আধুনিক ভারতের সুশ্রুত, নবজাগরণের পথিকৃৎ পন্ডিত মধুসূদন গুপ্ত

জয়িতা সরকার: “দেয়ালে রয়েছে মধু ছবিতে চাহিয়ে। /  শিখেছিল এনাটমি আগে জাত দিয়ে”-(সুরধুনী কাব্য/দীনবন্ধু মিত্র ) । পিছিয়ে থাকা এই সমাজে পরম আকাঙ্ক্ষিত আলো এনে ,মরণকে মননে ধাবিত করা এক  মানুষ বৈদ্যবাটীর এক বৈদ্যকে নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে অথবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে বেশ খানিকটা অজ্ঞানতা দেখেছি। তথ্য সমুদ্র তো গুগলে, ইউটিউবে অজস্র আছে। (তবে youtube এ কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখেছি বৈদ্যবাটী সম্পর্কিত প্রচুর ভুল তথ্য দিয়ে শুধু বাইরের চমকটি বজায় রাখা হয়েছে)। দুটি আগ্রহী প্রিয় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে বেড়াতে চলে গেলাম সেদিন ঐ প্রাচীন চিকিৎসক মধুসূদন গুপ্তের বাড়িতে। ওরা অঙ্কন এবং অভিজিৎ, সবে দশম শ্রেণিতে উঠলো।

এদিক-ওদিক রহস্যময়তায় ঘেরা নির্জনতার মধ্য থেকে হালকা হালকা পাখির ডাক আমাদের কেমন আকৃষ্ট করছিল। চারিদিকে কোথায় কোথায় ভূতের আস্তানার দুর্নাম আছে,  সেগুলো আমার ছেলে দুটো বলছিল কয়েকটা। তবে ওরা এমনিতে বাস্তববাদী, গল্পে গল্পে যাত্রাটুকু মধুর হয়ে উঠেছিল আর কি। মধুসূদন গুপ্তের পূর্বপুরুষ ‘বক্সী’ উপাধি পেয়েছিলেন। ওঁদের দুর্গাপুজো নাকি বৈদ্যবাটীর সব থেকে পুরনো পুজো।  ৩০০ বছরের বেশি পুরনো। পুজোর জন্য প্রয়োজনীয় বেশ কিছু ঘর রয়েছে। জনশ্রুতি, কাজী নজরুল ইসলামও এইখানে নাকি এসেছেন। বহু বিশিষ্টজন যে এসেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। বেদী দর্শন করলাম। শ্রদ্ধা জানালাম মধুসূদন গুপ্তকে তাঁর নিজস্ব কক্ষটিতে ঢুকে। কেয়ারটেকার ভদ্রলোক মাননীয় রতন নন্দী দাদা মূল্যবান কিছু সময় দিলেন হাসিমুখে। সেখানে সেকালের দু একটা ছবি,  জলচৌকি, চেয়ার-টেবিল ছাড়া বিশেষ কিছু পেলাম না। অমূল্য গ্রন্থরাজি কিছু কিছু এখানে নাকি ছিল। এখন আর নেই।

শুধু ছোটদের মধ্যেই নয়,  মধুসূদন গুপ্ত অনেক বড় মানুষেরও অজানা। কিন্তু সেই ভয়ংকর অন্ধকার যুগে যে পরিমাণ আলো আনার কাজ তিনি করেছিলেন, তা কি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়? ভারতবর্ষে প্রথম কলকাতা মেডিকেল কলেজে আধুনিক পদ্ধতিতে শব ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন মধুসূদন গুপ্ত, যা পথপ্রদর্শনের কাজ করেছিল সমাজে তথা চিকিৎসাশাস্ত্রে। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় মেধাবী বীর দৃঢ়চিত্ত মানুষের অভাব নেই। বহু প্রতিকূলতাকে জয় করেছেন এবং সত্যের পথে, জ্ঞানের পথে হেঁটে গেছেন, এমন এক সাহসী বাঙালি মধুসূদন গুপ্ত। যাঁর জন্য জাতি গর্ব করতে পারে। অবশ্যই স্থানীয় মানুষের গর্বের বিষয়। তবে জানতে হবে এবং তারপর এখানেই সীমাবদ্ধ না থেকে উত্তরণের পথে এগিয়ে যেতে হবে। সমগ্র জাতীয় ক্ষেত্রে তিনি যে অনন্য নিদর্শন উপস্থাপিত করেছিলেন, পরবর্তীকালে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কিন্তু তার সুফল ভোগ করছে। এইভাবে আধুনিক মানুষ কত মহান জনের উদারতা,  জ্ঞান চর্চা,  অবদান ভুলেই গেছে। কিছু কিছু সভা সমিতিতে আলোচনা করা হয় বটে মধুসূদন গুপ্তের কৃতিত্ব নিয়ে। সেই বিষয়টি আরো বেড়ে উঠুক,  অজ্ঞানতার অন্ধ কুয়োয় পড়ুক আলোর হানা। জ্ঞানপথের পথিক সত্যনিষ্ঠ মানুষের যাবতীয় ভয়,ভয়াবহ কুসংস্কার ,ধর্মচ্যুত-সমাজচ্যুত করার হুমকি- কোন কিছুতেই পিছপা হওয়ার নেই,  তিনি দেখিয়েছেন। সত্যিই স্বাভাবিকভাবেই কাজটি করবার আগে এসেছিল প্রবল বাধা এবং কাজটি করবার পর তাঁকে সত্যিই সমাজচ্যুত হতে হয়েছিল। কিন্তু মহাপুরুষ কর্ম দেখেন, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে ভাবেন না। মধুসূদন গুপ্ত ভাবেননি। অবজ্ঞা পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর কর্মের অন্তরালের সত্য বিকৃত হবেনা।জ্ঞানী মানুষ তাঁর যত্ন করেছিল, করবে। তাঁর জীবদ্দশায়ই বেথুন সাহেব তাঁর তৈলচিত্র আঁকিয়ে মেডিকেল কলেজে দান করেন।

বৈদ্যপাড়ার (বর্তমান মধুসূদন গুপ্ত লেনে)দ্বারিকা ভবন বক্সি বাটিতে ১৮০০ (মতান্তরে ১৮০৬)-এ জন্ম তাঁর। বাবা বলরাম বাবুর তিরস্কারে তিনি নাকি বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু হারিয়ে যাননি, পড়াশোনা করে উন্নতির দিকে এগিয়ে গেছেন। ক্রমে তিনি কলকাতা কলেজে পড়াশোনা করেন এবং সংস্কৃত শাস্ত্র ও আয়ুর্বেদ চিকিৎসাশাস্ত্র রপ্ত করেন ভালোভাবে। দ্রুত তিনি কলেজে শিক্ষকের পদও পান। শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি দেশীয় পদ্ধতি ছাড়াও পাশ্চাত্য পদ্ধতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন যে, শারীরবিদ্যার উপযুক্ত অধ্যয়ন ছাড়া চিকিৎসাশাস্ত্রের সঠিক পাঠ একদমই অসম্পূর্ণ থাকে। তখন বিশিষ্ট বিদ্বান সাহেবের কাছে নিজস্ব চেষ্টায় তিনি যত্ন সহকারে এনাটমি শিক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু সে সময় প্রয়োজনীয় কাজ অর্থাৎ শিক্ষার জন্য মানুষের মৃতদেহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ব্যবচ্ছেদ করার ব্যবস্থা ছিলই না। তা ছিল অকল্পনীয়। নানাপশুর দেহ, কাঠ ও মোমের মডেল ইত্যাদি ব্যবহার করা হতো। পিছিয়ে পড়া মানসিকতা ও রক্ষণশীলতাই মূল বাধা। তবুও কলকাতা মেডিকেল কলেজে এরই মধ্যে পাঠদানের সময় মৃতদেহ দর্শন করালেন সাহেব শিক্ষক ,ছাত্রদের মধ্যে আলোড়ন জাগলো। এরপরে এল ৩০০০ বছরের আগল ভেঙে দেওয়া ইতিহাস তৈরির সেই দিনটি। সমস্ত কুসংস্কারের বেড়াজাল চোখ রাঙানি পার করে ১৮৩৬ সালের ১০ই জানুয়ারি (কেউ কেউ বলেন, অক্টোবর মাসে) শব ব্যবচ্ছেদ করলেন বাঙালি পন্ডিত শিক্ষক চিকিৎসক মধুসূদন গুপ্ত।

আস্তে আস্তে খবর প্রচারিত হলে সে সময়ের কুসংস্কারগ্রস্ত হিন্দু সমাজে। বিশাল আলোড়ন পড়ে যায় এবং মধুসূদনকে সমাজচ্যুত করা হয়। মৃতদেহ ছোঁওয়ার জন্য বা ব্যবচ্ছেদ করার জন্য। ছাত্ররা অনেকেই প্রেরণা নিলেন। পরে অনেক জন এই কাজে এগিয়ে এসেছেন। সাধারণভাবে সমাজে এসব আটকাতে হাজারটা গুজব ছড়ানো হতো। আক্রমণের আশঙ্কা তো থাকতোই। মূর্খদের দ্বারা প্রগতির পথে বাধা দিয়ে দেশকে পিছিয়ে দেবার এমন প্রবণতা তো বারবার দিকে দিকে দেখা গেছেই। মূল্যবান বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা ও অনুবাদ করেছিলেন মধুসূদন। নানা বিষয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে দেশে-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। বেশ কিছু গবেষণালব্ধ ফলাফল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর গবেষণার পথ ধরেই নাকি এই দেশের কিছু বিশেষ চিকিৎসা লাভবান হয়েছিল, যেমন প্রসূতি চিকিৎসা। এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় এইভাবে তিনি নানা দিক থেকেই আধুনিকতার জোয়ার এনে দেন। যুগের থেকে এগিয়ে থাকা মানুষ তো এভাবেই দেশ ও জাতিকে এগিয়ে দেন। এই তো নবজাগরণ।

বেশ কম বয়সেই, মাত্র ৫৬ বছরেই কোন রোগীর বা মৃতদেহের থেকে জীবাণু সংক্রমণের কারণে এই আধুনিক ভারতের সুশ্রুত পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।  ২০২২ সালের দ্বাদশ বিজ্ঞান জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে মধুসূদন গুপ্তের জীবন কেন্দ্রিক তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। সেটি তৈরি করেছে হুগলি কলেজিয়েট স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র অভিজ্ঞান।

তাঁর বিষয়ে কলকাতা মেডিকেল কলেজের তৎকালীন অস্থায়ী অধ্যক্ষ উইলসন সাহেব বলেছিলেন, বাঙালি কোথাও না কোথাও তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠিত করবে। এই সূত্রে প্রকাশ করি ব্যক্তিগত অভিমত,  প্রশাসন যদি একটি উদ্যোগ নেন, মঙ্গল হয়। গঙ্গার পাশে কুমার পাড়া ঘাটে, যেখানে সৎকার হয়েছিল তাঁর, সেখানে যদি একটি স্মৃতিস্তম্ভ বা আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হয়,  মনে হয় ভালো কাজ হবে, কারণ বৈদ্যবাটীর এই ভূমিপুত্র জাতীয় ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপিত করে বাঙ্গালীকে গর্বিত করেছেন। তিনি অনুপ্রেরণা। অসামান্য তাঁর অবদানকে মানুষ কি গুরুত্ব দেবে না?

%d bloggers like this: