গুড়াপ মাঝের পাড়ার বাসন্তী আরাধনা

কিশলয় মুখোপাধ্যায়: ষাটের দশক। সময় কাল ১৯৬৭-৬৮, তখন বাংলার ফাল্গুন মাস চলছে। একদল যুবক হঠাৎ ভাবলেন গুড়াপ গ্রামে সব ঠাকুরের পুজো হলেও মা বাসন্তীর পুজো করা হয়না। তখন সেই যুবকবৃন্দ ঠিক করলেন মা বাসন্তী দেবীর আরাধনা করবেন। তৈরী করলেন একটি ঘেঁটু দল। গান বাঁধা হল। বাড়ি বাড়ি  ঘেঁটূ গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করা হল। এ ছাড়া পাড়া ও গ্রামের অনেকের কাছ থেকে আরও কিছু অর্থ সংগ্রহ হল। সেই শুরু, দেখতে দেখতে ৫৬ বছর হয়ে গেল গুড়াপের মাঝের পাড়ার মণ্ডপে পূজিত হয়ে আসছেন বাসন্তী মাতৃ দেবী। এই পুজো সুন্দর ভাবে পরিচালনা করছে গুড়াপ মাঝের পাড়া সার্বজনীন পুজো কমিটি। এই কমিটি ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

মার্কেণ্ডয় পূরাণ মতে প্রথম বাসন্তীপুজো শুরু করেন রাজা সুরথ আর বণিক সমাধি বৈশ্য। দুজনে ঋষি মেধসের আশ্রমে দেবী দুর্গার আরাধোনা করেছিলেন। তখন নাম ছিল গড় জঙ্গল, এখনকার দুর্গাপুর বলা যেতে পারে। আর রাজা সুরথের রাজ্যেের রাজধানি বর্তমানে বোলপুর শহরটি বলা যেতে পারে। জাঁক জমক করে বাসন্তী পুজো শুরু করেছিলেন ভাদুরিয়া রাজশাহীর জগৎনারায়ন। আকবরের আমলে এই সামন্তরাজা প্রায় ন লক্ষ টাকা খরচ করেছিলেন।

গুড়াপের এই পুজো দুর্গাপুজোর নিয়মেই হয়। তবে আশ্বিনের দুর্গাপুজো ও চৈত্রের দুর্গাপুজোর তফাৎ হচ্ছে ষষ্ঠী পুজোয় বোধন হয় কিন্তু বাসন্তী পুজোয়  বোধন নেই। কারণ বসন্ত কালে  দেবতারা জেগে থাকেন। এই সময়টাকে উত্তরায়ণ বলে। আবার এই বাংলায় এই দুই দুর্গাপুজোর সাথে ‘রাম’ যুক্ত রয়েছেন। যেমন শরৎকালে রাম অকাল বোধন করেছিলেন আর বাসন্তী পুজোর নবমী হল ‘রাম নবমী’। সেন যুগে এটি যোগ করা হয় এবং অকাল বোধনের কথা বাল্মিকী রামায়ণে উল্লেখ নেই।

বর্তমানে গুড়াপের এই পুজোটির কলেবর ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাঁকজমক ধিরে ধিরে বাড়ছে। তবে এবছর থেকে স্থায়ী জায়গায় পুজো হচ্ছে। জায়গাটি কমিটি কিনেছে । এবার থেকে এই স্থানেই হবে মায়ের আরাধোনা। তাই এবারে বাজেট কম। তবে রয়েছে অফরুন্ত উৎসাহ ও উদ্যোম। এই পুজোর বিসর্জনের শোভাযাত্রা দেখার মতো। গোটা গ্রাম রাস্তার দু পাশে দাঁড়িয়ে শোভাযাত্রা দেখে। কমিটির কয়েকজন সদস্য কয়েকবার নবদ্বীপের রাস শোভাযাত্রা দেখেছিল। তখনই মাথায় আসে যে বাসন্তী পুজোয় যদি এরকম কিছু করা যায়। মূলত চন্দননগরের আলো আর রাসের শোভাযাত্রার সংমিশ্রন হল এই বাসন্তী পুজোর শোভাযাত্রা।

মেলা বসে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। যেহেতু আশেপাশে বাসন্তীপুজো হয়না তাই জনসমাগম প্রচুর হয়। আশ্বিনের দুর্গাপুজো চৈত্রের দুর্গাপুজো থেকে অনেকটাই এগিয়ে। বাসন্তীপুজোর সংখ্যাও কম। তবে গুড়াপ মাঝের পাড়ার এই পুজো উত্তোরত্তোর বাড়ছে এটা আশাপ্রদ আর খুশির কথা।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading