পুস্তক পর্যালোচনা – দুই আত্মার গল্প

দশটি ছোট গল্পের এক বিশেষ সংকলন প্রভাস মজুমদার লিখিত দুই আত্মার গল্প। পুস্তক পর্যালোচনায় বৈশ্বানর

মোট দশটি গল্প নিয়ে এই বইটির আত্মপ্রকাশ।

বাতাসী শেখর এবং দুঃখহরণ এই গল্পটির মধ্যে ভাববাদ এবং বস্তুবাদের লড়াই। যে তিনটি চরিত্র এখানে লেখক উপস্থাপন করেছেন তারা প্রত্যেকেই কিন্তু স্ব-স্ব মহিমায় উজ্জ্বল। তাঁরা কেউই তাঁদের নীতি এবং আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে রাজি নয়। যদিও বাস্তব দুনিয়ায় সাম্যের ভাবনার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান থেকে গেছে। তবুও এই গল্পের চরিত্রগুলি আর্থ-সামাজিক ন্যায়- নীতির দোলাচলে বন্দি হলেও নন্দিত।

মন্দ কাজের শিবনাথ গল্পটি অত্যন্ত মনোজ্ঞ গল্প। তদানীন্তন পচনশীল সমাজ ব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে যেভাবে লেখক সমাজ ও সংস্কৃতির বিপ্লব ঘটিয়েছেন শিবনাথকে দিয়ে তা এক কথায় অনবদ্য মননশীলতার পরিচয় বহন করে।

দর্শন গল্পে তদানীন্তন সময়ের একটি বুনোট চরিত্র চিত্রায়ন হল দর্শন। যা তৎকালীন অবক্ষয়ী সমাজের চূড়ান্ত অধঃপতনকে প্রতিহত করার জন্য এই দর্শন নামি ব্যক্তিটিকে গল্পের স্বার্থে উপস্থাপন করেছেন লেখক তা কিন্তু শুধুমাত্র সৌজন্য মূলক নয়। দর্শন এক ন্যায়নীতি পরায়ন আদর্শবাদী যুবক যা ওই ক্ষরিষ্ণু সমাজের এক প্রতিবাদী স্বত্ত্বা স্বরূপ। তার যুক্তি চিন্তা বোধ এবং পরিশীলিত মননশীল চেতনার প্রকাশই সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে সংঘাত জনিত আঘাতের সূচনা করে। সাম্যবাদী চিন্তাধারায় বিশ্বাসী দর্শন তার স্ব-ভূমির এই প্রাচীন ভাবধারাকে বিবর্তনের আলোকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেও বিফল মনোরথ হয়ে তাকে ফিরে যেতে হল বিদেশেই। প্রবাসী দর্শনের বর্তমান জন্মভূমির চেহারাটা তার কাছে যেন বড়ই অচেনা মনে হয়েছে। সেদিক থেকে এই গল্পটি সময়োপযোগি ভূমিকার চূড়ান্ত রূপ বলা যেতে পারে।

মুখোমুখি গল্পে একটি কাকের আলংকারিক চরিত্র সুবল মিত্তিরের মতন একজন সহজ সরল সাধাসিদে আটপৌরে মানুষকে তার বিবর্তনবাদ ভাবনার প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়েও মূল্যবোধের দংশনে কাকের কর্কশ শব্দে যে জিজ্ঞাসার চিহ্ন সুবল মিত্তিরের মনে বারংবার উঁকি দিয়ে যায় তা সত্যিই অবর্ণনীয়। গোটা বই জুড়ে এই গল্পটি শ্রেষ্ঠত্বের দাবী রাখে।

মা গল্পটি একটি মনস্তাত্বিক ভাবনার নির্মল আবেশের পরিশুদ্ধ চেতনার অবগাহন। জীবন সন্ধ্যানী পুরন্দর, মনিমালা ও মালতীর জীবনকে যেমন পূর্ণতা দিয়েছে তেমনই দীর্ঘ দ্বান্দ্বিক সময়ের টানাপোড়েনে নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত করার এই মর্মন্তুদ ঘটনার বিস্তারই তাকে এক অনুজ্জ্বল বেদনাময় জগতে টেনে নিয়ে গেছে। কিন্তু মালতী! নিজের অজ্ঞাতসারে অন্তরের স্বাভাবিক বাসনাকে দমন করতে আত্মহননের পথকেই বেছে নিতে হল। সাত রাজার ধন এক মানিককে হারাবার যে ব্যতিক্রমী যন্ত্রনা তা ভোলার জন্য নিয়তির নির্মম সত্যের কাছে সমর্পন করা ছাড়া আর কোন উপায়ই ছিল না তার। তাই মালতীর আত্মহত্যা একদিকে যেমন বেদনাদায়ক তেমনি আর এক মা’কে অর্থাৎ পুরন্দর এর স্ত্রী মনিমালাকে তার আকাঙ্খিত মাতৃত্বকে স্বগৌরবে ফিরিয়ে দেওয়ার যে নির্মল প্রশান্তির অবয়ব তৈরী করেছেন লেখক তা এক কথায় অনবদ্য। তা শুধুমাত্র মালতীর আত্ম বলিদানের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে। সেদিক থেকে ‘মা’ গল্পটি রচনাশৈলীর সার্থক রূপায়ন বলা যেতে পারে।

রাজার দেশের রূপকথা গল্পে স্বাধীনোত্তর কালে দেশ ও জাতির অধঃপতনের প্রাক সূচনাপর্বে দেশীয় শকুনদের যে উল্লাস-আনন্দ-উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে রানীর পারিষদবর্গেরা যে পরিণতি পেল তা কিন্তু রাজধর্মের পরিপন্থী হলেও এখানে লেখক বর্তমান সময়ের যে রাজনৈতিক ভাঙনের ইঙ্গিত দিয়েছেন তা দেশ-রাজ্য এবং জাতিকে নিয়ে তা কিন্তু এক বিরামহীন পাশা খেলার শেষ পরিনতি। যা জনজীবনে ধ্বংসের পূর্বাভাস স্বরূপ। কেমন করে দেশীয় সুবিধাবাদির দল গল্পে দল লোভি সাম্রাজ্যবাদির মত গোটা পৃথিবীটাকে একদিন গ্রাস করে ফেলবে তারই একটি রূপ রেখা লেখক এই গল্পে প্রতিভাসিত করেছেন। গল্পটি রূপক ধর্মী হলেও লেখকের মুন্সীয়ানার ছাপ স্পষ্ট।

চেনামুখ অচেনা ছবি গ্রাম বাংলার ঘরোয়া জীবন কাহিনী নিয়ে রচিত এই গল্পটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে। ভাষা এবং শব্দের ব্যাঞ্জনায় মূর্ত্ত এই গল্পটিকে অত্যন্ত বাস্তব ভিত্তিক জীবনধারায় জারিত করেছে। অনেকগুলো চরিত্রের সংমিশ্রনে গঠিত এই গল্পের সবটাই বাস্তব ভিত্তিক। এবং গ্রাম বাংলার এক বুনোট অবদান। যা পাঠক মনে রেখাপাত রেখাপাত করে।

সন্ধান গল্পে দীপেনের জীবনে তৃষার ভূমিকাটা ঠিক আত্মবিশ্বাসের সলতেটা বাড়িয়ে দেওয়া আলোর শিখার মত যা দীপেনের মনের উন্মেষ ঘটাতে অনেকখানি সাহায্য করেছে। অনেকগুলি চরিত্রের অবতারণা ঘটলেও মূল চরিত্র দুটি দীপেন আর তৃষার চলমান জীবনধারাকে অব্যাহত রাখতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে দীপেনের লেখনিকে তার পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডলের আবহাওয়ায় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। একদিকে যেমন আদর্শবাদী দীপেনের সৃষ্টির আনন্দকে খুঁজে পাওয়ার যে উচ্ছ্বাস তার অবচেতন মনের দরজা খুলে দিয়েছে অপর দিকে তৃষার দ্বরাজ হৃদয় তার ব্যক্তিত্বকে নির্মল স্বাচ্ছন্দে ভরিয়ে দিয়েছে। সেদিক থেকে এ গল্পটি সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানবিকতার চূড়ান্ত প্রশস্তি বলা যেতে পারে।

দুই আত্মার গল্প গল্পে মূল দুটি চরিত্র প্রশান্ত আর পরানপ্রিয়। আরও অনেকগুলি চরিত্রের অবতারনা ঘটলেও মূল চরিত্র দুটি কিন্তু দুই মেরুর দণ্ডে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি জীবন। যাদের মধ্যে নীতি এবং আদর্শগত ফারাক থাকলেও তাদের বন্ধুত্বের যেমন টোল পড়েনি তেমনই উভয়ের মধ্যেকার অন্তর্ঘাত এবং তদানীন্তন সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের যে স্পর্শানুভূতি ঘটিয়েছেন লেখক তা অনেকটাই সময়ের দ্বান্দিকতায় দুটি জীবনের মধ্যে একটি অদৃশ্য অন্তর্ঘাতের সূচনা করে। একথা ঠিক যে প্রত্যেকটি মানুষের জীবন দর্শন কখনও এক হতে পারে না। তারা তাদের অভিব্যক্তিকে স্ব-স্ব ভঙ্গিমায় প্রকাশ করতে সক্ষম। এখানে প্রশান্ত আর পরানের জীবন দর্শনের ক্ষেত্রে মূল্যায়নের মধ্যে যে টানা- পোড়েনের চিত্র লেখক চিত্রিত করেছেন তা খুবই বাস্তব ভিত্তিক। এবং তা পরিশীলিত মনন শীলতার বহিঃ প্রকাশ মাত্র। সেক্ষেত্রে গল্পের নামকরনের সার্থকতা খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শনিভূষন গল্পে একজন অবসর প্রাপ্ত গৃহী লোকের সাংসারিক জীবনে থেকে সমাজের মন্দ ও কুরুচিপূর্ণ প্রতিবেশী বন্ধু বা পরিজনদের কটূক্তির যোগ্য জবাবে যেভাবে ধরাশায়ী করেছেন তা একজন প্রতিবাদী স্বত্তার পূর্ণাঙ্গ অবয়ব বলা যায়। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা স্ব-ঘোষিত জেহাদের এক জলন্ত প্রতিমূর্তি যেন এই শনিভূষণ। মানসিক অন্তর্ঘাতে জর্জরিত এই ব্যক্তিটির মানুষের প্রতি মানুষের এই অবমূল্যায়নকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। সেদিক থেকে লেখক শনিভূষনের এই চরিত্রটিকে একদম সার্থক রূপায়ন ঘটিয়েছেন। এই গল্পের চরিত্রটি ছোট হলেও ব্যাপ্তি সুদুর প্রসারী।

%d bloggers like this: