উত্‍সব

কলকাতা ছাড়িয়ে বনেদি বাড়ির পুজোর সুলুক সন্ধান

আজ প্রথম পর্ব, থাকছে হুগলি জেলার অন্যতম প্রাচীন জনপদ গুড়াপের সাটীদহেহালদার বাড়ির দুর্গাপুজো এবং হুগলি জেলার প্রাচীন বর্ধিষ্ণু গ্রাম ভাস্তাড়াসিংহ বাড়ির দুর্গাপুজোএই দুই বাড়ির দুর্গাপূজা নিয়ে হাজির সাংবাদিক কিশলয় মুখোপাধ্যায়

হুগলি জেলার গুড়াপের সাটীদহে হালদার বাড়ির দুর্গাপুজো

হুগলি জেলার গুড়াপের সাটীদহে গোস্বামী মতে প্রাচীন কাল থেকে দুর্গাপুজো হচ্ছে হালদার বাড়িতে। অনেকের মতে সাটীদহ নামটি এসেছে সতীদাহ থেকে । অতীতে সাটীদহের এই অঞ্চল দিয়ে় কংশ নদী বয়ে যেত। এ প্রসঙ্গে এই অঞ্চলের কবি যতীন্দ্রমোহন আষ আনুমানিক ১৩৩০-৩১ বঙ্গাব্দে লিখেছেন-

‘কংশ নামে নদী হেতায় ছিল পুরাকালে।।

শ্রবণ জুড়াত যার জলের কল্লোলে।।

কুলু কুলু রবে সদা হইত প্রবাহিত।।

এবে নদী হইয়াছে কাল গর্ভ গত’।।

আর এই কংশ নদীর তীরে হত সতীদাহ। তৎকালীন ভারতবর্ষে সবথেকে বেশি সতীদাহ হয়েছিল এই বাংলায় আর বাংলার মধ্যে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে হুগলি জেলায় সংখ্যাটা সবচেয়ে বেশি ছিল। তার কারন তখন বলা হত ‘ ভাগীরথীর পশ্চিমকূল বারাণসীর সমতুল’। তৎকালীন সমাচার দর্পন ও অন্যান্য পত্রিকা পড়লে এই তথ্য জানা যায়। পঞ্চমীর দিন সন্ধেবেলায় ঘট স্থাপন করে ঘট জাগরণ হয় হালদার বাড়ির পুজোয়। এই  হালদার পরিবারদের আগে পদবী ছিল গুঁই। অতীতে কোন এক সময় বর্ধমানের মহারাজার কাছ থেকে ‘হালদার’ উপাধি পেয়েছিলেন। একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল প্রায় ৩৫০ বছরের প্রাচীন এই পুজোর সূচনাকাল থেকেই বলি প্রথা নেই, পরিবর্তে ১০৮টি প্রদীপ ও ১০৮ টি পদ্মফুল অর্পন করা হয়। আলো আর পুষ্পের এই অর্ঘ্য দেখতে অনবদ্য লাগে।

সপ্তমীর দিন নবপত্রিকা স্নানের পর নবপত্রিকা পুজোর সময় পুরোহিতের সাহায্যে এই পরিবারের সবথেকে বয়সজ্যেষ্ঠ ব্যাক্তি নবপত্রিকাকে পুজো করেন। এই নিয়মটি কুমারী পুজোতেও রয়েছে। এখানে দশমীর দিন কুমারী পুজো হয়। এক্ষেত্রে পুরোহিতের সাহায্যে পরিবারের সবথেকে প্রবীণা মহিলা কুমারীকে পুজো করেন। বাড়ির পুজো গুলির অন্যতম ঐতিহ্য হল ধুনো পোড়ানো। হালদার বাড়ির পুজোয় এই প্রথাটি রয়েছে। পরিবারের বয়জ্যেষ্ঠ মহিলারা মাথায় মাটির সড়া নেন। তার আগে মোটা গামছা বেঁধে তার ওপর ধুনুচি বা মাটির সড়া বসানো হয়। তাতে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হতে থাকে। দুই হাতেও সড়া থাকে। সেই মহিলার কোলে তাঁর পুত্র বা নিকট আত্মীয় বালক বা বালিকা বসে। ধুনো পোড়ানোর মাধ্যমে মা মহামায়ার কাছে প্রার্থনা নিবেদন করা হয় পরিবারের মঙ্গল কামনার জন্য। এই পুজোয় চণ্ডীপাঠ শুরু হয় ষষ্ঠীর দিন,চলে নবমীর হোম পুজোর আগে পর্যন্ত।  হোমের আগেই চণ্ডীপাঠ শেষ করতে হয়। সপ্তমী, অষ্টমী আর নবমী এই দিনগুলোতে ভোর বেলায় হয় বিশেষ আরতি।দশমী পুজোর পর সুতো কাটার পর অপরাজিতা ফুলের পুজো হয়। মহামায়ার অপর নাম অপরাজিতা।

এখানে দেবী চতুর্ভূজা। বিশিষ্ট গবেষক হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য্য ‘হিন্দুদের দেবদেবী: উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ’ বইতে লিখেছেন যে দেবী বৈষ্ণবী শক্তি বিষ্ণুমায়া লক্ষ্মী ও শিব শক্তি শিবানীর মিশ্রণে কল্পিতা।নিরঞ্জন করা হয় নতুন পুকুর নামক পুকুরে। তবে দশমী সোম থেকে রবি যে বারই হোক সেই দিনই বিসর্জনের নিয়ম। হালদার পরিবারদের দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য,সমস্ত রীতি আজও একই রয়ে গেছে আর একই রয়ে গেছে সাবেকি সুন্দর প্রতিমা সেই সূচনাকাল থেকে।

ভাস্তাড়ার সিংহ বাড়ির দুর্গাপুজো

হুগলি জেলার প্রাচীন বর্ধিষ্ণু গ্রাম ভাস্তাড়া। অতীতে এখান দিয়ে তারকেশ্বর মগরা ছোট রেলগাড়ি চলত। ১৯৫৬ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া এই বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল রেলের একটি ব্যাস্ততম রেলস্টেশন ছিল এই ভাস্তাড়া। আর এই ভাস্তড়ায় সিংহ বাড়িতে প্রাচীন কাল থেকে দেবী দুর্গার আরাধনা করা হচ্ছে যা ‘মহামায়া’ নামে পূজিত হয়। মহামায়ার সপ্নাদেশ গর্ভ গৃহের মাটির মেঝে মাটিরই থাকতে হবে আর নাট মন্দির যা ‘নাট বাংলা’ নামে পরিচিত সেটির ওপরে ছাউনি দেওয়া যাবেনা। আজও এই নিয়ম চলে আসছে। এখন হাওড়া বর্ধমান কর্ড শাখায় গুড়াপ স্টেশন থেকে ১৫ মিনিটের বাস জার্নি করে পৌঁছে যাওয়া যায় ভাস্তাড়ার কমলাসাগর বাস স্টপেজে। এখান থেকে কাছেই এই সিংহ বাড়ি।

অনেকের মতে ভাস্তাড়া নামটি এসেছে বর্গি নেতা ভাস্কর পণ্ডিতের নাম থেকে। এক সময় ভাস্কর পণ্ডিত ও তার অনুচরগণের আস্তানা ছিল এই ভাস্তাড়া। আবার কেউ কেউ বলেন ভাস্কর্য্য থেকে ভাস্তাড়া নামের উৎপত্তি। বর্গি নেতা ভাস্কর পণ্ডিত ভাস্তাড়ার জমিদার সিংহ বাড়ি আক্রমণ করলে এই বংশের সুন্দর সিংহ ( মতান্তরে শুকদেব সিংহ) পরিবারকে বাঁচাতে বাড়ির মধ্যেই নিজের প্রাণ বিসর্জন দেন। এখন এই স্থানে একটি তুলসি মন্দির করা হয়েছে। এই শুকদেব সিংহের পুত্র দেবনারায়ণ সিংহ এই জমিদার বংশে দুর্গাপুজো শুরু করেন।পুজোর ঘট বসে পঞ্চমীর দিন । সেই দিন দুটি নবপত্রিকা তৈরি করা হয়। একটি নবপত্রিকা বোধন ঘরে থাকে অপরটি সপ্তমীর দিন পদ্মপুকুরে স্নান করিয়ে পুজো করা হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল প্রত্যেকদিন আগে বোধন ঘরে পুজো হবে তারপর প্রতিমার পুজো হবে। সেই নিয়মে প্রথমে লক্ষ্মী নারায়ণকে নিয়ে এসে বোধন ঘরে পুজো করে তারপর প্রতিমা পুজো হয় আর দশমীর দিন এই লক্ষ্মী নারায়ণকে ঠাকুর ঘরে রেখে এসে আগে বোধন ঘরে সুতো কাটার পর প্রতিমার ঘটে সুতো কেটে বিসর্জন করা হয়।

ধুমধাম করে পুজো বলতে যা বোঝায় তা শুরু হয় দেবনারায়ন সিংহের পুত্র বাবু ছকুরাম সিংহের আমলে। শুধু দুর্গাপুজো নয় এর সাথে দোল উৎসব,  রথযাত্রা উৎসবও ধুমধামের সাথে করতেন। রথযাত্রা উৎসব  ৪০৫ বছরের প্রাচীন। বাবু ছকুরাম সিংহের পুত্র যজ্ঞেশ্বর সিংহ ১৮৫৯ সালেএখানে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এখন স্কুলের নাম ভাস্তাড়া যজ্ঞেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সঙ্গে খুবই হৃদ্যতা ছিল এবং তিনি বেশ কয়েকবার সিংহ বাড়ি এসেছিলেন আর স্কুল উদ্বোধনের দিন উপস্থিত ছিলেন। আনুমানিক ১১৪০-৪১ সালে দেবনারায়ন সিংহের পিতামহ কৃষ্ণপ্রাণ সিংহ ভাস্তাড়ায় আসেন। তিনি এসেছিলেন ধনেখালির বসো গ্রাম থেকে। তারও আগে তাঁদের পূর্বপুরুষ থাকতেন রাজস্থানে।

অষ্টমীর দিন কুমারী পুজো হয়। নবমীর দিন ছাঁচি কুমড়ো,আখ আর গোঁড়া লেবু বলি দেওয়া হয়। এই লেবু বলির পর বাড়ির সদস্যরা আমিষ ভোজন খেতে পারেন। এছাড়া দেবীর চক্ষুদানের পর আর পুজোর শেষে ছাঁচি কুমড়ো বলি হয়। সপ্তমীর দিন একটি অগ্নিকুণ্ড জ্বালানো হয় যা সর্বক্ষন নবমী পর্যন্ত প্রজ্জ্বলিত হতে থাকে। একে বলা হয় ‘মহাহোম’। প্রতিদিন তিনবার  আরতি  করা হয়।  সাবেকি একচালার ডাকের সাজের সুন্দর প্রতিমা। প্রায় ৩৫০ বছরের এই প্রাচীন পুজোয় দেবনারায়ন সিংহ যে দিন মহামায়ার আরাধোনা শুরু করলেন সেই দিন থেকে আজও প্রতিমার বেদীটি রয়েগেছে যার ওপর সিংহ বাড়ির ‘মহামায়া’ তাঁর পরিবারকে নিয়ে বিরাজমান।