যে পরিবারের জগদ্ধাত্রী পুজোয় আজও হয়ে চলেছে দেশমালা পূজা

স্বরূপম চক্রবর্তী: হুগলি জেলার এক সুপ্রাচীন জনপদ ভাগীরথীর তীরে অবস্থিত মিনি ভারত হিসেবে খ্যাত রিষড়া এই মূহুর্তে সেজে উঠেছে আলোকমালায়, কারণ হেমন্তের এই অপরূপ সময়ে বঙ্গবাসী রত হয় দেবী জগদ্ধাত্রীর আরাধনায়, আর জগদ্ধাত্রী পুজো বলতেই ভারতের যে যে শহরগুলির নাম উঠে আসে সেগুলি হল আমাদের রাজ্যের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর, হুগলি জেলার চন্দননগর এবং এই হুগলি জেলারই রিষড়া। তবে রিষড়া শহরে বারোয়ারী জগদ্ধাত্রী আরাধনার সূত্রপাতের বহুবছর আগেই এই জনপদের সুপ্রাচীন বংশ বা পরিবার কোনও এক সময়ে যাঁদের আদি নিবাস বর্তমানের ওপার বাংলায় ছিল বলে পরিবার সুত্রে জানা যায়, সেই হড় পরিবারের হাত ধরেই রিষড়া শহরে প্রচলন হয় মা জগদ্ধাত্রীর আরাধনা। হড় পরিবার রিষড়া শহরে যেদিন থেকে বসবাস শুরু করে সে সময় থেকেই এই পরিবারে প্রচলন হয় হেমন্তের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ মা জগদ্ধাত্রীর আরাধনা। অর্থাত্‍ সময়টা ষোড়শ শতাব্দী। তখন থেকে অদ্যাবধি নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে হয়ে চলেছে এই হড় পরিবারের জগদ্ধাত্রী দেবীর পূজাচ্চর্ণা। যে পুজো একসময়ে ছিল রিষড়া শহরের দে পরিবার ও হড় পরিবারের পুজো, তা পরবর্তীকালে সম্পূর্ণরূপে হড় পরিবারের পুজো হিসেবে পরিচিত। এই পরিবারের অন্যতম সদস্যা খেয়া মুখোপাধ্যায় তাঁদের পরিবারের পুজো সম্পর্কে শোনালেন নানা অজানা তথ্য ও ঘটনা। তাঁর কথানুযায়ী সেই ষোড়শ শতাব্দীতে শুরু হওয়া তাঁদের বাড়ির এই পুজো আজও সেই সময়ের সকল আচার-রীতি-নীতি মেনে যথেষ্ট নিয়মের মধ্যে পালিত হয়ে চলেছে। আজও তাঁদের বাড়ির জগদ্ধাত্রী মাতার আরাধনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের বাড়ি থেকে ছোট বা বড় যেমনই হোক না কেন রিষড়ার সকল মন্দিরে পুজো পাঠানো হয়, যা দেশমালা পুজো নামে খ্যাত। এককথায় বলা যায় হড় পরিবারের পক্ষ থেকে কিছুটা হলেও সম্প্রীতি রক্ষার এক অনন্য নিদর্শন এই দেশমালা পুজো।

প্রসঙ্গত রিষড়ার অপর এক সুবিখ্যাত মাতৃ মন্দির আনুমানিক সাড়ে ছশো বছরের মা সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের সঙ্গে এই পরিবারের মা জগদ্ধাত্রী সম্পর্কে রয়েছে নানা অজানা কথা, যা আমাদের এই বাংলার সুপ্রাচীন সংস্কৃতি সহ কৃষ্টি, রীতি নীতি সকল কিকজুর সম্যক পরিচিতি তুলে ধরে। মা সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত যে পরিবার সেই পরিবারের বর্তমান পুরুষ সুমিত ব্যানার্জী এই প্রসঙ্গে বলেন, তাঁদের পরিবার ও রিষড়ার এই হড় পরিবারই ছিল মা সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা পাকড়াশী পরিবারের কূলপুরোহিত।

