আজ ২৯ আগস্ট। আজকের দিনটি সারা দেশে পালন করা হয় জাতীয় ক্রীড়া দিবস হিসেবে। আজকের দিনেই জন্মগ্রহন করেছিলেন আমাদের দেশের তথা সারা বিশ্বের হকির জাদুকর মেজর ধ্যানচাঁদ। তাঁকে নিয়েই লিখলেন কিশলয় মুখোপাধ্যায়

দিনটা ছিল ১৫ আগষ্ট ১৯৩৬, বার্লিন অলিম্পিকে হকি খেলা চলছে ভারত আর জার্মানির মধ্যে। গোটা স্টেডিয়াম ভারতের অধিনায়কের খেলায় মুগ্ধ। আসলে তাঁর খেলাই সবাই দেখতে এসেছে। ভারত ৮-১ গোলে জার্মানিকে হারিয়ে তৃতীয় বার অলিম্পিক হকিতে সোনা পেল। ভারতের অধিনায়ক করলেন হ্যাটট্রিক। অবশ্য এরকম হ্যাটট্রিক করা তাঁর কাছে জলভাত। তিনি হলেন হকির জাদুকর মেজর ধ্যানচাঁদ সিং। আজ ২৯ আগস্ট। আজকের দিনে ১৯০৫ সালে এলাহাবাদ বা প্রয়াগরাজে জন্মেছিলেন হকির জাদুকর। আর তাঁকে স্মরণে রেখেই আজ জাতীয় ক্রীড়া দিবস পালন করা হয়।

ফুটবলের রাজা পেলে, বক্সিং এর রাজা মহম্মদ আলি, ক্রিকেটের রাজা ব্র্যাডম্যান আর হকির রাজা ধ্যানচাঁদ আর ক্রিকেটের রাজা হকির রাজা কে বলেছিলেন আপনি রানের মতো গোল স্কোর করেন।
১৯২১ সালে ধ্যান সিং সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। বলা যায় সেখান থেকেই হকি খেলা শুরু। বরং ছোটবেলায় কুস্তির দিকেই মন ছিল বেশি। তিনি বলেছিলেন হকির প্রতি ঝোঁক দেখা যায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার পর। সেনাবাহিনীতে সারাদিন ডিউটি করার পর যখনই সুযোগ পেতেন হকিতে মজে থাকতেন। চাঁদের আলোয় হকি খেলতেন। সহকর্মী বন্ধুরা তাই ডাকতেন চাঁদ বলে। সেই থেকে ধ্যান সিং থেকে ধ্যানচাঁদ।

১৯২৬ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী দল নিউজীল্যান্ডে খেলতে যায়। মেজর ধ্যানচাঁদ প্রথম সেখানে নজর কারেন। সেখানে ২১টি ম্যাচের মধ্যে ভারত ১৮টি ম্যাচে জয় লাভ করে। দুটি খেলায় ড্র করে তথা একটিতে হারে। এরপর ভারত অলিম্পিকে হকি দল পাঠায়। ১৯২৮ সালে আমস্টারডাম, ১৯৩২ সালে লসএঞ্জলেস আর ১৯৩৬ সালে বার্লিন অলিম্পিকে ভারত সোনা জেতে। এই সোনা জয় ধ্যানচাঁদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।
১৯২৮ সালের অলিম্পিকে অষ্ট্রিয়াকে ৬-০, বেলজিয়ামকে ৯-০, ডেনমার্ককে ৫-০, সুইজারল্যান্ডকে ৬-০ আর ফাইনালে নেদারল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে সোনা জেতে ভারত। ধ্যানচাঁদকে নিয়ে শুরু হয় যায় মাতামাতি। । বিপক্ষ দলের ২ বা ৩ জনকে সামনে রেখে বল ড্রিবিল করার আশ্বর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। তাঁর হকি স্টিক ভেঙে দেখা হয়েছিল কোন চুম্বক লাগানো আছে কিনা। পরের দুটো অলিম্পিক নিয়ে ভারত মোট ১০২টি গোল করে। আর গোল খেয়েছে মাত্র ৩টি। এখানেই ধ্যানচাঁদ কতটা বিনয়ী ছিলেন তা বোঝা যায়। তিনি বলেছিলেন আমরা অনেক গোল করলেও গোল খেয়েছি খুব কম। এটা হয়েছে রক্ষণ ভাগের খেলোয়াড়দের জন্য। তিনি সবসময় অন্য খেলোয়াড়দের অবদানের কথা বার বার বলতেন।
ধ্যানচাঁদ পরিবার থাকতেন ঝাঁসিতে। কলকাতার সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ছিল। ঝাঁসি হিরোজের দলের হয়ে কলকাতায় প্রতিবছর বেটন কাপ আর লক্ষ্মীবিলাস কাপ খেলতে আসতেন। কলকাতায আসলে থাকতেন অন্যতম কর্মকর্তা ও সাংবাদিক পঙ্কজ গুপ্তর বাড়িতে । মতান্তরে বলা হয় ‘চাঁদ’ নামটি তিনিই দিয়েছিলেন। তাঁকে শুধু যাদুকর বলা হতোনা, আর্টিস্ট, এঞ্জেল বা দেবদূত, হিউম্যান ইল, এত গুলো উপাধি পেয়েছিলেন তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনে। এই বিনয়ী মিতভাষী মানুষটির জীবনাবসান হয় ৩ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে ভোরবেলায় দিল্লির এইমস হাসপাতালে।
ছোটবেলায় হকি খেলার কোন ব্যাপার ছিলোনা। সুতরাং পুরোটাই ছিল কঠোর পরিশ্রম লেগে থাকা আর নিরন্তর প্র্যাকটিস। টেকনিক আর স্টাইলের মেলবন্ধন অর্থাৎ ক্রীড়া বিজ্ঞান ও শিল্প কে মিশিয়েছিলেন তাঁর মেহনত দিয়ে, আর হয়ে উঠলেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়।
