
কিশলয় মুখোপাধ্যায়:
আব্রু কে বা-সদ্ খুন ই জিগর দস্ত দি হদ্
বা-উমেদ-ই করম-এ, খাজা, বা-দরবান্ মা-ফোরশ’
অর্থাৎ ‘হৃদয়ে শত শত ফোঁটা শোণিতের বিনিময় অর্জন করেছ যে অমূল্য সন্মান, প্রিয় মোর তুচ্ছ দারোয়ানের অনুগ্রহ পাবার আশায় তাকে করোনা বিক্রয়।’
১৮২৩ সালে ৪ এপ্রিল মীরাৎ উল আখবার পত্রিকার অতিরিক্ত সংখ্যায় এই ফার্সি বয়েৎটি লিখেছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তিনি ছিলেন সমাজ সংস্কারক ধর্ম প্রচারক, বহু ভাষাবিদ তথা সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে লড়াকু এক মনিষী। এর সঙ্গে এটাও বলতে হয় ভারতীয় সাংবাদিকতা তাঁকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। আর সর্বোতভাবে ছিলেন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে।
১৮২৩ সালের ১৪ মার্চ তৎকালীন গভর্নর অ্যাডামস অর্ডন্যান্স জারি করলেন। ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। এটি ‘অ্যাডামস গ্যাগ’ নামে কুখ্যাত। রামমোহন রায় অনেক চেষ্টা করছিলেন এই আইন আটকানোর জন্য। এটা ঠিক যে তিনি এই কালা কানুন আটকাতে পারেননি, তবে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা করেন, এবং তিনি মীরাৎ উল আখবার পত্রিকাটি প্রতিবাদ স্বরূপ বন্ধ করে দিলেন। শেষ এবং অতিরিক্ত সংখ্যায় এই সম্পর্কে প্রতিবাদ নিবন্ধ লিখেছিলেন আর তাতেই লিখলেন ফার্সি বয়েৎটি।

তিনি সব ধর্মের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে ছিলেন। আর বিশ্বাস করতেন ধর্মের মধ্যে যে উপদেশগুলো মানুষের মন, চরিত্র, ধর্মবোধকে উন্নত করে সেগুলো জানা উচিত। ১৮১৫ সালে অনুবাদ এবং ভাষ্য সহ বেদান্ত গ্রন্থ প্রকাশ করলেন। তারপর কেন উপনিষদ, ঈশ উপনিষদ, কঠ উপনিষদ প্রকাশ করেন। এই বছরই আত্মীয় সভা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এছাড়া বাইবেলের পুরোনো অংশ পড়ার জন্য তিনি হিব্রু ভাষা শেখেন। স্বাভাবিক ভাবে গোঁড়া হিন্দু আর খ্রীষ্টানদের রোষানলে পড়েন। তবে তিনি অকুতোভয়। এক অ্যাডামের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন সেখানে আরেক অ্যাডাম ছিলেন রাজা রামমোহন রায়ের বন্ধু। এই অ্যাডাম ছিলেন একজন পাদ্রী। খ্রীষ্টান ধর্মের গোঁড়ামির বিরুদ্ধেও রাজা রামমোহনের কলম পাঠককে সচেতন করেছিল। এক্ষেত্রে যা হয়, খ্রীষ্টানরা প্রতিবাদ করেছিলেন। বিশেষ করে শ্রীরামপুরের মার্শম্যান সম্পাদিত ফ্রেন্ড অফ ইণ্ডিয়া পত্রিকায় এই সমালোচনাগুলো প্রকাশ হতে লাগলো। আর এদিকে রাজা রামমোহন উত্তর দিতে থাকলেন। এই সময় উইলিয়াম অ্যাডাম তাঁকে সমর্থন করেছিলেন এবং আজীবন পাশে ছিলেন।

১৮২১ সালে ৪ ডিসেম্বর রাজা রামমোহন রায় প্রকাশিত করলেন সম্বাদ কৌমুদি। প্রতি মঙ্গলবার বেড়োতো এই কাগজটি। ভবাণীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক হলেও মূল চালিকাশক্তি ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। সতিদাহ প্রথা রোধ, জীবন বীমা, দাতব্য চিকিৎসালয়, প্রাথমিক শিক্ষা, নারী শিক্ষার প্রসার, ব্যাঙ্ক সম্বন্ধীয় নানা লেখা প্রকাশিত হত। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল সম্বাদ কৌমুদি সতিদাহ প্রথার বিরুদ্ধে লিখত আর সমাচার চন্দ্রিকা এই প্রথার পক্ষে লিখত। চন্দ্রিকার প্রতিষ্ঠা করেন এই ভবাণীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। যখন রাজা রামমোহন সতীদাহ প্রথা বন্ধ করতে আইন রচনা করার জন্য ওই পত্রিকায় সরকারকে অনুরোধ করেন, তখন ভবাণীচরণ সম্বাদ কৌমুদি ছেড়ে দিয়ে সমাচার চন্দ্রিকা প্রকাশ করা শুরু করেন।

ভবানীচরণের পর কৌমুদির সম্পাদক হন হরিহর দত্ত তারপর গোবিন্দ্র চন্দ্র কোঙার। বাংলা ভাষায় কৌমুদি ছাড়া তিনি ফার্সি ভাষায় মীরাৎ উল আখবার নামে পত্রিকা বের করলেন। একটি বাংলায় আর আরেকটি ফার্সি ভাষায় বিভিন্ন লেখা প্রকাশ হতে থাকল। এই লেখাগুলি ইংরাজিতে অনুবাদ করে ক্যালকাটা জার্নালে প্রকাশ করতে দিতেন। এই কাগজের সম্পাদক ছিলেন বাকিংহাম। দুজনে পরস্পরকে খুবই সাহায্য করতেন। ইংরাজিতে অনুবাদ করতেন রাজা রামমোহনের ভাবশিষ্য তারাচাঁদ চক্রবর্তী। তিনি হিন্দু কলেজের ছাত্র ছিলেন। এরপর রামমোহন বাংলা ও ইংরাজি দ্বিভাষিক পত্রিকা প্রকাশ করলেন নাম দিলেন ব্রাহ্মিনিকাল ম্যাগাজিন বা ব্রাহ্মন সেবাদি। এখানে মূলত ধর্ম সম্পর্কীয় লেখা প্রকাশ হতো। এছাড়া বেঙ্গল হেরাল্ড পত্রিকার অন্যতম স্বত্বাধিকারী ছিলেন। ১৮২০ সালে ৯ মে থেকে প্রকাশিত হতে থাকে পত্রিকাটি।
ভারতের নবজাগরণে এবং সংবাদপত্র প্রকাশের ইতিহাসে রাজা রামমোহন রায় অবিস্মরণীয় ব্যাক্তি। তাঁর নাম ভারতের সংবাদপত্রের ইতিহাসে চিরদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