এই হড় পরিবারের এক কন্যার বিবাহ হয় উক্ত পাকড়াশী পরিবারে। সুমিত বাবু আরও জানান, যেহেতু আমাদের বাঙালি পরিবারে বাড়ির পুজোয় বাড়ির মেয়ের বাড়িতে আগমন একটা অন্যতম প্রধান রীতি এবং স্বভাবতই শ্বশুরালয় থেকে পিত্রালয়ে কন্যার আগমন স্বাভাবিক। অথচ মা সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা পাকড়াশী পরিবারের বাড়ির বউ যিনি আবার হড় পরিবারের কন্যা তাঁর পুজোর সময়ে মন্দিরের সকল কাজ ফেলে বাপের বাড়ির পুজোয় অংশ নিতে এলেও দধিকর্মার পরের সেই মেয়েকে ফিরতে হত তাঁর শ্বশুরালয়ে, এবং তিনি বঞ্চিত হতেন মা জগদ্ধাত্রীকে বরণ করতে। সেই কারনেই হেমাঙ্গিনী দেবী (হড় পরিবারের কন্যা, যিনি বৈবাহিক সুত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন রিষড়ার মা সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা পাকড়াশী পরিবারের সঙ্গে)র পিতা ঘোষণাক্রমে আজও হড় পরিবারের মা জগদ্ধাত্রীকে বিসর্জনের প্রাক্কালে নিয়ে যাওয়া হয় রিষড়ার মা সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরে। এবং সেখানে কিছুক্ষণ রেখে ওই পরিবারের সকলে মাকে দর্শন করেন, নমস্কার করে আশীর্বাদী ফুল নেওয়ার পর গঙ্গায় আতসবাজি ফাটিয়ে নিরঞ্জন করা হয় হড় পরিবারের দেবী জগদ্ধাত্রীকে। রিষড়ার এই দুটি পরিবার বিশ্বাস করে তাঁদের পরিবারের মা জগদ্ধাত্রী ও মা সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের মা সিদ্ধেশ্বরী দুই বোন, এবং দশমীর এই রীতির অর্থই হলো দুই বোনের একে অপরকে দর্শন। হেমাঙ্গিনী দেবীর শ্বশুরালয় থেকে সেই সময় থেকে আজও সমানভাবে হড় বাড়ির জগদ্ধাত্রী আরাধনার সপ্তমী পুজোর ভোগের সিধে পাঠানো হয়, এবং হড় পরিবার থেকে মা সিদ্ধেশ্বরীর কাছে একই ভাবে পুজো সকল উপচার মেনে পাঠানো হয়।

হড় পরিবারের সদস্যা খেয়া মুখোপাধ্যায়ের কথানুযায়ী অতীতে এই পরিবারের পুজোয় রীতি ছিল ‘এয়ো করা’। তিনি বলেন, এমন সময় হয়েছে যখন হত পরিবারের সকলে ভাবছেন কি করে মাকে তাঁরা আরাধনা করবেন সে নিয়ে যখন সকলে ভাবিত, তখন কোথা থেকে কি ভাবে যেন সহসা সকল সমস্যার সমাধান হয়ে পুজোর সকল ব্যবস্থা হয়ে গেল, যা এককথায় অবিশ্বাস্য। খেয়া দেবীর কথায় তাঁদের পরিবারের মা জগদ্ধাত্রী নিজের পুজো নিজেই করিয়ে নেন। তাঁর কথায় রিষড়ায তাঁদের পরিবারের এই সুপ্রাচীন পুজোর মন্ডপ ও পুজো এককথায় বলতে গেলে এক তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।

অতীতে যে পরিবারের পুজোতে ছাগবলি ছিল অন্যতম এক প্রধান প্রথা, কালের নিয়মে ধীরে ধীরে সেই প্রথা অবলুপ্ত হয়ে আজ শুধুমাত্রই কুমড়ো ও ফলমুল বলি প্রদত্ত হয় মা জগদ্ধাত্রীর পুজোয়। এছাড়াও পুজোর সকল রীতি মেনে একদিনেই সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী পুজো অনুষ্ঠিত হয়। সঙ্গে হয় নিষ্ঠা সহকারে সন্ধি পূজ্য ও কুমারী পুজো। যদিও ধীরে ধীরে এই পরিবারের পুজোয় অতীতের জৌলুস কিছুটা হলেও বর্তমানে অস্তমিত, তবুও ভাঁটা নেই ভক্তিতে। যদিও এই পরিবারের আগামী প্রজন্ম কিছুটা হলেও এই পুজো থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে বা নিচ্ছে তথাপি এই পরিবারের পুজোর যে ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় বেশ কিছু শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষজন।

কালের অতলে হয়তো ধীরে ধীরে সকল কিছুই অস্তমিত হয়ে যাবে, কিন্তু থেকে যাবে আমাদের অতীত সংস্কৃতির মহান ঐতিহ্য, থেকে যাবে সুপ্রাচীন এই হড় বাড়ির পুজোর বিশেষত্ব। যে পুজো, যে রীতিনীতি, যে সংস্কৃতি আবহমান বিরাজমান তাঁর কোনও ক্ষয় নেই তা বারে বারেই প্রমানিত। আধুনিকতার মোড়কে মুড়ে দেওয়া উত্‍সবের জাঁকজমকে গা না ভাসিয়ে নিজেদের পরিবারের মাতৃ আরাধনার সকল রীত-নীতি, নিয়ম-কানুন, ঐতিহ্য মেনে আজও আমাদের বাংলায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে রিষড়ার হড় পরিবারের সুপ্রাচীন জগদ্ধাত্রী মাতার আরাধনা সহ সকল বনেদি প্রাচীন বাড়ির পুজোগুলি।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading