নববর্ষের ইতিহাস

আগামীকাল বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন, এই উপলক্ষে বাংলা নববর্ষের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেন সাংবাদিক আত্রেয়ী দো

“মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,

অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা

রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,

আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।

মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক

এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো”     – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রাত পোহালেই বাংলা নববর্ষ। এই বাংলা নববর্ষের প্রচলন কিভাবে হল তা জানতে হলে আমাদের ইতিহাসের পাতায় ডুব দিতে হবে।

বাংলা বছরের প্রথম মাসের প্রথম দিনে অর্থাৎ পয়লা বৈশাখের দিনে এই বাংলা নববর্ষ উৎসব পালন করা। এই বাংলা বছর বা বাংলা পঞ্জিকার উদ্ভব কিভাবে হল? শুধু তাই নয়, বাংলার ১২টি মাস এবং এর দিনক্ষণ নির্ধারণ হলো কিভাবে ? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

বাংলা বছরকে বাংলা সন এবং বাংলা সাল উভয় নামেই ডাকা হলেও শব্দ দুটি কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন ভাষা থেকে গৃহীত। সন শব্দটি আরবি ভাষা এবং সাল শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে নেওয়া।

বাংলা বছর গণনা চালু হওয়া নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানান মতভেদ রয়েছে।

একদল ঐতিহাসিকদের মতে, পৃথিবীর প্রথম নৃতত্ত্ববিদ অলবিরুনী রচিত ‘কিতাব-উল-হিন্দ’ -এ ভারতবর্ষের যেসব অব্দের উল্লেখ রয়েছে যেমন – শ্রীহর্ষাব্দ, বিক্রমাব্দ, শকাব্দ,গুপ্তাব্দ ইত্যাদি তাতে বঙ্গাব্দের কোনো উল্লেখ নেই। অর্থাৎ বলা যেতে পারে মুঘল আমলেই বাংলা বছরের সূচনা ঘটে।

প্রাচীনকালে সৌরবর্ষপঞ্জি অনুসারে বাংলা মাস নির্ধারণ করা হতো। বাংলা,ত্রিপুরা,পাঞ্জাব, আসাম, তামিললাড়ু ইত্যাদি এলাকার সংস্কৃতিতে বছরের প্রথম দিন উদযাপনের রেওয়াজ ছিল। মনে করা হয় বাংলার সাল বা পঞ্জির উদ্ভাবক ছিলেন গৌরাধিপতি শশাঙ্ক। সম্রাট আকবর রাজস্ব এবং খাজনা আদায়ের উদ্দেশ্যে সেটিতে কিছু পরিবর্তন আনেন। সম্রাট আকবরের প্রবর্তিত পঞ্জিকার নাম প্রথমে ছিল ‘তারিখ-এ- ইলাহী’। এই পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা মাসগুলির নাম ছিল আর্বাদিন,কার্দিন,বিসুয়া, তীর ইত্যাদি। পরবর্তীকালে বাংলা মাসগুলির নাম কবে পরিবর্তন হলো সে বিষয়ে নিশ্চিত করা বলা যায় না। কিন্তু প্রচলিত আছে যে, বিভিন্ন নক্ষত্রের নাম অনুযায়ী বাংলা ১২টি মাসের নামকরণ করা হয়েছে। যেমন-

বিশাখা নক্ষত্রের নাম থেকে বৈশাখ,

জ‍্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নাম থেকে জ‍্যৈষ্ঠ,

অষাঢ়া নক্ষত্রের নাম থেকে আষাঢ়,

শ্রবণা(মতান্তরে শ্রাবণী ) নক্ষত্রের নাম থেকে শ্রাবণ,

ভদ্রা নক্ষত্রের থেকে ভাদ্র,

অশ্বিনী নক্ষত্রের নাম থেকে আশ্বিন,

কৃত্তিকা থেকে কার্তিক,

মৃগশিরা নক্ষত্রের নাম থেকে অগ্রহায়ণ (প্রসঙ্গত বলা যায় অগ্রহায়ণ মাসকে মার্গশীর্ষ বলা হয়),

পুষ‍্যা নক্ষত্রের নাম থেকে পৌষ,

মঘা নক্ষত্রের নাম থেকে মাঘ,

ফাল্গুনী নক্ষত্রের নাম থেকে ফাল্গুন ও

চিত্রা নক্ষত্রের নাম থেকে চৈত্র।

ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য পরিচালিত হতো হিজরি সন বা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে। হিজরি পঞ্জিকা চন্দ্রমাসের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু কৃষকদের কৃষিকাজ চন্দ্রমাসের উপর নির্ভরশীল হিজরি পঞ্জিকার সঙ্গে মিলতো না। ফলে, ফসল কাটার আগেই খাজনা দেওয়ার সময় এসে যাওয়ার জন্য তাদের সমস্যায় পড়তে হত। কৃষকদের যাতে খাজনা দিতে অসুবিধা না হয় সে কথা চিন্তা করে সম্রাট আকবর বর্ষপঞ্জিতে কিছু বদল আনেন। সেই সময়কালীন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ এবং চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সম্রাট আকবরের নির্দেশ অনুযায়ী হিজরি সন ও সৌর সনের ভিত্তিতে বাংলা সনের গণনার নিয়ম তৈরি করেন।

১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মতান্তরে ১১ই মার্চ থেকে প্রথম বাংলা সাল গণনা করা শুরু হয়। ১৫৫৬ সালের ৫ই নভেম্বর থেকে খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা সাল গণনা করা শুরু হয়। ফসল কাটা এবং খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এই সাল গণনা শুরু হয়েছিল বলে প্রথমে এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফসলি সন’ । পরে এটি বাংলা সন নামে পরিচিত হয়। কৃষকদের শুল্ক,খাজনা জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল চৈত্র মাসের সংক্রান্তি অর্থাৎ শেষ দিন। সেই থেকে তারপরের দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ সম্রাট আকবর কৃষকদের জন্য মিষ্টিমুখ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। এভাবে নতুন বছরের কে স্বাগত জানানো হতো। সম্রাট আকবরের আমল থেকেই হালখাতার প্রচলন হয়।

বাংলা সন যে বছর প্রবর্তন করা হয়,সেই বছর হিজরি সন ছিল ৯২৩ হিজরি। সম্রাট আকবরের নির্দেশে বাংলা সাল গণনা শূন্য থেকে শুরু না হয়ে , ৯২৩ বছর থেকে শুরু হয়। ৯৬৩ সনের হিজরি মহরম মাসের ১ তারিখ থেকে বৈশাখ মাসের প্রথম দিন গণনা করা হয়। সেই সনের পয়লা মহরম এবং পয়লা বৈশাখ একই দিন ছিল। সেই থেকে হিজরি ৯৬৩ সনের সঙ্গে বঙ্গাব্দ যুক্ত হয়ে গণনা আসছে।

আর একদল ঐতিহাসিকদের মতে, ভারতের পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পলিতে নববর্ষের উৎসবের সঙ্গে হিন্দু বিক্রমী দিনপঞ্জির মিল রয়েছে। তাদের মধ্যে গৌর আদিবাসী শশাঙ্কের আমলে,৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে এই নববর্ষের সূচনা হয়েছিল।

অপর একদল ঐতিহাসিকদের মতে, খ্রিস্টাব্দের পূর্ববর্তী সময়ে স্রংসন নামক একজন তিব্বতী রাজা পূর্ব এবং মধ্য ভারত জয় করেন। কৃষিকাজে তিনি তিব্বতের প্রচলিত রীতি চালু করেন। তার নাম অনুসারে সন শব্দটি এসেছে বলে মনে করা হয়।

তবে সূচনা নিয়ে যতই মতভেদ থাকুক, তা বর্ষবরণের আনন্দে কোনোদিনই কোনো প্রভাব ফেলেনি। বয়:জ্যেষ্ঠদের প্রনাম, দোকানে দোকানে হালখাতা, মিষ্টির প্যাকেট ও নতুন বাংলা বর্ষপঞ্জী(ক্যালেন্ডার) সংগ্রহ, নতুন পোশাক, জমিয়ে পেটপুজোর মাধ্যমে আরও এক নতুন বছরের সূচনা হোক, বজায় থাকুক এই চিরাচরিত বাঙালি ঐতিহ্য।

তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট
error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading