উত্তর সম্পাদকীয়

সমীক্ষায় প্রকাশ -বয়স্কদের তূলনায় কম বয়েসীরাই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে এদেশে

pkdasড. প্রদীপ কুমার দাস: সারা বিশ্বে অতিমারিতে আক্রান্তের সংখ্যা তিন কোটির কাছাকাছি। মৃত্যুর সংখ্যা নয় লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। এদেশে আক্রান্তের সংখ্যা এখনো পর্যন্ত বাষট্টি লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। মৃত্যু হয়েছে চুরানব্ব্ই হাজার ছুঁইছুঁই। মৃত্যুর হার ১.৫৮ শতাংশ। কিন্তু এদেশে মৃত্যুর হার অনেক কম, বিদেশের তূলনায়। বিদেশে যেখানে মৃত্যুর হার তিন শতাংশের কাছে সেখানে এদেশে সেই হার হল ১.৮ শতাংশ। সুস্হতার হারও অনেক বেশি বিদেশের তূলনায়। এর রহস্যটা কি জানার জন্যে ছোট্ট একটা স্টাডি করা হয়েছিল হুগলির  শ্রীরামপুর পৌরসভাকে কেন্দ্র করে চল্লিশ জন কোভিড আক্রান্তদের নিয়ে যাদের বয়স, লিঙ্গ, রোগের লক্ষণ, পরীক্ষা পদ্ধতি ও সণাক্তকরণ, হোম ট্রিটমেন্ট, হাসপাতালে রেফার করা ইত্যাদি বিষয়বস্তু গুলো সমীক্ষার মধ্যে রাখা হয়েছিল। যে চল্লিশ জন রোগীকে পরীক্ষার আতসকাঁচে রাখা হয়েছিল তাদের মধ্যে ২২  জন ছিলেন পুরুষ ও ১৮ জন মহিলা।  বয়স হিসেবে ১৪ জনের বয়স ২০-৪০ এর মধ্যে, ১৫ জনের বয়স ৪১-৬০ও ৯ জনের বয়স ৬১-৮০ বছরের মধ্যে ও ২ জনের বয়স ছিল ৮১-১০০এর মধ্যে। রোগীদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিল ২৩ বছরের ও বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন ৯২ বছরের।

Untitled-2

আনন্দের খবর হল এঁরা প্রত্যকেই করোনা আক্রান্ত হওয়ার পরেও সুস্হ আছেন। এঁদের ৪ জনকে কেবলমাত্র স্হানীয় কোভিড হাসপাতালে ভর্তি করার দরকার পড়ে। পরবর্তীকালে কোন জটিলতা ছাড়াই ওই চারজন চোদ্দদিন কোভিড হাসপাতালে থেকে সুস্হ হয়ে বাড়ি ফেরেন। ওই বিরানব্বই বছরের বৃদ্ধ মানুষটি হাসপাতাল থেকে সুস্হ হয়ে বাড়ি ফেরেন।  ওই চারজন ছাড়া আর সবাই বাড়িতে থেকেই সুস্হ হয়েছেন স্হানীয় চিকিৎসকের ব্যবস্হাপনায়। ওই সমীক্ষা থেকে জানা যায় চল্লিশ জন আক্রান্তের মধ্যে ২৯ জনের বয়স ষাটের নীচে।  ১১জনের বয়স ষাটের উর্দ্ধে। ঠিক উল্টোটা দেখা যায় বিদেশের ক্ষেত্রে যেখানে ষাটের উর্দ্ধে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। প্রায় ৭০ শতাংশ। বয়স বাড়লে রোগের সংখ্যা বাড়ে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে, তাই ওই দেশগুলোতে মরণের হার বেশি এদেশের তূলনায়। pkdas2এবারে রোগের লক্ষণ বা উপসর্গ নিয়ে সমীক্ষায় প্রকাশ ৪০ জনেরই জ্বর ছিল কারো বেশি কারো কম, কেউ কেউ দিন ১৫ ধরে জ্বরে ভুগেছেন, কেউ চার-পাঁচদিন পরে জ্বরের হাত থেকে রেহাই পেয়েছেন। ৩১ জনের প্রচন্ড দুর্বলতা ছিল, ৩৩ জনের কাশি-সর্দি ছিল। কারো শুকনো কাশি, কারো বা গয়ের উঠা কাশি। ১৪ জনের গায়ে-হাত-পায়ে বেশ ব্যথা বোধ করেছিলেন। ১১ জনের গলায় ব্যথা ও খেতে গেলে গলায় একটা অস্বস্তি ভাব, ১১ জনের শ্বাসকষ্ট, কারো মৃদু, কারোর বেশি। ১৪ জনের খাবারে  বিশেষ করে মিষ্টি ও ঝালের কোন স্বাদ না পাওয়া ও নাকে কোন গন্ধ না পাওয়া। ৮ জনের বুকের ডানদিক ও বামদিকে ব্যথা বোধ করা, ৬ জনের  মাথা ঘোরা এমনকি পড়ে যাওয়ার মতন অবস্হা হওয়া, ৫ জনের ক্ষুদামন্দ, ৩ জনের অস্হি সন্ধিস্হলে ব্যথা, ২ জনের নাক বুজে যাওয়া উপসর্গ দেখা, ১ জনের পেটে-হাতে-পায়ে র‍্যাশ বেরোনো উপসর্গ দেখা গিয়েছিল। শেষের জন ছিলেন একজন মহিলা ও কোন ওষুধ বা খাবারে তাঁর কোন এ্যলার্জীর ইতিহাস ছিল না।  সবচেয়ে আশ্বর্যজনক ব্যাপার হলো যে ১৪ জনের খাবার কোন স্বাদ না পাওয়া বা নাকে কোন গন্ধ না পাওয়া এঁদের কিন্তু সকলেরই বয়স অল্প ও এঁরা খুব তাড়াতাড়ি সুস্হ হয়ে উঠতে পেরেছেন। এঁদের  মধ্যে পাঁচজনের পেটেব্যথা, বমি ও উদরাময়ের উপসর্গ দেখা গিয়েছিল।

gif advt

উপসর্গ দেখে সন্দেহ হওয়ায় এদের করোনা সংক্রমণের সঠিক পরীক্ষা আর টি পি সি আর ও র‍্যাপিড এন্টিজেন টেস্ট করা হয়েছিল। ৩২ জনের আর টি পি সি আর ও ৮ জনের র‍্যাপিড এন্টিজেন টেস্ট পজিটিভ হয়েছিল। এরপরেও কিছু প্রাথমিক রক্ত  পরীক্ষা করানো হয়েছিল যার লক্ষ্য ছিল যকৃত, হৃদযন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে করোনার প্রভাব পড়েছে কি না জানার জন্যে। লিভার ফ্যাংশন টেস্ট করে জানা গিয়েছিল ৫ জন আক্রান্ত ব্যক্তির যকৃতে প্রভাব ফেলেছিল ওই ভাইরাস। এছাড়া ডি-ডাইমার ও সি রিক্টাটিভ প্রোটিন পরীক্ষা করে ৪ জনের হৃদযন্ত্র বা রক্ততঞ্চনে অল্প-স্বল্প ত্রুটি ধরা পড়েছিল যেগুলো চট জলদি ব্যবস্হা নিয়ে মেরামত করে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। এরপরে রক্ত পরীক্ষা করে পাওয়া গিয়েছিল ৫ জনের হেমোগ্লোবিনের মাত্রা বেশ কম, ২৫ জনের কম ও ১০ জনের প্রায় স্বাভাবিক মাত্রায়। শ্বেত কণিকার সংখ্যা বেশ কম ৩ জনের, ৩৭  জনের স্বাভাবিক মাত্রায় ছিল। অর্থাৎ রোগপ্রতিরোধী সৈনিকদের ওই ভাইরাস খুব একটা কাবু করতে পারে নি। কেননা আক্রান্তদের বেশিরভাগের বয়সই ষাটের নীচে বলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অটুট ছিল।

Untitled-1

এরপরে বুকের ছবি ও স্ক্যান করে দেখে নেওয়ার ব্যবস্হা করা হয়েছিল ফুসফুসে ওই ভাইরাস কামড় বসাতে পেরেছে কি না। চল্লিশ জনের মধ্যে ২ জনের ছবিতে কিছু ধরা পড়ে নি, ৩ জনের অল্প-বিস্তর ছায়া পড়েছিল, ৫ জনের ফুসফুসে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল, ১৬ জনের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কাঁচর গ্লাসের মতন সাদা দাগ, ৯জনের একদিকের ফুসফুসে নিউমোনিয়ার ছবি,  ৩ জনের দুই দিকের ফুসফুসে নিউমোনিয়ার চিহ্ন ও ২ জনের ফুসফুসে জল জমার ছবি পাওয়া গিয়েছিল। ওই সমীক্ষা থেকে পরিষ্কার ভাবে জানা যায় যে বিদেশের মতন এদেশেও করোনার থাবা ফুসফুসে বসিয়েছে। তবে বেশি কামড় দেওয়ার মতন শক্তি অর্জন করতে পারে নি। হয়তো এদেশের জলবায়ু, তাপমাত্রা ও বায়ুমন্ডলের আদ্রতা ওই ভাইরাসকে শক্তিশালী হতে না দিয়ে বেশ কিছুটা ঠুঁটো জগনাথ করে দিয়েছে। প্রকৃতির আশীর্বাদে এদেশের লোকজন বেশ কিছুটা রেহাই পেয়েছে। আর যে দেশ সর্বদা মারি নিয়ে ঘর করে তাদের অহরহ রোগভোগে  কিছুটা হার্ড ইমুয়ুনিটি তারা এমনিতেই পেয়ে গেছে বলে করোনা তেমন করে দাঁত বসাতে পারে নি পশ্চিমী দেশের মতন। তাই প্রকৃতির স্নেহধন্য বলে এ যাত্রায় টিকে থাকার মন্ত্রটা ভারতবাসী রপ্ত করে নিতে পেরেছে। তাই গর্ব করে বলতে পারবো আমরা করবো জয় নিশ্চয়।

advt-4advt-5advt-1advt-3Untitled-3