বর্ষার রাণী ইলিশ

আত্রেয়ী দো: বর্ষাকাল মানেই খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা। খাবার পাতে এক টুকরো ইলিশ মাছ ছাড়া যেন বাঙালিয়ানাটা ঠিক জমে না। ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। তবে ভারতেও এই মাছ জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ফিশবেস(Fishbase) -এ প্রায় ২৫টি ভাষায় এই মাছের আলাদা আলাদা নামকরণ করা হয়েছে। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম হল-Tenualosa Ilisha. ভারতবর্ষের মধ্যেই ইলিশমাছ একাধিক নামে পরিচিত। বাংলা ভাষায় বলা হয় ইলিশ, অসমীয়া ভাষায় বলে ইলিহি, উড়িয়া ভাষায় বলে ইলিশ, ইলিশা, জোড়ি; তেলুগু ভাষায় বলে পালাসা, পালাসহ, পালিয়া, পোলাসা; গুজরাটি ভাষায় বলে চাকশি,চাকসি, চাসকি, পাল্লা; হিন্দিতে হিলসা, পালা; কানাড়া ভাষায় বলা হয় পালিয়াহ, পালুভা, ভালাভা; মারাঠি ভাষায় বলে পালা,পাল্লা, পালাভা; তামিল ভাষায় বলে উল্লাম, ভেনগাল্লাই ইত্যাদি।

ইলিশ সামুদ্রিক মাছ হলেও বংশবিস্তারের সময় বড় নদীতে এসে ডিম পাড়ে, ডিম ফুটে বাচ্চা বড় হলে আবার সমুদ্রে ফিরে আসে। এই সময়টাতেই ইলিশ মাছ সংগ্রহ করা হয়। স্ত্রী ইলিশ মাছ পুরুষ ইলিশের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং স্বাদেও পুরুষ মাছের চেয়ে বেশি সুস্বাদু হয়। পদ্মার ইলিশের স্বাদ মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। ভারতের গোদাবরী, গঙ্গা, রূপনারায়ণ নদীর ইলিশের ডিম স্বাদে অতুলনীয়। এই মাছ নিজেই ভীষণ তেলতেলে, তাই রান্না করতে অনেকটাই কম তেল প্রয়োজন হয়। তবে, এই তৈলাক্ততাই ইলিশের স্বাদের চাবিকাঠি।  বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতিতে অনেক পূজা-পার্বনে ইলিশ মাছ ভগবানের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। অনেক পূজাতেই বিশেষত লক্ষীপূজোয়,সরস্বতী পূজোর জোড়া ইলিশ মাছ কেনা শুভ মনে করা হয়। তবে এসবের পাশাপাশি পুষ্টিগুণেও এই মাছের জুড়ি মেলা ভার।প্রতি ১০০গ্রাম ইলিশ মাছে প্রায় ৩১০ ক্যালোরি এনার্জি (শক্তি), ২২গ্রাম প্রোটিন, ১৯.৫ গ্রাম ফ্যাট থাকে। এই মাছে প্রচুর পরিমাণে অ্যামাইনো অ্যাসিড, মিনারেলস (খনিজ লবণ) এবং এসেনশিয়াল ফ্যাটি অ্যাসিড মূলত পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড (PUFA)থাকে।

PUFA আমাদের শরীরের পক্ষে খুবই উপকারী। PUFA তে হাই ডেনসিটি লিপোপ্রোটিনের পরিমাণ বেশি এবং লো ডেনসিটি লিপোপ্রোটিনের পরিমাণ কম থাকে। তাই এটি হৃদরোগ, মধুমেহ (ডায়াবেটিস), কর্কটরোগ(ক্যান্সার), স্থূলতা(ওবেসিটি) ইত্যাদি রোগের সম্ভবনা কমায়। ইলিশ মাছে বিভিন্ন মনো এবং পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড যেমন(ওমেগা-3-ফ্যাটি অ্যাসিড) ওলেয়িক, লিনোলেয়িক লিনোলেনেয়িক,অ্যারাকিডোনিক, ইকোসাপেন্টানোয়িক অ্যাসিড (EPA)এবং ডিকোসা-হেক্সানোয়িক অ্যাসিড(DHA) থাকে। EPA, DHA ফ্যাটি অ্যাসিডগুলি শরীরের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে।  DHA শিশুদের মস্তিষ্কের গঠন ও বিকাশে সাহায্য করে। ওমেগা-3-ফ্যাটি অ্যাসিড অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার(ADHD) প্রতিরোধে সাহায্য করে।  ওমেগা-3-ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের যত্নেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এর মধ্যে কোলাজেন নামক প্রোটিন থাকে যা ত্বক নমনীয় রাখতে ও তারুণ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।  ইলিশ মাছে আছে ভিটামিন A, D এবং E, ভিটামিন A রাতকানা, ভিটামিন D রিকেট প্রতিরোধ করে, হাড়ের গঠনে সাহায্য করে।  ইলিশ মাছে বিভিন্ন খনিজ উপাদান যেমন ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়োডিন, সেলেনিয়াম, জিঙ্ক ইত্যাদি থাকে। ক্যালশিয়াম, ফসফরাস হাড়েরগঠনে সাহায্য করে। আয়োডিন থাইরয়েড গ্রন্থিকে ভালো রাখতে সাহায্য করে। তাই স্বাদে-গন্ধে-পুষ্টিতে ইলিশ হল বর্ষার রাণী।

 

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Powered by Joinchat