আমাদের বাংলার সংস্কৃতি আমরা শিকড় থেকেই জানি

সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের রিয়েলিটি শোর অনুষ্ঠানে একটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যের একটি অংশ প্রদর্শনে হিন্দী সিনেমার একটি গান ও নাচের কোরিওগ্রাফি নিয়ে চলছে নানা পরস্পর বিরোধী কথা। এই বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রতিখনের প্রতিনিধি স্নেহাবৃতা ব্যানার্জী কথা বলেছিলেন সঙ্গীত ও নৃত্য জগতের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে।

আজ শেষ পর্বে রয়েছেন পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরের বিশিষ্ট নৃত্য শিল্পী ও নৃত্য গুরু শর্মিলা পোদ্দার

 

সংবাদ প্রতিখন: এই মূহুর্তে একটি বাংলা বেসরকারি টিভি চ্যানেলের একটি নাচের রিয়েলিটি শো তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যের একটি অংশের ওপর যে নৃত্যভঙ্গিমা ও যে আবহসঙ্গীত ব্যবহার করা হয়েছে তা নিয়ে চলছে নানা চাপানউতোর। এই বিষয়ে আপনার মত কী?

শর্মিলা পোদ্দার: দেখুন, যে রিয়েলিটি শো নিয়ে সাম্প্রতিকালে একটা কন্ট্রোভার্সি তৈরি হয়েছে সেটা হচ্ছে, চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যের প্রেক্ষাপটে  হিন্দি সিনেমার গান যোগ করা হয়েছে। যেখানে আনন্দের সাথে দেখা হয়েছে চণ্ডালিকার। তা সেই জায়গাটা তাদের প্রেমের ব্যাপারটা বোঝানোর জন্য কোরিওগ্রাফার যারা ছিলেন,  তারা এই গানটাকে ব্যবহার করেছেন,  কারণ তাদের উদ্দেশ্য ছিল এটা প্রেম পর্যায়ে বা প্রেমের গান বলে। তবে আমার যেটা মনে হয়,  শুধু রবীন্দ্রনৃত্য বলে নয়,  প্রত্যেকটা নাচের এক একটা ফ্লেভার আছে। মানে প্রত্যেকটা নাচের,  তা রবীন্দ্রনৃত্য হতে পারে বা আমাদের ক্লাসিক্যাল ডান্স ফর্ম হতে পারে। আপনি নিশ্চয়ই ঘুগনি দিয়ে মুড়ি খাবেন, আপনি ঘুগনি দিয়ে তো মিষ্টি খাবেন না। সেটা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। বা আপনি  ফ্রায়েড রাইস দিয়ে চিলি চিকেন খেতে পারেন, কিন্তু আপনি চিলি চিকেনের ওপরে একটু কাঠবাদাম দিয়ে দিলেন,  সেটা তো খাবেন না। ব্যাপারটা ঠিক সেরকম। আমরা বলি না যে,  একটা খাবারের সাথে একটা খাবার যেমন যায়,  তেমনি যে গান যে প্রেক্ষাপট নিয়ে আমি কাজ করছি,  সেই প্রেক্ষাপটের সাথে গান প্রেমের হলেও সেই গানটা কেমন হতে পারে,  সেটা আগে দেখতে হবে আমাদের। আমার মনে হয়,  খাবারের ক্ষেত্রে শুধু নয়, সবকিছুরই একটা মাধুর্যবোধ আছে,  যেটা লোকের কুরুচি বা খারাপ চিন্তা দেয় না,  মানে প্রকাশ করে না। সে ক্ষেত্রে আমার মনে হয় যে ডান্স রিয়ালিটি শোয়ে,  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান নিয়ে যা হয়েছে সেটা একদমই ঠিক হয়নি। কারণ সেখানে যদি ক্রিয়েটিভিটি আনতেই হতো,  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক প্রেম পর্যায়ের গান আছে, তা নিয়েও করা যেত।

সংবাদ প্রতিখন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিভিন্ন সৃষ্টি বিদেশেও সমানভাবে সমাদৃত,  সেখানে স্বয়ং বাংলাতেই আমরা এটাকে নিয়ে নানা পরীক্ষা করে তাকে কী কিছুটা হলেও বিকৃত  করে ফেলেছি? আর এর ফলে আমরা বাঙালিরা পিছিয়ে পড়ছি না?  এটা কি আমাদের অক্ষমতা?

শর্মিলা পোদ্দার: আপনি যে কথাটা বলছেন, সে কথা টা মানে চিরকালই হয় যে, আমাদের ঘরের খাবার কখনোই আমাদের ভালো লাগে না। আমাদের সবসময় মনে হয় রেস্টুরেন্টে বা অন্যের মা বাবারা ভালো রান্না করে। এটা আমাদের হয়, আমাদের টেস্ট চেঞ্জের জন্য আমরা কোনো একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাই। আমি খাবার নিয়ে ব্যাপার টা বোঝানোর চেষ্টা করছি কারণ দুটোই শিল্প। তা সেখানে আজকে আমি আমার বাঙালি খাবারটা আজকে ভালো লাগছে না, চাইনিজটা ভালো লাগছে। কিন্তু চাইনিজ বা বিদেশীর ট্যাঙ্গো যেটা আছে, ধরুন ট্যাঙ্গো নাচ, সেটা বিদেশী ভূমি থেকে তৈরি হয় বলে না, ওদের অনেকের ওটার ওপর দক্ষতা বেশি থাকে। তেমনি আমাদের দক্ষতা হচ্ছে আমাদের রবীন্দ্রনৃত্য বা রবীন্দ্রসংগীত বা আমাদের বাংলার সংস্কৃতি আমরা শিকড় থেকেই জানি। তা আমরা যখন আমাদের শিকড় থেকে যে জিনিসটা একদম নির্ভুল জানি, সেটাকে তুলে দেওয়া সব থেকে ভালো নয় কি?  যেমন জ্যাজ, জ্যাজ ওখানকার লোকই করে। হ্যাঁ, আমরা শিখে আসছি, কিন্তু কখন আমরা শিখে আসবো, যখন নিজের টাকে নিয়ে পুরো জেনে তারপরে শিখে আসব। নট দ্যাট,  যে আমাদের এই নাচের জিনিসটাকে সবার কাছে একটুখানি টিআরপি বাড়াবো বলে একদম যা ইচ্ছে করে দিলাম, একটা কোন কিছু, এটা ঠিক মানায় না, তাতে আমাদের নিজেদের সত্তাটা নষ্ট হয়। সেক্ষেত্রে তো আমি নিশ্চয়ই বলব, যে আমরা আমাদের নিজেদের নিজেরাই পিছিয়ে দিচ্ছি। আমরা যেটাতে একদম খুবই সবল বা স্ট্রং, সেই জায়গাটাকে আমরা হারিয়ে ফেলছি। আমরা অন্যকে অনুকরণ করতে করতে নিজের সত্ত্বাকে, নিজের বাঙালি সত্তাটাকে হারিয়ে ফেলছি। সে শুধু আমি সংস্কৃতিতে বলব না, সে আমাদের পোশাক-আশাক, ভাবনা-চিন্তা, সব কিছুতে।

সংবাদ প্রতিখন: একজন শিল্পীর বা শিল্পের আধুনিক হওয়া নিয়ে কি বলবেন?

শর্মিলা পোদ্দার: আধুনিক কথাটা হলো, আধুনিক মানে কিন্তু একটা জিন্সের প্যান্ট বা টপ পরে সে আধুনিক হয়, সেটা কিন্তু নয়। আধুনিকতার অর্থ হচ্ছে তার মননশীলতা আধুনিক হওয়া। সেটা আমরা ভুলে গেছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আমাদের বিবেকানন্দ,  কিন্তু তখনকার দিনের আধুনিক মানুষ ছিলেন। নেতাজী আধুনিক মানুষ ছিলেন। পোশাক পরিচ্ছদে কিন্তু তারা ছিলেন না,  মননে,  চিন্তায় আধুনিক হওয়াটা খুব দরকার।

সংবাদ প্রতিখন: আধুনিকত্ব দিয়ে সংস্কৃতিকে বজায় রাখা,  শিল্প জগতে এটা কিভাবে সম্ভব হতে পারে?  সংস্কৃতি নষ্ট হয়ে যাবে না,  কিন্তু আমরা দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হব, কিভাবে সম্ভব?

শর্মিলা পোদ্দার: যে কোনো নতুন জিনিসকে আধুনিক বানানো মানে তার উন্নত চিন্তাধারা। সেই চিন্তা,  সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে রেখে,  সেটাকে আর কিভাবে তার পরিধিটাকে বড় করা যায়,  সেটাই করা। আধুনিক মানে,  আমি কিন্তু বারবার বলছি,  অন্য কোনো গানকে আধুনিক,  কিন্তু চিন্তাশীল হতে হয়। মানে,  আমি রবীন্দ্রনৃত্যটা একভাবে দেখেছি। আমি সেই রবীন্দ্রনৃত্যটা আরও কিভাবে রবীন্দ্রনাথকে,  তার মতাদর্শকে ঠিক রেখে,  চেঞ্জ করা যায়,  সেটাই আমার ভাবা উচিত। না, আমি অন্য একটা জায়গা থেকে কোন কিছু নিয়ে আসলাম,  নিয়ে এসে আমি সেটাকে ঢুকিয়ে দিলাম, সেটা আধুনিকতা না,  সেটা আধুনিকতা হতে পারে না। কখনোই হতে পারে না। হ্যাঁ,  আধুনিক জিনিসটা কিন্তু একদম অন্যরকম। আমরা যদি রবীন্দ্রনাথের বাড়িতেই দেখি,  তখনকার মেয়েদের বেশভূষা অনেক আধুনিক ছিল,  কিন্তু তারা শাড়িই পরতো। তারা তো আগে যেভাবে শাড়ি পরা হতো,  সেই শাড়িটাকে একটু চেঞ্জ করে তারা শাড়ি পরল। অনেক আধুনিকতার, কিন্তু জিনিসটা একই তো রাখলো,  সেখানে তো কোন পরিবর্তন হলো না। সেখানে যখন ওই ক্ষেত্রে হয়েছে,  এখানেও তাহলে রবীন্দ্রনাথকে রেখেই প্রেমের অনেক গান তো ছিল রবীন্দ্রনাথের,  তা হলে সেটা প্রয়োগ করা হল না? আমি তখনই একটা সৃষ্টিকে একদম নিজের মতন করতে পারি,  যদি আমি স্রষ্টা হই। মানে,  এটা করতে গেলে চন্ডালিকার মতন,  অন্য কেউ যদি নিজে কোন কিছু লিখতে পারে,  তবে সে সেটাকে মডারনাইজ করুক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপর কলম চালিয়ে তার সৃষ্টিকে নষ্ট করার অধিকার কারো নেই।

বক্তার বক্তব্যের জন্য সংবাদ প্রতিখন কোনওভাবেই দায়ী নয়, সাক্ষাত্‍কারে বক্তার বক্তব্য সম্পুর্ন ওনার নিজস্ব, একান্ত ও ব্যক্তিগত

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading