নির্যাতন শুধু শরীরের নয়, মনেরও হয়

মানসিক ভাবে আজ আমরা সকলেই কিছু না কিছু ভাবে অন্যের দ্বারা নির্যাতিত হই। এই প্রসঙ্গে আলোচনায সাংবাদিক আত্রেয়ী দো

‘দেনা-পাওনা’ গল্পে রবি ঠাকুর তৎকালীন সমাজের পণ  প্রথার এক করুণ চিত্র অঙ্কন করেছেন। এক অসহায় বাবা রামসুন্দর,  পণের সব টাকা পরিশোধ করতে না পারায় শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের শিকার হয় তার মেয়ে নিরুপমা। নির্যাতন শুধু শরীরের নয়, মনেরও হয়। নিদারুণ মানসিক নির্যাতনের ফলে একসময় রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যায় নিরুপমা,  সর্বসান্ত হন তার বাবা। সময় বদলেছে,  কিন্তু সমাজের এই অন্ধকার দিকটির বিশেষ পরিবর্তন আজও ঘটেনি।

মানসিক নির্যাতন বলতে কী বুঝি?  মানসিক নির্যাতন বা মানসিক ভাবে একজনকে দুর্বল করে দেওয়া,  সেই ব্যক্তিকে নানাভাবে অপমান,  মৌখিক নির্যাতন,  অবজ্ঞা,  ভয় দেখিয়ে বা এমন কিছু বারংবার বলা যার ফলে সেই মানুষটি মানসিক ভাবে পর্যদুস্ত হয়ে নিজের ক্ষতি করে বসে বা জীবনের চলার পথে নানা অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে পড়ে। এই ভাবে যে কোন মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা অর্থাৎ স্বাভাবিক চলাচল,  যোগাযোগ,  ব্যক্তিগত ইচ্ছে বা মতামত প্রকাশে হস্তক্ষেপ করা ইত্যাদি সবই মানসিক নির্যাতনের অন্তর্ভুক্ত।

অপরদিকে শারীরিক নির্যাতন সম্পর্কে আমরা প্রায় অনেকেই এখন সচেতন হয়ে গেছি, কিন্তু মানসিক নির্যাতন?  শরীরের ক্ষতচিহ্ন গুলোতো শারীরিক নির্যাতনের প্রমাণ বহন করে,  কিন্তু মানসিক ক্ষতগুলোতো দৃশ্যমান নয়,  তাই এর কোনো প্রমাণও নেই। কিন্তু এই অদৃশ্য ক্ষতগুলোই একটা মানুষকে ভয়ংকর পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই আমাদের উচিত মানসিক নির্যাতন সম্পর্কে সচেতন হওয়া। মানসিক হয়রানি বা নির্যাতন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাবে হতে পারে। এটি ঘটতে পারে কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে, স্বামীর দ্বারা স্ত্রীর আবার স্ত্রীর দ্বারা স্বামীর, শ্বশুরবাড়ির লোকেদের দ্বারা এমনকি পরিবারের সদস্যদের দ্বারাও। শুধু তাই নয়, বাবা-মায়েদের নেতিবাচক আচরণ, উচ্চাকাঙ্ক্ষাও কিন্তু অনেক সময় শিশুদের মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এগুলিও কিন্তু শিশুর প্রতি মানসিক নির্যাতনের সামিল। ‘ছুটি’  গল্পের ছোট্ট ফটিকও ছিল মানসিক নির্যাতনের শিকার। আর সেই মানসিক নির্যাতনের করুণ পরিণতিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ছোট্ট প্রাণটি। মানসিক নির্যাতন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভারতীয় দন্ডবিধির ৪৯৮-এ ধারা অনুযায়ী বিবাহিত মহিলারা শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের শিকার হলে,  তাদের যথোপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার অধিকার রয়েছে। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের ওপর নির্যাতনের চিত্রটি খুবই পুরানো। কিন্তু নির্যাতন তো কেবল নারীদের ওপরেই হয়না,  পুরুষ এবং শিশুরাও আজ বহুক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার।  ‘মহেশ’  গল্পের এক দরিদ্র কৃষক গফুর মিঞা সামাজিক শোষণের শিকার হয়ে মানসিকভাবে নির্যাতিত হত দিনের পর দিন। যার ফলস্বরূপ সে হারায় তার প্রাণ প্রিয়, পুত্রসম মহেশকে। সেই ট্র্যাডিসন আজও বহমান নানা ভাবে।

হ্যাঁ,  নির্যাতিতের সংখ্যার নিরিখে হয়তো নারীরাই এগিয়ে। তবে,  এই ৪৯৮-এ ধারার অপব্যবহার করে পুরুষদের ওপর মানসিক নির্যাতনের ঘটনাও কিন্তু কম নয়। আসলে আমাদের দেশে নারী সুরক্ষার বিষয়টিকে যতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়,  ততটা গুরুত্ব কিন্তু পুরুষদের ওপর হওয়া অত্যাচারের প্রতি দেওয়া হয় না। সবশেষে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে উচিত নিজেদের আচরণ,  শব্দচয়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া,  যাতে তাদের আচরণ,  কথাবার্তা অন্যের মানসিক কষ্টের কারণ না হয়। ছোটো থেকেই শিশুদের শেখাতে হবে যাতে তাদের কোনো কথা কারোর খারাপ না লাগে বা কারোর কষ্টের কারণ না হয়।

এখন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছোটো থেকে শিশুদের ভালো স্পর্শ, খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে শেখানো হয়, তার পাশাপাশি যদি ভালো কথা, খারাপ কথা সম্পর্কেও শিক্ষা দেওয়া হয় তাহলে ভবিষ্যতে মানসিক নির্যাতনের পরিমাণ হয়তো কিছুটা কমবে। এর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সকলকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে, সকল কুসংস্কার মুক্ত হয়ে, সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে সমাজকে উন্নত করার লক্ষ্যে একাত্ম হতে হবে। নাহলে যে সকল অনভিপ্রেত ঘটনা প্রায়শই ঘটে চলেছে মানসিক নির্যাতনের ফসল হিসেবে, সেগুলিকে রোধ করা কোনদিনই সম্ভব হবে না, যা কিন্তু মানব জাতির পক্ষে ভয়ংকর। তাই মানসিক নির্যাতনের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা মাথায় রেখে বিষয়টি সম্পর্কে সকলেরই সচেতন হওয়া উচিত।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading