বিস্মৃত বাঙ্গালী-উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী

গতকাল ছিল ভারতের তথা বিশ্বের চিকিত্‍সাশাস্ত্রের ইতিহাসের এমন এক বঙ্গ সন্তানের জন্মদিন, যাঁকে আমরা ভুলতে বসেছি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে ঘটা এক যুগান্তকারী আবিস্কার করা সেই বঙ্গসন্তান উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদনে পারমিতা চক্রবর্তী ভট্টাচার্য্য

ইউরিয়া স্টিবামাইন, বিংশ শতকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে ঘটা এক যুগান্তকারী আবিস্কার। যখনকার কথা বলা হচ্ছে তখন আ্যন্টিবায়োটিক কাকে বলে আমরা জানিনা। মাত্র কয়েকটি হাতে গোনা সরাসরি রোগের ঔষধ (direct medicine ) তখন বাজারে, যেমন ম্যালেরিয়ার জন্য কুইনাইন, রক্তাল্পতার জন্য আয়রন, হৃৎ সমস্যার জন্য ডিজিটালিস, সিলিফিসের জন্য আর্সেনিক যৌগ। এর বাইরে আর সমস্ত রোগের চিকিৎসা হত তখন উপশমকারী চিকিৎসা পদ্ধতিতে, অর্থাৎ রোগ দমনের উপায় নেই হেতু চিকিৎসকরা উপসর্গ নির্ণয়পূর্বক উপশম প্রদানের দিকেই অগ্রসর হতেন। ১৯০০ শতকের গোড়ার দিক। দেশে তখন কালাজ্বর প্রায় মহামারীর আকার নিত। বিনা চিকিৎসায় মারা যেত কাতারে কাতারে মানুষ। কালাজ্বরের প্রকোপে পরে মূলতঃ বাংলা ও আসামের গ্রাম শহরে যেন মড়ক নেমে আসত। পরিত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসেন এক সুশিক্ষিত বঙ্গসন্তান। ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলের (বর্তমানের নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল ) ল্যাবরেটরীতে ঘটে যায় এক যুগান্তকারী আবিস্কার। ১৯২০ সালে তাঁর আবিস্কৃত ইউরিয়া স্টিবামাইন, যা একটি আ্যন্টিমনি ঘটিত জৈব যৌগ, কালাজ্বরের প্রতিষেধকরূপে সেটি চিকিৎসা জগতে সেযুগে যথেষ্ট আলোড়ন ফেলেছিল। এতক্ষনে নিশ্চয় বোঝা গেছে আমরা কার কথা বলছি। উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী ১৯১৫ থেকে এই কালাজ্বরের প্রতিষেধক নিয়ে গবেষনা শুরু করেছিলেন ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলে। ১৯২০ তে সফল হলেন  লক্ষ্যে। ১৯২৩ এ প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে আসামে এটি কালাজ্বর দমনে প্রয়োগ করা হয়। ১৯২৮ সালে বহুলভাবে এর ব্যবহার শুরু হয়ে যায়। ১৯৩৩ সালে এই ওষুধ প্রয়োগে শুধুমাত্র আসামেই ৩.৫ লক্ষ লোকের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে তাঁর নাম ১৯২৯ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের জন্য তালিকায় মনোনীতও হয়। আমাদের দুর্ভাগ্য এতবড় আবিস্কার করেও তিনি নোবেলের যোগ্য হলেন না। দেশের গন্ডি পেরিয়ে গ্রীস, চীন এমনকি ফ্রান্সেও বহুলভাবে কালাজ্বর দমনে কাজে লাগে এই ইউরিয়া স্টিবামাইন, কিন্তু অদ্ভুতভাবে এই আবিস্কারের কোনো patent করা হয়নি। বর্ধমানের পূর্বস্হলীর সরডাঙা গ্রাম। ১৮৭৩ সালের ১৯ শে ডিসেম্বর উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর জন্ম। পিতা তৎকালীন পূর্বরেলে চাকুরীরত চিকিৎসক নীলমনি ব্রহ্মচারী ও মাতা সৌরভ সুন্দরী দেবী। বর্ধমানের জামালপুরে বিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপন করে ১৮৯৩ সালে গনিত ও রসায়ন নিয়ে হুগলী মহসীন কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করেন। ১৮৯৪ এ উচ্চতর রসায়ন নিয়ে প্রেসীডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতোকোত্তর পাশ করেন। এরপর ১৯০০ সালে কলকাতা  বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিসিন  ও surgery তে প্রথম স্হানাধিকার করে গুডিভ ও ম্যাকলেয়ড পুরস্কার সহ এম.বি. পাশ করেন। ১৯০২ এ পাশ করেন এম.ডি. এবং ১৯০৪ এ তাঁর গবেষনা সমাপন হয় কলকাতা  বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। গবেষনার বিষয় ছিল Studies on Haemolysis . ইতিমধ্যে তিনি ১৮৮৯ সালে  শুরু করেছেন তাঁর কর্মজীবন প্যাথোলজি ও মেটেরিয়া মেডিকার শিক্ষক হিসেবে। ১৯০১ সালে ঢাকা মেডিক্যাল স্কুলে  তিনি চিকিৎসক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯০৫ এ ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলে (বর্তমানের নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল ) মেডিসিনের শিক্ষক ও চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করেন। এখানের ল্যাবরেটরীতে বসে বসে দিনের পর দিন গবেষনার করে গেছেন আর অবশেষে আবিস্কার হয়েছে কালাজ্বরের প্রতিষেধক। ১৯২৩ সালে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অতিরিক্ত চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯২৭ সালে সরকারি নিয়মে অবসরগ্রহন করেন। কিন্তু অবসরগ্রহনের সাথে সাথেই  তাঁর কর্মজীবন শেষ হয়ে যায়নি বরং আরো গভীর ভাবে জড়িয়ে গেছেন কাজের মাধ্যমে সমাজের উন্নতিকল্পে। কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজের নাম শুনেছেন, এটি বর্তমানে আর.জি.কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। ডঃ উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী অবসরগ্রহনের পর সেখানেই ট্রপিক্যাল ডিসিসের প্রফেসর হিসেবে নিযুক্ত হন। চিকিৎসাক্ষেত্রে আর একটি জনকল্যানমূলক পরিষেবা তাঁর হাত ধরেই আমরা পেয়েছি। আজ যে এতো রক্তদানের কথা আলোচিত হয় তার প্রশ্নই উঠতো না যদি না রক্তসন্চয়ের ব্যবস্হা থাকতো। এব্যাপারেই চলে আসে ব্লাড ব্যাঙ্কের কথা। আর এই ব্লাড ব্যাঙ্কের ভাবনাটাও ওনারই ছিল। পৃথিবীতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম ব্লাড ব্যাঙ্ক স্হাপিত হয় ১৯৩৭ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে। তার ঠিক বছর দুয়েক পরই ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে পৃথিবীর দ্বিতীয় ব্লাড ব্যাঙ্ক স্হাপিত হয় কলকাতায়, উদ্যোক্তা ছিলেন ডঃ উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী। সেই সূত্রে তিনি বেশ কিছু সাম্মানিক পদ অলংকৃত করেছেন, যেমন ব্লাড ট্রান্সফিউশন সোসাইটি অফ বেঙ্গলের চেয়ারম্যান, সেন্ট জন্স আ্যম্বুলেন্স অফ বেঙ্গলের সহ সভাপতি ও সভাপতি; আবার ভারতীয় রেড ক্রস সোসাইটি অফ বেঙ্গলের পরিচালন সমিতির চেয়ারম্যানও পদেও আসীন ছিলেন। ভারতীয় যাদুঘর (কলকাতা) এর ট্রাস্টি বোর্ডের সহ সভাপতি , বছর দুয়েকের মতো এশিয়াটিক সোসাইটির প্রেসিডেন্ট, ১৯৩৬ সালে ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটি ও ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট এরকম বিবিধ দিকে তার কর্মচন্ঞল জীবনের পরিধি বিস্তৃত ছিল। চিকিৎসা ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি অনেক পুরস্কার ও পদক পান কলকাতা  বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়াটিক সোসাইটি, স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন প্রভৃতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। আবার অন্যদিকে রায়বাহাদুর উপাধিও তিনি লাভ করেন। ১৯৩৪ সালে বৃটিশ সরকার ডঃ উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীকে নাইট উপাধিও দেন। রয়্যাল সোসাইটি অফ মেডিসিন, লন্ডন থেকে সাম্মানিক ফেলোশিপও তিনি পান। সারা জীবন দিয়ে শুধুই কাজের গভীরে ব্যপ্ত রেখেছেন নিজেকে, একের পর এক জনসেবামূলক কর্মে নিয়োজিত থেকে দেশ ও সমাজের উন্নতিকল্পে নিয়োজিত থেকেছেন। আজও গুটিকয়েক যুগান্তকারী আবিস্কারের তালিকায় তাঁর আবিস্কার ; ভারতীয় চিকিৎসা জগতে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব রায় বাহাদুর স্যর উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী ৬ ফেব্রুয়ারী ১৯৪৬সালে পরলোকগমন করেন। এযুগে আমরা কজন মনে রাখি তাঁকে? বর্তমানে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন দ্বারা কলকাতার লাউডন স্ট্রীটের নাম পরিবর্তিত হয়ে ডঃ উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী রোড করা হয়েছে, শ্রদ্ধার্ঘ্য শুধু যেন এটুকুই।  আশার কথা ২০০৭ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত Dictionary of Madical Biography -এর (৫ম খন্ড), যেখানে বিশ্বের একশোটি দেশের এগারশো চিকিৎসা বিজ্ঞানীর যুগান্তকারী আবিষ্কারকে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে কলকাতা শহরের যে  তিনজন চিকিৎসা বিজ্ঞানীর আবিষ্কারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন Sir Ronald Ross, উপেন্দ্রনাথ ব্রক্ষচারী এবং ড.সুভাষ মুখোপাধ্যায় ।

%d bloggers like this: