কিশলয় মুখোপাধ্যায়: সত্যজিত রায়ের বিখ্যাত সিনেমা আগন্তুক। সেখানে দেখা যাচ্ছে মনমোহন মিত্র নাম ভূমিকায় অভিনীত উৎপল দত্ত ৩৫ বছর পর দেশে ফিরে এসেছেন। রঞ্জন রক্ষিত নাম ভূমিকায় অভিনীত রবি ঘোষ বলছেন “একটি জিনিস আপনি বিদেশে নিশ্চয়ই মিস করেছেন যা বাঙালিদের মনোপলি বলতে পারেন তা হল আড্ডা। নির্ভেজাল আড্ডা। রকে বসে আড্ডা, পার্কে বসে আড্ডা, লেকের ধারে বসে আড্ডা , কফি হাউসে বসে আড্ডা। যেটা না হলে বাঙালিদের ভাত হজম হয়না। আড্ডা মেড ইন বেঙ্গল”। এক্ষেত্রে আরো বলা যেতে পারে চায়ের দোকানে আড্ডা বা কারোর বাড়িতে আড্ডা।
গতকাল অর্থাত্ ২৬ নভেম্বর রবিবার বিকেলে হুগলি জেলার বৈদ্যবাটি কামারপাড়ায় বর্ষিয়ান সাংবাদিক, কবি, লেখক সুমিত দাঁ’র বাড়িতে সংবাদ প্রতিখন ও রেডিও প্রতিখনের পরিবার আমরা সবাই মিলে এরকমই এক সাংস্কৃতিক তথা ঘরোয়া আড্ডা দিতে বসেছিলাম।
এই বাংলার শিল্প,সাহিত্য,সঙ্গীত ও অন্য নানা জগতের অনেক গুণী মানুষের উপস্থিতিতে এই আড্ডা এক অন্য মাত্রা লাভ করে। সবথেকে বড় বিষয় ছোটদের যোগদানে এই আড্ডা আরো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আর তাই সাংস্কৃতিক আড্ডা যে কখন ঘরোয়া আড্ডায় পরিনত হল তা টেরই পাওয়া গেলনা।
আজকের যুগে অবশ্য বাঙালিদের আড্ডা না দিয়েও ভাত হজম হয়। এখন চায়ের দোকানে চারজন জড় হলে দেখা যায় ঘাড় গোঁজা, আর হাতে স্মার্ট ফোন, চোখ তার স্ক্রিনে। ছোটদেরও মোবাইলে আসক্তি নিয়ে প্রায়ই নানা আলোচনা হয়। এই আড্ডায় কিন্তু সেই ছোটরাই সন্ধেটা মাতিয়ে দিয়েছিল। এখানে ফোনের কাজ ছিল ক্যামরা রূপে আর কল করা এবং ধরা। কীর্তিকা, জ্যোতিস্মিতা, ধ্রুব, পূর্ণাশা এই সব ছোটরা অসাধারন কবিতা পাঠের পর আমাদের প্রিয় কবি অশোকদা তাঁদের প্রশংসা সূচক কয়েক লাইন কবিতা লিখে উপহার দিলেন। এগুলি তাদের কাছে অমূল্য সম্পদ।
রেডিও প্রতিখন ‘ছোটদের বৈঠক’ নামে একটি অনুষ্ঠান করে। এই বৈঠক পরিচালনা করেন যিনি তিনি হলেন প্রখ্যাত বাচিক শিল্পী সুমিত সেনগুপ্ত। সুমিত দা’র গাইডেন্সে এরা এগিয়ে চলেছে। এই সুমিত দা আড্ডায় আরেক সুমিত দা অর্থাৎ সুমিত দাঁ’ রচিত কবিতা পাঠ করলেন।
সংবাদ প্রতিখনের সম্পাদক স্বরুপম চক্রবর্তীর আন্তরিক আহ্বানে আড্ডায় হাজির হয়েছিলেন কবি ও লেখক সুনীতি ব্যানার্জী, কবি অমর ঘোষ, কবি চন্দ্রশেখর ঘোষ, প্রবীণ লেখক দেবীদাস নন্দী, সমাজসেবায় নিয়োজিত প্রাণ নীলু চক্রবর্তী সমেত দিলীপ সাহা, পারমিতা চক্রবর্তী ভট্টাচার্য্য, সুমন ভট্টাচার্য্য, শান্তি সাহা বাচিক শিল্পী ও অভিনেতা অভিজিত্ ব্যানার্জী, রঞ্জিত চক্রবর্তী, অলোক জানা, আইন বিশেষজ্ঞ দীপঙ্কর ব্যানার্জী, জাকির হোসেন মল্লিক, সংবাদ প্রতিখনের অন্যতম সহ সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান সহ সমাজের নানা স্তরের মানুষেরা।
আড্ডায় ছোটদের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের বাবা-মা রাও সমানভাবে অংশ নিয়ে ভরপুর জমিয়ে দিয়েছেলেন। আড্ডাকে স্বার্থক করতে উপস্থিত ছিলেন নীলেশ দাশগুপ্ত, জয়িতা দাশগুপ্তরা। এর সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের শিল্পের ছাপ রেখে যান পারমিতা চক্রবর্তী ভট্টাচার্য্য, স্বপ্না সিংহরায়, সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রোমি মজুমদার, মধুমিতা সাধুখাঁরা। এর সঙ্গে বর্তমান কালের যুবক সৌম্যদীপ সাহার গানের যাদুতে মাতোয়ারা সকলে।
কবিকণ্ঠে কবিতা, গান, আবৃত্তি, গল্পপাঠ সহযোগে বাঙালির আড্ডা চলবে আর চা-সিঙাড়া হবেনা এটা ভাবাই যায়না। সিঙাড়া পর্ব শেষে আবার শুরু হল আড্ডা। এর মাঝে সংবাদ প্রতিখনের আগামী দিনে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হবে। তার প্রচ্ছদ উন্মোচন করলেন বিশিষ্ট কবি অশোক মুখোপাধ্যায়।
এই আড্ডার রেশ পৌঁছালো সুদূর জার্মানিতে। সেখান থেকে অন্তর্জালে যোগ দিলেন কবি ও যন্ত্রসংগীত শিল্পী শঙ্খ সেন। শঙ্খদা যথারীতি হাজির তাঁর প্রিয় গিটারটি নিয়ে। তিনি শোনালেন, আড্ডা দিলেন। সত্যি কথা বলতে কি এই আড্ডায় এতজনের স্বতস্ফুর্ত যোগদান সত্যিই ভাবা যায়না।
তাইতো শত ব্যস্ততার মাঝেও আড্ডার টানে কিছক্ষণ আড্ডা দিলেন প্রখ্যাত যাত্রা নির্দেশক সূর্যকিরণ বাবু। প্রতিখনের পরের আড্ডার জন্য সব ব্যবস্থা করে দেবেন বলে প্রস্তাবও দিলেন। আমরা আবার সবাই মিলে নির্ভেজাল আড্ডা দেব।
তপন দার কন্ঠে আঞ্চলিক ভাষার আবৃত্তি এক লহমায় সকলকে নিয়ে হাজির করেছিল বাংলার জঙ্গলমহলে। আর আড্ডায় আতিথেয়তার সকল দায়িত্ব সামলালেন দিপান্বীতা দাস।
আড্ডার শেষ লগ্নে হাজির হয়ে তাঁর অপূর্ব গায়কীর মধ্য দিয়ে সকলকে সুরের মায়াজলে আবদ্ধ করে এই আড্ডার এক অন্য মাত্রা দান করলেন সঙ্গীত শিল্পী মৌসুমী দাস সেনগুপ্ত।
আড্ডা শেষ হল সুমিত দাঁ’ স্বরচিতা কবিতার মধ্য দিয়ে, যা তিনি নিজেই পড়লেন। কবিতাটির নাম ‘তোর জন্য’ কবিতাটি লিখেছেন তাঁর মেয়ে অর্থিতার জন্য। আড্ডার শেষে সবার মনের ভেতর রইল একরাশ মুগ্ধতা, সবাই পেলাম নতুন এনার্জি। আর আবারও এই রকম আড্ডার অঙ্গীকার। তবে সবচেয়ে ভালো সময় কাটালো কীর্তিকা, অর্পিতা, জ্যোতিস্মিতা, পূর্ণাশার মতো আজকের প্রজন্মরা যাদের কথা সবসময় ভাবে সংবাদ প্রতিখন।






























খুব সুন্দর অনুষ্ঠান হয়েছে,উদ্যওক্তআদএর অভিনন্দন জানাই।