্রতিভার অধিকারী যিনি। গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, পত্রসাহিত্য আরও কত কী। উত্তাপ নিংড়ে নিচ্ছে সব জল। নিমেষে বাষ্পীভূত করছে তা। নন্দী-নালা-পুকুর তো বটেই এমন কী উদ্ভিদ আর প্রাণিকুলের থেকেও টেনে নিচ্ছে দেহরস। শুষ্ক করে দিচ্ছে মানুষের মন আর হৃদয়কেও।  প্রচন্ড উত্তাপে মানুষের লবেজান হয়েছে প্রাণ। ওষ্ঠাগত প্রাণ সমস্ত মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কবি লিখলেনঃ

“নাই রস নাই, দারুণ দাহনবেলা।  খেলো খেলো তব নীরব ভৈরব খেলা।।

যদি ঝরে পড়ে পড়ুক পাতা,  ম্লান হয়ে যাক মালা গাঁথা,

থাক জনহীন পথে পথে মরীচিকাজাল ফেলা।। ..”

নির্জন নিস্তব্ধ মাঠ-ময়দান। বিচরণশীল পশুর নেই দেখা। খাদ্যের থেকেও ছায়া এখন তাদের কাছে হয়ে উঠেছে বড় প্রিয়। তাই তারা ঘাস খাওয়া ছেড়ে ছায়া খোঁজায় ব্যস্ত। রৌদ্রাহত ক্লান্ত গোপালক ক্লান্ত গাছের নিচে নিদ্রার প্রয়াসে রত। বন্ধ হয়েছে বিহঙ্গের ডানা নাড়াও। গাছের পাতার আড়ালে তারা খুঁজছে এক টুকরো শীতলতাকে। বাতাস যেন তর গতি ভুলে গেছে। অথবা এতই ক্লান্ত যে এতটুকু শব্দ করতেও আলস্য আসছে তাঁর। নিশ্চুপ এক গ্রীষ্ম মধ্যদিনের সুঠাম এক চিত্র উপহার দিল কবির কলমঃ

 “মধ্যদিনে যবে গান বন্ধ করে পাখি,

হে রাখাল, বেনু, তবে বাজাও একাকী।।…”

কবির বর্ণনায় দিনটা ভাসতে থাকে মনের চোখে। ফুটে ওঠে তাপপ্রবাহের এক করুণ রূপ। তপ্ত বৈশাখ সবাইকে যখন করেছে ঘরবন্দি তখন কি নিষ্কৃতি মিলতে পারে কবির কলমের?  তাপপীড়িত পৃথিবী তাঁকে ব্যথিত করে। সমবেদনার সুর  ফুটে ওঠে তাঁর কাব্য-প্রতিবেদনে। বৈশাখের দ্বিপ্রহর নিজেই ক্লান্ত থাকে সারা বেলা। আর তাই তাঁকে যেন দেয় ভাবনার অবসরও। অলস অবসর কখনও মনে পড়িয়ে দেয় অতীত কোনও প্রেমের বিরল ক্ষণ। সফল প্রেমের সুখস্মৃতির সঙ্গে থাকে আবার কোনও ব্যর্থ প্রেমের কাহিনি। উত্তপ্ত হাওয়ায় উড়ে পড়া শুষ্ক পাতার মর্মর ধ্বনি আর এই তপ্ত বাতাসের হলকা মনে পড়িয়ে দেয় অতীত বিরহের ছ্যাঁকা। হয় তখন তা যেন প্রতিধ্বনিত হয় শ্রোতার নিজের হৃদয়েও। কবি লেখেনঃ

“মধ্যদিনের বিজন বাতায়নে

ক্লান্তি-ভরা কোন বেদনার মায়া   স্বপ্নাভাসে ভাসে মনে মনে।।

কৈশোরে যে সলাজ কানাকানি   খুঁজেছিল প্রথম প্রেমের বাণী

আজ কেন তাই তপ্ত হাওয়ায় হাওয়ায়  মর্মরিছে গহন বনে বনে।।

যে নৈরাশ্য গভীর অশ্রুজলে   ডুবেছিল বিস্মরণের তলে

আজ কেন সেই বনযুথির বাসে   উচ্ছ্বসিল মধুর নিঃশ্বাসে,

সারাবেলা চাঁপার ছায়ায় ছায়ায়    গুঞ্জরিয়া ওঠে ক্ষণে ক্ষণে।।”

শুধু ধরাতল কেন, উত্তপ্ত বৈশাখ নিজেই কি খুব সুখে আছে? কবির কলম সকলের মনের সুখ-দুঃখ-বেদনা-হর্ষ সব ছবিই আঁকে। বৈশাখের নিজের দুঃখই বা বাদ যাবে কেন?

“চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে।

আমি  বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন, সন্তাপে প্রাণ যায় যে পুড়ে।।….”

উত্তাপের মাস তবু বৈশাখের ভোর কিন্তু কবির কাছে তৃপ্তিকর মনে হয়। তাপ হারিয়ে শেষ রাতে ভূপৃষ্ঠ হয় শীতল। তার পরশ পেয়ে বাতাসও হয়ে ওঠে শীতল। রাতভর অনিদ্রা অথবা নিদ্রার ব্যাঘাত প্রত্যুষে যেন নিদ্রারস পান করে নিদ্রাসুখে অভিভূত হতে চায়। ভোরের শীতল স্নিগ্ধ বাতাস যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন কবির কাছে বয়ে আনে রাতে ফোটা বকুলের সুবাস। তাই কবি লিখলেনঃ

“বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া আসে মৃদুমন্দ।

আনে আমার মনের কোণে সেই চরণের ছন্দ।।

স্বপ্নশেষের বাতায়নে   হঠাৎ-আসা ক্ষণে ক্ষণে

আধো-ঘুমের প্রান্ত-ছোঁয়া  বকুলমালার গন্ধ….”

একমাত্র হয়ত হাওয়ার তান্ডব কমাতে পারে তাপের রুদ্ররূপকে। প্রাণীকুল কমবেশি গতির পূজারী। কবিও ব্যতিক্রম নন। ঝড়ের তান্ডব তাঁকে করে তোলে উচ্ছ্বল। তাই তিনি গেয়ে ওঠেনঃ

“হৃদয় আমার, ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে।

বেড়া-ভাঙ্গার মাতন লাগে উদ্দাম উল্লাসে।।..”

কালবৈশাখী ঝড়ের অনুপম বর্ণনয় কবি লিখলেনঃ

“তোমার  মোহন এল ভীষণ বেশে,  আকাশ ঢাকা জটিল কেশে—

বুঝি  এল তোমার সাধনধন চরম সর্বনাশে।।

বাতাসে তোর সুর ছিল না,   ছিল তাপে ভরা।

পিপাসাতে বুকফাটা তোর শুষ্ক কঠিন ধরা। ..”

তবে ভুললেন না কালবৈশাখীর তান্ডব আর ভয়ঙ্কর রূপ আঁকতেও। যত ভয়াল হোক তবু কবি চাইছেন তাকে। আহ্বান করে বলেছেনঃ

“ওই বুঝি কালবৈশাখী

সন্ধ্যা আকাশ দেয় ঢাকি।।

তা কী রে তোর ভয় কারে, দ্বার খুলে দিস চার ধারে—

শোন দেখি ঘোর হুঙ্কারে   নাম তোরই ওই যায় ডাকি।। ..”

কালবৈশাখীর ঝড়কে রূপ দিতে তিনি ঢুকে গেছেন রূপকথার রাজ্যেও। এই ঝড় যেন ঝড় নয়।  সাত সমুদ্র পার থেকে উড়ে আসা এক বীর রাজপুত্র। তাপদৈত্যের হাতে বন্দিনী ধরাকে তাপের হাত থেকে মুক্তি দিতে যে এসেছে।

“শুষ্ক তাপের দৈত্যপুরে দ্বার ভাঙবে বলে,

রাজপুত্র, কোথা হতে হঠাৎ এলে চলে।।

সাত সমুদ্র পারের থেকে   বজ্রঘোষে এলে হেঁকে,

দুন্দুভি যে উঠল বেজে বিষম কলরোলে।।

বীরের পদপরশ পেয়ে মূর্ছা হতে জাগে,

বসুন্ধরার তপ্ত প্রাণে বিপুল পুলক লাগে…..”

তাপতান্ডবে বিব্রত করা বৈশাখ কি সর্বাংশেই খারাপ? উড়িয়ে পুড়িয়ে জ্বালিয়ে শুধুই কি ছারখার করে দেয় সে এই ধরাকে? ধীর লয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস কি বয়ে আনে না বকুলের সুবাস? ওড়ে না কি মধুলোভী প্রজাপতি আর ভ্রমরের দল? পাতার ফাঁক দিয়ে বনতলে গলে পড়ে নাকি সূর্যের একঝাঁক ডিম্বাকার প্রতিবিম্ব? পাতা আর ডালের ফাঁক দিয়ে সুর তুলে বয়ে যায় নাকি দুষ্টু বাতাস? বিশ্বকবি বিশ্বকে দেখেছেন প্রকৃতির সুমধুর বিচিত্র রূপে।ঊপীই ক্ষণে রুদ্ররূপা তো কোমলভাষিনী। কখনও তাপঝরা আবার কখনও তাপহরা। কখনও নির্জল করছেন এই পৃথিবীকে আবার কখনও জলে ভরিয়ে দিচ্ছেন তাঁর মায়ামন্ত্রে। তাই বৈশাখের এই উত্তাপের প্রাখর্যতেও কবি দেখছেন প্রকৃতির এক মনোহারিনী রূপ। গ্রীষ্মের দ্বিপ্রহরে বনতলের সুশীতল ছায়ায় কি আমরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেছি? দেখেছি কি প্রকৃতির রূপ? কবি শুধু দেখেছেন তাই  সযত্নে উপহার দিয়েছেন আমাদের।

‘ব্যাকুল বকুলের ফুলে   ভ্রমর মরে পথ ভুলে।।

আকাশে কী গোপন বাণী    বাতাসে করে কানাকানি,

বনের অঞ্চলখানি    পুলকে উড়ে দুলে দুলে।।

বেদনা সুমধুর হয়ে     ভুবনে আজি গেল বয়ে।

বাঁশিতে মায়া-তান পুরি   কে আজি মনে করে চুরি,

নিখিল তাই মরে ঘুরি    বিরহসাগরের কূলে।”

ভাবতে অবাক লাগে এমন সুন্দর করে কে বর্ণনা দিতে পারে প্রকৃতির প্রথম ঋতু গ্রীষ্মের? সব খারাপের মধ্যেই ভালোর সন্ধান পাওয়া যায়। এ তো জাগতিক অভিজ্ঞতাই বলে। যে বৈশাখ দগ্ধ করে প্রাণ করে তুলছে লবেজান। কিন্তু সেই উত্তাপ না থাকলে কি আকাশে জমত মেঘ? এক স্থানের জল মেঘ হয়ে বহু স্থানে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ত? তিক্ততার পরে যখন সুধা এসে পড়ে সামনে তখন সে সুধা যেন অনেক বেশি স্বাদু মনে হয় আমাদের কাছে। তাই তো গ্রীষ্মের শেষে যখন আকাশে দেখা দেয় বাদল মেঘের তখন ধরার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনঃপ্রাণও হয় সুশীতল। ধরার হর্ষ কবির মনেও পুলক জাগায়। তাই তিনি লেখেনঃ

“এসো শ্যামল সুন্দর

আনো তব তাপহারা তৃষাহারা সঙ্গসুধা।

বিরহিনী চাহিয়া আছে আকাশে।।

সে যে ব্যথিত হৃদয় আছে বিছায়ে

তমালকুঞ্জপথে সজল ছায়াতে,

নয়নে জাগিছে করুণ রাগিনী…..”

শুধু গ্রীষ্ম আর বর্ষার বন্দনাতেই কবির কলম থেমে যায় নি। প্রকৃতির ছয় ঋতুর সুন্দর আর নিখুঁত বর্ণনায় সে আরও গড়িয়েছে। আমাদের আলোচনা আর বেশি গড়ানোর আপাতত কোনও অবকাশ নেই। যিনি ১৩৪৮ সালের ২২শে শ্রাবণ তাঁর নশ্বর প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন আমাদের সকলের মধ্যে আমরা শ্রদ্ধায় মাথা নত করে শুধু তাঁর বিশাল সৃষ্টির কথা ভাবি।

রবীন্দ্র নাথের ছবি সৌজন্য গুগুল
error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading