১৯১১ সালে শীল্ড জয় নিছক একটি জয় ছিলোনা, ছিল মাঠে স্বাধীনতার লড়াই

কিশলয় মুখোপাধ্যায়: “আমাদের সূর্যমেরুন, নাড়ির যোগ সবুজ ঘাসে। আমাদের খুঁজলে পাবে সোনায় লেখা ইতিহাসে।”-সুমন্ত্র চৌধুরীর লেখা, ময়ুখ-মৈনাকের সুর করা আর অরিজিৎ ও অভীকের গলায় গাওয়া, ‘এগারো’ সিনেমার এই গানটি শুধুমাত্র মোহনবাগান সমর্থকদের নয়, আপামর বাঙালি ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় দোলা লাগায়। ১৯১১ সালে মোহনবাগানের সেই ঐতিহাসিক শীল্ড জয়ের পটভূমিকায় তৈরি অরুণ রায়ের পরিচালনায় এই সিনেমাটি ২০১১ সালে মুক্তি পায়। মোহনবাগানের ক্লাব লনে সেই ঐতিহাসিক জয়ের অমর একাদশের মুর্তি উন্মোচন হল। এর সঙ্গে রয়েছে ১৯১১ সালে ব্যবহার করা সেই বেঞ্চ। এই এগারোজন বঙ্গ সন্তান ছিলেন অভিলাষ ঘোষ, নীলমাধব ভট্টাচার্য, রাজেন সেনগুপ্ত, হীরালাল মুখোপাধ্যায়, মনমোহন মুখোপাধ্যায়, সুধীর চট্টোপাধ্যায়, ভূতিসুকুল, যতীন্দ্রনাথ( কানু) রায়,হাবুল সরকার, বিজয়দাস ভাদুড়ী আর শিবদাস ভাদুড়ী। অপরদিকে মোহনবাগান যে দলকে হারিয়ে শীল্ড চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল সেই ইষ্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টের এগারোজন ছিলেন ডিসকন, হোওয়ার্ড, ক্রেসি, ক্লুকাস, নিল, হুইটবি, মার্টিন, হেইড, জ্যাকসন, স্কালি এবং চার্চ।

সবুজমেরুন দলের এই এগারো জন ছিলেন ফুটবল মাঠে স্বাধীনতা সংগ্রামী। খেলার শেষে সবাই যখন ফিরছিলেন তখন এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মন ভীড় ঠেলে রেভারেন্ড সুধীর চট্টোপাধ্যায়কে সামনে পেয়ে বলেছিলেন, “দুহাত তুলে আশীর্বাদ করছি বাবা যা করেছ! কিন্তু ওটা নামবে কখন?” বলেই হাত বাড়িয়ে ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে দেখালেন। যেখানে ইউনিয়ন জ্যাকের পতাকা উড়ছে। এই জয় কি সুনির্দিষ্ট করে কলকাতা ফুটবলে কোন পরিবর্তন এনেছিল? উত্তর হল, হ্যাঁ। ১৮৯৮ সাল থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত কোন ভারতীয় দলকে লীগে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। আর বাঙালিদের মধ্যে ফুটবলের প্রতি এত উন্মাদনা ছিলোও না। এমনকি ১৯০৪ সালে যখন লীগে দ্বিতীয় ডিভিসন চালু হল তখনও কোন ভারতীয় দলকে সুযোগ দেওয়া হয়েনি। কিন্তু ১৯১১ সালে শীল্ড জয় বাঙালি তথা ভারতীয়দের ফুটবলের প্রতি এত উৎসাহ বেড়ে গেল যে মোহনবাগানের খেলায় গ্যালারি থাকতো পুরো ভর্তি। তিল ধারণের জায়গা থাকতো না। সেখানে লীগের খেলায় গ্যালারি থাকতো ফাঁকা। তখন একপ্রকার বাধ্য হয়েই ১৯১৪ সালে মোহনবাগান ও এরিয়ানকে দ্বিতীয় ডিভিসনে খেলতে সুযোগ দেওয়া হয়। এই যে উন্মাদনা আর জোয়ার, এর পেছনে শিবদাস ভাদুড়ীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। অমর একাদশের অধিনায়ক ছিলেন শিবদাস ভাদুড়ী। গোলে খেলেছিলেন হীরালাল মুখোপাধ্যায়। তিনি একবার বিখ্যাত ধারাভাষ্যকার অজয় বসুকে বলেছিলেন “শিবদাস জন্মেছিলেন বাংলা তথা ভারতের মাটিতে ফুটবলকে প্রতিষ্ঠা করতে। শিবদাস না থাকলে ১৯১১ সালে মোহনবাগান শীল্ড পেত কিনা সন্দেহ। সেই ফাইনাল খেলায় ইষ্ট ইয়র্ক যখন আমাদের বিপক্ষে প্রথম গোল করলে তখন গোলরক্ষক আমি ভয়ানক মুষড়ে পড়েছিলাম। শিবদাসই আমার কাছে এসে বলেছিল ঘাবড়াসনি, গোল শোধ করে দিচ্ছি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সম্পু্র্ণ নিজের চেষ্টায় গোল করে। আবার শিবদাসই অনেককে কাটিয়ে অভিলাষের পায় বল জুগিয়ে দিলে অভিলাষ গোলটি করে। সত্যি কথা কি ১৯১১ সালে শীল্ডতো আমরা জিতিনি, জিতেছিল দলপতি শিবদাস আর বাকি দশজনে।” প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ভারতে যে অনুর্ধ ১৭ বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা হয়েছিল তার প্রথম টিকিটটি শিবদাস ভাদুড়ীকে স্মরণে রেখে তাঁর নাতবউ গৌরী ভাদুড়ীকে দেওয়া হয়েছিল। টিকিটটি দিয়েছিলেন ২০১০ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান স্পেন দলের সদস্য চার্লস পুওল। পুওল সেমিফাইনালে জার্মানির বিরুদ্ধে একমাত্র গোল করে দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন।

শিবদাস ভাদুড়ীর প্রসঙ্গ উঠলেই আসবে বিজয়দাস ভাদুড়ীর কথা। অমর একাদশের আরেক সৈনিক বিজয়দাস ভাদুড়ী। শিবদাস ও বিজয়দাসের মধ্যে চেহারার অনেক মিল থাকার জন্য খেলার মাঠে বিপক্ষ টিম বোকা বনে যেত। দুজনের মধ্যে বোঝাপোড়া নিঁখুত ছিল। বিজয়দাস ভাদুড়ী দক্ষ স্কিমার অর্থাৎ পরিকল্পনা করতেন নিঁখুত। তৎকালীন অন্যতম সেরা ড্রিবলার ছিলেন।

দ্বিতীয় রাউন্ডে মোহনবাগান রেঞ্জার্সকে এবং কোয়ার্টার ফাইনালে রাইফেল ব্রিগেডকে হারালেও এই দুটো ম্যাচে গোলে যদি হীরালাল মুখোপাধ্যায় দুর্ধর্ষ না খেলতেন তাহলে মোহনবাগানের হাতে শীল্ড আর আসতো না। রেঞ্জার্সের বিরুদ্ধে খেলার সময় তিনি তিন তিনটে পেনাল্টি আটকেছিলেন। সেদিন হাফ টাইমের পর খুব বৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমার্ধে মোহনবাগান ২ গোলে এগিয়েছিল। পরে রেঞ্জার্স ১ গোল দেয়। আর কোয়ার্টার ফাইনালে স্কোর হচ্ছে মোহনবাগান ১ আর রাইফেল ব্রিগেড ০। কিন্তু খেলা হয়েছিল একতরফা আর সেটা খেলেছিল মিলিটারি সাহেব দলটি। কিন্তু জিততে পারেনি হীরালাল মুখোপাধ্যায়ের জন্য। অসাধারণ গোলকিপিং করেছিলেন। মোহনবাগানের হয়ে একমাত্র গোলটি করেন শিবদাস ভাদুড়ী। হীরালাল মুখোপাধ্যায় ছিলেন তৎকালীন ময়দানে অন্যতম সেরা গোলকিপার। আর প্রথম রাউন্ডে মোহনবাগান ৩ গোলে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজকে হারায়।

ময়দানে কালো দৈত্য নামে খ্যাত অভিলাষ ঘোষ জয়সূচক গোল করেছিলেন এটা সবারই জানা। এই  অভিলাষকে আবিস্কার করেছিলেন অমর একাদশের আরেক সৈনিক রাজেন সেনগুপ্ত। মোহনবাগান ময়মনসিংহে খেলতে গিয়ে দক্ষ সেন্টার হাফ রাজেন সেনগুপ্ত অভিলাষ ঘোষের প্রতিভা চিনতে পারেন। ফুটবল খেলায় বিপক্ষ যেখানে শারিরিক ভাবে শক্তিশালী সেখানে বুদ্ধি দিয়েতো খেলতে হবে ঠিকই কিন্তু শক্তিও দরকার। অভিলাষকে দেখেই বুঝেছিলেন। তখন মোহনবাগানের সেন্টার ফরোয়ার্ডে নিয়মিত খেলতেন শরৎ সিংহ। কিন্তু তাঁর বদলে অভিলাষ ঘোষকে নেওয়া হয়েছিল ওই শক্তির ব্যাপারটা মাথায় রেখে। ফাইনালের আগে সেমিফাইনালেও নিজের সেরা খেলাটা খেলেছিলেন অভিলাষ। সেমিফাইনালে মোহনবাগান ১ আর মিডিলএসেকস ১, ড্র হয়েছিল। সেদিন খেলেছিল সবুজমেরুন। কিন্তু জিততে পারেনি সাহেব দলের গোলকিপার পিগটের জন্য। ফিরতি খেলায় অসাধারণ খেলেছিলেন অভিলাষ ঘোষ। মোহনবাগান ৩ গোলে জিতেছিল। দৈহিক শক্তি, বুদ্ধি আর কৌশলে বাজিমাত করেন অভিলাষ। শীল্ডে সেরা আবিস্কার অভিলাষ ঘোষ।

অমর একাদশের আরেক সৈনিক ছিলেন হুগলি জেলার উত্তরপাড়ার মনমোহন মুখোপাধ্যায়। এই মুখোপাধ্যায় পরিবারের একটি বিরল কৃতিত্ব রয়েছে সবুজমেরুন দলের সঙ্গে। ১৯১১ সালে মোহনবাগান প্রথম শীল্ড জেতে। সেই দলে সদস্য ছিলেন মনমোহন মুখোপাধ্যায়। আর ১৯৩৯ সালে মোহনবাগান প্রথম লীগ জেতে। সেই দলে অন্যতম সদস্য ছিলেন তাঁর পুত্র বিমল মুখোপাধ্যায়। মনমোহন মুখোপাধ্যায় খেলতেন রাইট হাফে। শোনা যায় মাঝে মাঝে দিনে দুটো করে ম্যাচ খেলতেন। তখনই আধুনিক ফুটবলের ছোঁয়া দেখা যেত তাঁর খেলায়। উত্তরপাড়ায় রয়েছে তাঁর স্ট্যাচু। মাস্টারদা সূর্য সেনকে একবার তিনি নৌকা পার করে দিয়েছিলেন।

১৯১১ সালে শীল্ড জয় নিছক একটি জয় ছিলোনা, ছিল মাঠে স্বাধীনতার লড়াই। যে বাঙালি খুব একটা ফুটবল প্রিয় ছিলোনা সেই জাতির ফুটবল উন্মাদনার শুরুটা কিন্তু এই ঐতিহাসিক জয়। আর এই জয়ের পুরোপুরি কৃতিত্ব এই অমর একাদশের এগারো জন সৈনিকের।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Powered by Joinchat