জাহাজের ডেক থেকে যে খেলার সূত্রপাত, সেই খেলা এই রাজ্যের মধ্যে হুগলি জেলার গুড়াপে বেশ সমাদৃত। সেই খেলার বর্তমান হাল হকিকত সুলুকসন্ধানে কিশলয় মুখোপাধ্যায়
টেনিকয়েট, রিং নিয়ে খেলা। জাহাজের নাবিকরা জাহাজের ডেকে রিং নিয়ে খেলত ডেক টেনিস। সেখান থেকে পরিবর্তিত হয়ে আজকের টেনিকয়েট। পশ্চিমবঙ্গে ৪৪-৪৫ বছর আগে সত্যব্রত সেনগুপ্ত, অর্ধেন্দু দাশগুপ্ত আর শুক্লা সেনগুপ্তের চেষ্টায় টেনিকয়েট খেলা শুরু হয়। তখন ১৯৮৭-৮৮ সাল, শুক্লা সেনগুপ্ত রাজ্য টেনিকয়েট সংস্থার সম্পাদিকা। আর গুড়াপ শীতল কুমারী বালিকা বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষিকা তৃপ্তি প্রামাণিক। শুক্লা দেবী তৃপ্তি দেবীকে বললেন গুড়াপে টেনিকয়েট শুরু করা যাবে? স্কুলের ছাত্রীদের প্রিয় শিক্ষিকা তৃপ্তি দি একদিনের মধ্যে প্রেস থেকে প্যাড ছাপিয়ে গুড়াপে মিটিং করে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি তৈরি করলেন। সেই মিটিং এ উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন বর্ধমান টেনিকয়েট সংস্থার সভাপতি আইনজীবী বিরাজ রায়। প্রতিষ্ঠিত হল হুগলি জেলা টেনিকয়েট সংস্থা। টেনিকয়েটের ইতিহাস, খেলা, শুরুর দিনগুলো তথা সাফল্য এই সব নানা বিষয় কথা হচ্ছিল তৃপ্তিদির সঙ্গে। এখন অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে টেনিকয়েটের সাথে সাথে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক জাতীয় ক্রীড়া শক্তি সংঘের রাজ্য সম্পাদিকা।
টেনিকয়েটে আজ গুড়াপ যে খ্যাত হয়েছে তা সম্ভব হয়েছে অনেকের ঐকান্তিক চেষ্টায়। যেমন শুভেন্দু ঘোষ, আব্দুল হামিদ সরকার, বিদ্যুত কুমার ঘোষ, সুশীল কুমার বসু, মন্দিরা মুখোপাধ্যায় সহ আরো অনেকে। ফলস্বরূপ ২০০৫-০৬ সালে ৩০ তম জাতীয় টেনিকয়েট প্রতিযোগিতার আসর বসেছিল এই গুড়াপেই। তখন রাজ্য টেনিকয়েট সংস্থার সেক্রেটারি ছিলেন সুশীল কুমার বসু। তিনি এখনও টেনিকয়েটের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত আছেন।
টেনিকয়েট খেলা হয় কিছুটা টেনিস কিছুটা ব্যাডমিন্টন আর কিছুটা নতুন নিয়মে। ব্যাডমিন্টন খেলার মতো রয়েছে সিঙ্গল, ডাবলস আর মিক্সড ডাবলস। কোর্টের আয়তন, দৈর্ঘ্যে ৪০ ফুট ও প্রস্থে ১৮ ফুট। কোর্ট হয় শক্ত ও সমতল। মাঝখানে থাকে ব্যাডমিন্টনের মতো নেট বা জাল যার উচ্চতা ৬ ফুট। সাবজুনিয়র স্তরে ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি। নেটের মাপ ১৮- ২০ ফুট ও প্রস্থে ২৭ ইঞ্চি। টেনিকয়েটের কয়েটটা রাবারের তৈরি যার ওজন ১৯৮ থেকে ২২৬ গ্রাম। বাইরের ব্যাস ১৬ সেমি। মোট ৩ টি সেটে খেলার নিস্পত্তি হয়। প্রতি সেটে থাকে ২১ পয়েন্ট।
সংগঠন তৈরি হবার পর টেনিকয়েট অনুশীলন চলতে থাকে। প্রথম অংশগ্রহণ ১৯৮৯ সালে আহমেদবাদে সাব-জুনিয়র জাতীয় টেনিকয়েট প্রতিযোগিতায়। প্রিয়াঙ্কা দাশ, শবনব বেগম, সঞ্জয় সোম ও সুরজিৎ কর্মকার বাংলার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন এই প্রতিযোগিতায়। আজ সুরজিৎ বাবু রাজ্য টেনিকয়েট সংস্থার সেক্রেটারি। ২০১৭ সাল থেকে রয়েছেন এই পদে। এছাড়া সর্বভারতীয় ফেডারেশানের জয়েন্ট সেক্রেটারি ও টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান আর পূর্ব ভারতের কনভেনর। প্রথম খেলার সেই অভিজ্ঞতা শোনালেন। তখন ১০ বছর বয়স। হিন্দি না জানার জন্য ভাষা সমস্যা হচ্ছিল। সে এক বিরল অভিজ্ঞতা। তারপর জুনিয়র ও সিনিয়র স্তরে দাপটের সঙ্গে খেলেছেন। ২০০৫-০৬ সালে গুড়াপে অনুষ্ঠিত জাতীয় খেলায় ছিলেন বাংলা টিমের খেলোয়াড়।
২০০৬ সালে চেন্নাইতে বসেছিল প্রথম বিশ্বকাপের আসর। সেই প্রতিযোগিতায় ভারত ছাড়া অংশগ্রহণ করেছিল জার্মানি, বাংলাদেশ, ব্রাজিল, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এখনও পর্যন্ত মোট ৫ টি বিশ্বকাপ খেলা হয়েছে। দক্ষিণ ভারতে টেনিকয়েট খেলাটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। আর বিশ্বে এখনও পর্যন্ত এই খেলায় জার্মানি সেরা।
সামনে বেশ কিছু প্রতিযোগিতা রয়েছে। টেনিকয়েটের মরশুম শুরু হয়ে গেছে। যথারীতি গুড়াপ থেকে কয়েকজন খেলোয়াড় খেলবেন এই প্রতিযোগিতা গুলিতে। যেমন জানুয়ারি মাসে মুর্শিদাবাদে হবে রাজ্য টেনিকয়েট প্রতিযোগিতা। এরপর জানুয়ারি মাসেই অন্ধ্রপ্রদেশে হবে সিনিয়র স্তরে জাতীয় টেনিকয়েট প্রতিযোগিতা। ফেব্রুয়ারিতে সাবজুনিয়র স্তরে জাতীয় প্রতিযোগিতা হবে চেন্নাই শহরে। আর মার্চ মাসে রাজস্থানে খেলা হবে জুনিয়র স্তর জাতীয় প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে সিনিয়র স্তরের প্রতিযোগিতায় বাংলার পুরুষ দলে রয়েছেন কৌশিক কোটাল ও তন্ময় চট্টোপাধ্যায় এবং মহিলা টিমে রয়েছেন কস্তুরী মুখোপাধ্যায়।
সুরজিৎ বাবু কথা প্রসঙ্গে জানালেন আমাদের রাজ্যে এখন টেনিকয়েট অনেক প্রসার লাভ করেছে। আগে বাংলার টেনিকয়েট বলতে বোঝাতো উত্তর ২৪ পরগণা, কলকাতা, বর্ধমান আর হুগলি। কিন্তু এখন পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, মুর্শিদাবাদ, শিলিগুড়ি, বিরভূম, বাঁকুড়ায় খেলাটি বিস্তার লাভ করেছে। গত ২০২২-২৩ সালে বেলঘরিয়ায় রাজ্য প্রতিযোগিতা করতে এক সপ্তাহ লেগেছিল। অনেক ছেলে মেয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। রাজ্যে টেনিকয়েটের জোয়ার বইছে। আর তাতে গুড়াপের স্থান অবশ্যই উল্লেখযোগ্য।










