বাঙ্গালির ফুচকা আড্ডা

আত্রেয়ী দো: ফুচকা অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি স্ট্রীট ফুড। আমার মত ফুচকা প্রেমীদের কাছে তো ফুচকা মন খারাপের ওষুধও বলা চলে। বন্ধুদের আড্ডায়,প্রেমিকার আবদারে কিংবা বউয়ের মানভঞ্জনে ফুচকার জুড়ি মেলা ভার। সাধ্যের মধ্যেই পকেট বাঁচিয়ে যদি এত সুস্বাদু খাওয়ার পেয়ে যাই,তাহলে কেনোই বা ফুচকাকে আপন করে নেব না ? ফুচকা খেতে ভালোবাসে না এমন মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা। তবে, এই ফুচকার আবিষ্কার কে করলো? আর কিভাবেই বা এই জনপ্রিয় খাবারটি তৈরি হল সেই বিষয়ে আমরা অনেকেই হয়তো জানিনা। তাহলে আজ বরং এই ফুচকা আড্ডা’র আসরে চলুন জেনে নিই ফুচকা নিয়ে কিছু জানা অজানা কথা।

আবির্ভাব:

ফুচকার আবির্ভাব নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। ঐতিহাসিকদের মতে,ফুচকা প্রথম তৈরি করা হয়েছিল মগধ সাম্রাজ্যের (বর্তমানে বিহার) রাজধানী পাটলিপুত্রে। প্রায় ৩০০-৪০০ বছর আগে মগধের রাজা ভারতে প্রথম ফুচকা তৈরি করেছিলেন। তারপর থেকেই এই খাওয়ার চলে আসছে।

অবশ্য ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক জার্নাল অফ ইন্ডিয়া’ তে ফুচকা সম্পর্কে বিশদ বিবরণ রয়েছে,সেখানে ফুচকার জন্মস্থান হিসেবে বারাণসীর উল্লেখ রয়েছে। শোনা যায় ,যে সময়ে লিট্টি চোখা খাওয়ার প্রচলন ছিল, তার সমসাময়িক সময় থেকেই ফুচকার যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে চালের গুঁড়ো দিয়ে ফুচকা তৈরি করা হত বলেও জানা যায় ।

আবার অন্যদিকে , পুরান বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাভারত যুগে দ্রৌপদীর হাত ধরেই ফুচকার আবির্ভাব ঘটে। জানা যায়, পাণ্ডবেরা নির্বাসনে থাকাকালীন একদিন খাওয়ার কম পড়েছিল। তখন মাতা কুন্তি ,তার পুত্রবধূ দ্রৌপদীকে পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলেন যে সে সংসার চালাতে কতখানি পারদর্শী। তিনি আলু সহ কিছু সবজি এবং আটার মন্ড দিয়ে বলেছিলেন সকলের জন্য খাওয়ার বানাতে। দ্রৌপদী সেই আটার মন্ড থেকে ছোটো ছোটো গোলাকার পাঁপড়ি তৈরি করে তেলে ভেজে নিলেন। তারপর সেই ভেজে নেওয়া পাঁপড়ির মধ্যে সবজির পুর ভরে , তেঁতুল জল দিয়ে সবাইকে পরিবেশন করেন এবং সকলের ক্ষুধা নিবারণ করেন। মাতা কুন্তি অত্যন্ত প্রসন্ন হন এবং এই খাবারটিকে অমরত্বের আশীর্বাদ দেন। অমরত্বই বটে ,যুগ যুগ ফুচকা একই ভাবে তার জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে।

নামকরণ:

জন্মস্থান নিয়ে যেমন মতভেদ রয়েছে ,তেমনি অঞ্চলভেদে ফুচকার নানান রকম নামও রয়েছে। শুধু নামকরণের ভিন্নতাই নয় ,ফুচকার পুর এবং পরিবেশন পদ্ধতিতেও রয়েছে ভিন্নতা। ফুচকার বিভিন্ন নামের মধ্যে গোলগাপ্পা,পানিপুরি, পানি কি বাতাসে,ফুলকি,টিক্কি,গুপচুপ,পাকাড়া ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

পশ্চিমবঙ্গে ফুচকা নামে জনপ্রিয় হলেও রাজস্থান ও উত্তর প্রদেশে এটি পাতাসি নামে পরিচিত আবার তামিলনাড়ুতে বলা হয় পানিপুরি। পাকিস্তান, নয়াদিল্লি, জম্মু-কাশ্মীর, হরিয়ানা, ঝাড়খণ্ড, বিহার, মধ্য প্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ ইত্যাদি এলাকায় ফুচকার নাম গোলগাপ্পা। তেলেঙ্গানা, উড়িষ্যা, ছত্তিশগড়, হায়দরাবাদ ইত্যাদি অঞ্চলে পরিচিত গুপচুপ নামে। নেপালে এবং শ্রীলংকায় এটি ফুলকি নামে জনপ্রিয়।

 

তবে নামকরণের পিছনে কিছু কারণও রয়েছে। এক গাপ্পায় অর্থাৎ একেবারেই মুখের ভিতরে পুরে নেওয়ায় ফুচকার এক নাম গোলগাপ্পা। আবার ফুলকো পুরির ভিতরে পুর ও টক-মিষ্টি-ঝাল পানি সহযোগে খাওয়ার কারণে এর নাম পানিপুরি। ঝাল ঝাল আলুর পুরের সাথে তেঁতুল জল দিয়ে ফুচকা খাওয়ার চল বেশি হলেও আরও অনেক ধরনের ফুচকা পাওয়া যায়। কোথাও আলুর পুরের জায়গায় থাকে সবজির পুর, কোথাও বা ঘুগনি কিংবা মাংসের পুর। কোথাও বা ঝালের পরিবর্তে দেওয়া হয় মিষ্টি পুর। কোথাও তেঁতুল জলের সাথে পুদিনা পাতা, লেবু ইত্যাদি মেশানো হয়। কোথাও আবার ধনিয়াপাতার চাটনি ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ,দই ফুচকা তো বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। টক দইয়ের সাথে মিষ্টি চাটনি ,বাদাম,ঝুড়িভাজা সহযোগে বানানো হয় এই দই ফুচকা।

স্কুল-কলেজের পাশে, শপিং কমপ্লেক্সের সামনে, পুজো পার্বণ, মেলা, নদীর ধার, পার্ক, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ইত্যাদিতে কোনো খাওয়ার স্টল থাকুক বা না থাকুক প্রায় সকলের অতি প্রিয় ফুচকা থাকবেই। বর্তমানে তো বিভিন্ন শুভ অনুষ্ঠান বাড়িগুলিতে অন্যান্য স্টার্টারের পাশাপাশি ফুচকা নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছে। ফুচকা সর্ম্পকে অনেক কিছুই জানা হলো। এবার আর দেরি কিসের? টুক করে ১টা টক ঝাল ফুচকা মুখে পুরে জিহ্বার স্বাদকোরক গুলিকে খুশি করুন।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading