হারিয়ে যাচ্ছে এই বাংলার যে উত্‍সব

এই বাংলার বেশ কিছু উত্‍সব, যা  আধুনিকতার যাঁতাকলের চাপে আজ লুপ্তপ্রায়, এইরকমই এক উত্‍সব পৌষ তোলা বা মুঠি আনাএই উত্‍সব নিয়ে কলম ধরলেন সংবাদ প্রতিখনের সাংবাদিক কিশলয় মুখোপাধ্যায়

 

কিশলয় মুখোপাধ্যায়: গ্রাম বাংলার কৃষি উৎসব দুটি, নবান্ন আর পৌষ। মাঠ থেকে ধান তোলার শেষ দিনে কৃষকের ঘরে ঘরে যে উৎসব হয় তার নাম পৌষ। নবান্ন হল নতুন ধানের উৎসব আর পৌষ হল ফসল ঘরে তোলার শেষ দিনের উৎসব। তবে এই উৎসব ক্রমশ বিলুপ্তির পথে। ২৩ ডিসেম্বর ছিল ‘জাতীয় কিষাণ দিবস’।  কৃষক দিবসের দিন এই পৌষ উৎসব নিয়ে নানা কথা হল কয়েকজন বর্ষীয়ান কৃষকের সঙ্গে। যেমন গোপাল চন্দ্র দেওয়ান। তাঁর পারিবারিক খামারে পৌষের রোদে বসে কথায় কথায় তিনি বললেন ধান হল লক্ষ্মী। লক্ষ্মী হল শ্রী সম্পদের প্রতিক। তাই ধানকে আমরা শ্রী লক্ষ্মী রূপে পুজো করি। তিনি আরো বললেন যে এই কৃষি উৎসবকে কোথাও বলে ‘ পৌষ তোলা’ আবার কোথাও বলে ‘মুঠি আনা’। কেউ বলে ‘গুছি আনা’। হুগলি জেলায় বলে ‘পৌষ’ আবার মুর্শিদাবাদে এর নাম ‘দাওন আনা’। বিভিন্ন নামে এই পৌষ নির্দিষ্ট একটা দিনে হয়না। যেদিন কৃষক শেষ দিনের ফসল ঘরে নিয়ে আসেন সেই দিন হয় এই দাওন আনা উৎসব।তিন থেকে সাত গোছা ধান না কেটে গোড়া সমেত রেখে দেওয়া হয়। এই গোছাকে ‘ঝাড়’ ও বলা হয়। এই গোছাই হচ্ছে পৌষ আর একেই যত্ন করে পুজো করে বাড়িতে আনা হয়। এমনটাই জানালেন আরেক বর্ষীয়ান কৃষক ক্ষুদিরাম নায়েক। ক্ষুদিরাম বাবুর পরিবারের সদস্যরা বললেন সেদিন সকাল থেকে শুরু হয়ে যায় ব্যাস্ততা।

পুজোর জন্য লাগে এক ঘটি জল, আমপাতার সিঁদূর, কিছু ফুল এবং থাকে একটি কাস্তে। এছাড়া থাকে একটি বাটিতে ভেজানো চাল ও গুড়। কৃষক স্নান করে নতুন পোষাক পরে মাঠে পৌঁছান। ধানের গোছা বা ঝাড় গুলোকো পুজো করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য এই পুজোয় কোন পুরহিতের দরকার পড়েনা। পুজো শেষ হলে ওখানে উপস্থিত সবাইকে গুড় ভেজানো চাল দেওয়া হয়। এটাই হল প্রসাদ। এরপর একটি বাচ্চা ছেলে সে কৃষকের ছেলে বা নাতি সেও নতুন ধুতি পরে নতুন গামছায় পৌষকে জড়িয়ে নিয়ে মাঠ বা জমি থেকে ঘরের আঙিনায় পৌঁছালে বাড়ির মহিলারা শাঁখ বাজিয়ে পৌষকে স্বাগত জানায় এবং শাঁখ বাজিয়ে ও জল ধারা দিয়ে খামারে যান। খামারে মাথা থেকে ধান নামিয়ে ধানের পালুইতে সেই ধান রাখা হয়। ধানের পালুই হল ধানের স্তুপ আর খামারে এই পালুই থাকে এবং এখানেই ধান ঝাড়া হয়। এরপর এই ধান রাখা হয় মরাই বা গোলাতে। ধানের মরাইতে চারপাশ টা বিনুনির মতো থাকে। আর ধানের গোলা ছাতার মতো ঘর হয়। উৎসবের দিন বাড়ির মহিলারা গোয়ালঘর পরিস্কার করেন, খামার পরিস্কার করেন। আর থাকে মরাই বা গোলার কাছটায় চালের আলপনা। প্যাঁচা, গোরু, কাস্তে, কুলো, ঢেঁকি এই সব চাষের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় ফুটে ওঠে আলপনায় আর থাকে কল্কা। অনবদ্য লাগে দেখতে। মাঠ থেকে পৌষ আনার পর গোয়াল ঘরে গরুকে  যত্ন করা হয়। গোরুদের পা ধুইয়ে দেওয়া হয়, শিং এ তেল লাগানো হয়। বিভিন্ন তরকারি সহযোগে ভাত খেতে দেওয়া হয়। এই যত্নের পেছনে কারনটা হল চাষের কাজে গোরুর পরিশ্রমও অনেকখানি।

গোপাল বাবু ও ক্ষুদিরাম বাবু ও তাঁদের পরিবারের সাথে এই আড্ডায় আর কথোপকথনে বেড়িয়ে এল এই উৎসবের খুঁটিনাটি দিক। তবে আমি যে ‘হয়’ লিখছি আসলে বেশিরভাগই বলা যায় ‘হত’। এই প্রসঙ্গে গোপালবাবু বললেন এখন স্বাভাবিক ভাবেই যন্ত্রের ব্যাবহার অনেক বেশি। গোপালবাবুদের গোয়ালঘর ,গোরু রয়েছে। কিন্তু লাঙল টানে এখন যন্ত্র। মেশিনে ধান কাটা হচ্ছে তাই অগ্রহায়নেই প্রায় সব ধান ঝাড়া হয়ে যাচ্ছে। অতীতে হত জমিয়ে খাওয়াদাওয়া। এখন পূর্ব বর্ধমানে কিছুটা আছে। এখন কিছু কিছু পরিবারে এই প্রথাটি আছে তবে বেশিরভাগ পরিবার নবান্নটা করে। ক্ষুদিরাম বাবু বললেন ধানের মরাইয়ের কাছে একটি পিঁড়িতে এক ঘটি জল রাখা হয়। মাঠ থেকে পৌষ বা ধান বা মা লক্ষ্মী এসে হাত ও পা ধুয়ে মরাইয়ের ওপরে অধিষ্ঠান করেন। কৃষক ও তাঁর পরিবার প্রণাম করে বলে ‘ এস পৌষ, যেয়োনা।’ কৃষকের কাছে ধানই হল মা লক্ষ্মী। গ্রাম বাংলার কৃষি উৎসবের মধ্যে ‘নবান্ন লক্ষ্মী’র ব্যাপ্তি বাড়ছে। সামাজিক মাধ্যমে এর উপস্থিতি এখন ব্যাপক। কিন্তু অন্য দিকে ‘পৌষলক্ষ্মী’ ক্রমশ বিলুপ্তির পথে।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading