ছাতার ইতিবৃত্ত

কদিন আগেই আমাদের রাজ্যে একটি শব্দের ইংরাজ (Umbrella) বানান ভুল বলার কারনে একজন ছাত্রী সামাজিক মাধ্যমে ট্রোল হয়েছিল, আর আজ আমাদের সাংবাদিক আত্রেয়ী দো খুঁজে বেড়ালেন কথা থেকে কিভাবে সেই Umbrella বা ছাতার আবিষ্কার হল:

ছাতার ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, প্রায় চার হাজার বছর আগে ছাতা আবিষ্কার হয়েছিল। তবে কোথায় বা কারা আবিষ্কার করেছিল এই নিয়ে আছে নানান মতভেদ। প্রাচীন মিশর,গ্রীস ও চীনের চিত্রকল্পে ছাতার নিদর্শন পাওয়া যায়। চীনকেই ছাতার জন্মস্থান হিসেবে মনে করা হয়।পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ছাতা প্রস্তুত করা হয় চীনের এক প্রাচীন শহর সংজিয়াতে। তাই এই শহরটিকে ‘পৃথিবীর ছাতা’ বলা হয়়। ছাতা আবিষ্কারের উদ্দেশ্য : বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে কিন্তু ছাতা আবিষ্কার হয়নি। ছাতা তৈরির উদ্দেশ্য ছিল সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা পাওয়া।

ছাতার ইংরেজি প্রতিশব্দ “Umbrella”শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ”umbra”থেকে, যার অর্থ shade বা  shadow। আবিষ্কারের বহু বছর পরে প্রায় ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপের বৃষ্টি প্রধান এলাকা,বিশেষত লন্ডনে ছাতা জনপ্রিয়তা লাভ করে। লন্ডনে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় বলে সেখানে ছাতার ব্যবহার অনেক বেশি লক্ষ্য করা যায়। সেকারণেই এই শহরটিকে ‘ছাতার শহর’ বলা হয়। তবে সেই সময় শুধু মহিলারাই ছাতা ব্যবহার করতেন। পুরুষদের ছাতা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা ছিল না ঠিকই, কিন্তু ছাতার ব্যবহার পুরুষত্ব বিরোধী হিসেবে গণ্য করা হত। ইংল্যান্ডে পুরুষদের মধ্যে প্রথম ছাতার ব্যবহার শুরু করেন পারস্য পর্যটক ও লেখক জোনাস হ্যানওয়ে। মূলত তাঁর মাধ্যমেই ইংল্যান্ডে পুরুষদের মধ্যে ছাতার ব্যবহার জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাই ইংরেজদের মাঝে ছাতার আর এক নাম ‘হ্যানওয়ে’।

শোনা যায় সেই সময় ইংল্যান্ডের রাস্তায় একধরনের ঢাকা দেওয়া ঘোড়ার গাড়ি চলত। বৃষ্টি, তুষারপাতের হাত থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষ এই গাড়ি ব্যবহার করত। কিন্তু ছাতার ব্যবহার শুরু হওয়ার ফলে,  ওই গাড়ির ব্যবসাদাররা ক্ষতির আশঙ্কা করেন এবং জোনাসকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করেন। তবুও তিনি শেষ পর্যন্ত ছাতাকে সঙ্গী করেই বেঁচে ছিলেন। প্রথম দিকে বাঁশ ও পাতা দিয়ে ছাতার আকারে বানানো হত যার সাথে বর্তমান ছাতার আকারের কোনো মিল নেই।

পরে  ছাতার হাতল এবং রড তৈরিতে কাঠ, তিমি মাছের কাঁটা ব্যবহার করা হত। ছাতার হাতল ছিল প্রায় দেড় মিটার লম্বা,  ছাতার ওজন ছিল প্রায় ৪-৫ কেজি। সেই সময় বিশ্বের অনেক দেশেই ব্রিটিশ আধিপত্য ছিল, তাই তারা বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে কম খরচে ছাতা তৈরি করত। সোনা, রূপা, চামড়া, বিভিন্ন প্রাণীর শিং, বেত, হাতির দাঁত ইত্যাদি দিয়ে ছাতার হাঁতল তৈরি করত।

প্রথমে ছাতা ওয়াটারপ্রুফ ছিল না, চীনারা কাগজের প্যারাসলের ওপরে মোম দিয়ে বার্নিশ করে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার উপযোগী করে তোলে।১৮৩০ সালে লন্ডনের ৫৩ নিউ অক্সফোর্ড  স্ট্রিটে বিশ্বের প্রথম ছাতার দোকান ‘জেমস স্মিথ এ্যান্ড সন্স’ চালু হয়। ১৮৫২ সালে স্যামুয়েল ফক্স রানী ভিক্টোরিয়ার জন্য স্টিলের রড দিয়ে ছাতা প্রস্তুত করেন। ১৭১৫ সালে পারস্যের এক নাগরিক মারিয়াস প্রথম পকেট ছাতা আবিষ্কার করেন বলে জানা যায়। আস্তে আস্তে বিভিন্ন নকশার ছাতা তৈরি করা হয়।

১৮৫২ সালে পারস্য নাগরিক গেজ স্বয়ংক্রিয় সুইচের সাহায্যে ছাতা খোলার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ১৯২০ সালে জার্মানির বার্লিন শহরে হ্যানস হাপট নামক এক ব্যক্তি ছোটো সাইজের পকেটে বহনযোগ্য ছাতা  আবিষ্কার করেন। ১৯৬০ সালের দিকে পলিয়েস্টার কাপড় দিয়ে ছাতা তৈরি শুরু হয়।

সেই সময় উপহার সামগ্রী হিসেবেও ছাতা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।প্রথমে শুধু কালো রঙের ছাতা পাওয়া গেলেও বর্তমানে বিভিন্ন রঙের এবং  বিভিন্ন আকর্ষণীয় নকশা করা ছাতা পাওয়া যায়। শুরুতে কেবলমাত্র রোদের তাপ থেকে বাঁচতে ব্যবহার হলেও এখন রোদ-বৃষ্টি সবকিছুতে ছাতাই ভরসা।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Powered by Joinchat