শীতলা মাতার অন্নকুট উপলক্ষে মেলা

কিশলয় মুখোপাধ্যায়: গ্রীষ্মের এই তপ্ত গরমে ৫ বৈশাখ জমজমাট মেলা বসে হুগলি জেলার গুড়াপে। হাওড়া বর্ধমান কর্ড শাখায় একটি ব্যাস্ত স্টেশন গুড়াপ। স্টেশন থেকে মিনিট দশেক হাঁটাপথে গ্রামের পূর্ব দিকে রয়েছে শীতলা দেবীর মন্দির। এই সময় শীতলা দেবীর অন্নকুটের পুজো হয়। এই মন্দির প্রাঙ্গনেই বসে এই মেলা। আজ থেকে প্রায় বছর ষাটেক আগে দেবীর অঙ্গরাগ অনুষ্ঠান উপলক্ষে চালু হয়েছিল এই মেলা। এই অঞ্চলের কবি যতীন্দ্রমোহন আষ আনুমানিক ১৩৩০-৩১ বঙ্গাব্দে ‘ভক্ত পুষ্পাঞ্জলী’ কাব্য গ্রন্থে ‘শ্রী শ্রী শীতলা দেবী’ কবিতায় লিখেছেন

পূরবে জগত মাতা আছেন শীতলা।

হাটতলা সন্নিকটে প্রকাশ হইলা।।

পূরাকালে এই স্থানে হাট বৈসে ছিল

হাটতলা বলি তেঁই বিখ্যাত হইল।।

এই স্থানে মহাবিদ্যা শীতলা রূপিনী।

চৌষট্টিবসন্ত আদি রোগের জননী।।

গর্দ্দভ বাহন’পরি থাকি অধিষ্ঠান।

করিছেন ভক্তগণে কল্যাণ প্রদান।।

সিন্দুর জিনিয়া মা’র অঙ্গের বরণ।

রাঙ্গা পদে শোভে জবা মধুর দর্শন।।

প্রস্ফুট পঙ্কজ জিনি সহাস্য বদন।

দ্বিভূজা বরদা মুর্ত্তি, শোভে ত্রিনয়ন।।

কক্ষে শোভে রত্ন কুম্ভ শিরে শোভে কুলা।

সন্মার্জ্জনী হস্তে দেবী প্রকট হইলা।।

কথিত আছে ধর্মদাস চট্টখুণ্ডি শুরু করেছিলেন এই মেলা। প্রধানত এই পুজোকে কেন্দ্র করে এই মেলার প্রধান আকর্ষণ। একে কেন্দ্র করে গুড়াপবাসীদের প্রচণ্ড উৎসাহ দেখা যায়। অনেক ভক্তগন শ্রাবনী মেলার মতো ত্রিবেণী থেকে গঙ্গাজল নিয়ে এই পথ অতিক্রম করে জল দেয়। এই প্রথা বছর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া কেউ কেউ মন্দিরের পাশে হাটপুকুর থেকেও জল দেয়।

শীতল আকৃতি বিশিষ্ট বলে দেবীর নাম শীতলা হয়েছে। বাতাসা এই দেবীর বড়ই প্রিয়। বাংলা কাব্য শীতলা মঙ্গল বইতে এই দেবীর নানা কথা বর্ননা করা হয়েছে।

এই পুজো আর বৈশাখের এই মেলা বছর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই মেলায় প্রধান আকর্ষণ অবশ্যই যাত্রাপালা। ‘যাত্রা’ নিয়ে গ্রামবাসীদের মধ্যে দেখা যায় তুমুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা। এ বিষয় কথা হচ্ছিল সঞ্জয় সোমের সঙ্গে। সঞ্জয় বাবুও অভিনয় করছেন। সঞ্জয় বাবুদের যাত্রা দলের নাম মা শীতলা যাত্রা ইউনিট। যাত্রাপালার নাম ‘বৌমা তোমার পায় নমস্কার’। সঞ্জয় বাবুর চরিত্রের নাম বরুণ, এই পালায় তিনি একজন সাহিত্যিক। এটি অনুষ্ঠিত হবে ৭ বৈশাখ। এই পালা লিখেছেন বিখ্যাত রচনাকার ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়। নির্দেশনায় রয়েছেন তমাল দেওয়ান। আগের দিন ৬ বৈশাখ নেদামপুর প্রগতী সংঘ কানন মাইতির রচনা প্রভাস পোড়েলের নির্দেশনায় যাত্রাপালার নাম ‘ আসছে কলির ভগবান’। নেদামপুর দুর্গামন্দিরে চলছে জোর কদমে রিহার্সাল। ৮ বৈশাখ শনিবার হবে তপন দাসের নির্দেশনায় ‘ বিসর্জনে দেবী বোধন’। অর্থাৎ তিনদিনের জমজমাট যাত্রার আসর। তাই সারা বছর সবাই অপেক্ষা করে থাকে এই মেলার জন্য। থাকে হরেক রকম দোকানের সম্ভার। পাণ্ডুয়া, মগরা, বর্ধমান, মেমারী, জিরাট, বলাগড় ইত্যাদি জায়গা থেকে আসে, এখানে স্টল দেয়। বিক্রি হয় নানা জিনিস।

যতীন্দ্রমোহন আষ কবিতায় শেষের দিকে লিখছেন

হেন মা শীতলা দেবী পূরবে থাকিয়া।

রেখেছেন গ্রাম খানি শীতল করিয়া।।

দেবীকে পুজো দিয়ে মেলা থেকে পসার কিনে বাড়ি ফেরে ভালো থাকার আশায় আর অপেক্ষায় থাকে সামনের বছর মেলার জন্য।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading