ডাবের জল না বোতলের ঠান্ডা পানীয়

বিজ্ঞাপনের হাতছানি নাকি প্রকৃতির ওপরই ভরসা ? কোনটা বেশি প্রয়োজনীয়

স্বরূপম চক্রবর্তী: কোনটা ভাল? ডাবের জল না বোতলে ভরা ঝাঁ চকচকে দোকানের ঠান্ডা মেশিনে রাখা পানীয়। এ দুটি নিয়ে অনেকেরই মনে রয়েছে নানা সংশয়। আজকের সমাজ প্রতিনিয়ত নানা বহুজাতিক সংস্থার বিচিত্র রঙের পানীয় পান করতেই বেশী অভ্যন্ত। এখন সারা দেশের সর্বত্র খুব সহজে মেলে এই সকল পানীয়। অপরদিকে এইসকল পানীয় কতটা স্বাস্থ্যসম্মত তা নিয়ে প্রচুর গবেষণাও হয়েছে ও হচ্ছে, কিন্তু আমরা কি তাতে খুব একটা সচেতন। না, আমরা বোধহয় এই বিষয়ে খুব একটা সচেতন নয়, কারণ তা হ’লে প্রাত্যহিক জীবনে আমাদের সাথে এত ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে যেতে পারত না বহুজাতিক সংস্থার এই সকল কোমল পানীয়। আসলে আমরা ব্যবহারিক জীবন বিজ্ঞাপনের দ্বারা অনেক টাই প্রভাবিত।

অপরদিকে আমাদের দেশীয় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক একটি পানীয়কে আমরা বেমালুম ভুলে গিয়ে আজ তুলে নিয়েছি বিজ্ঞাপনের ছলনে ভুলে বোতলে ভরা বহুজাতিক সংস্থার তৈরী রঙীন পানীয় বা বিশেষ করে বিক্রয় হওয়া কিছু এনার্জী ড্রিংক। আমরা নিজেরাই প্রকৃতির এই সম্পদকে ভুলতে বসেছি। কারণ আমরা বিজ্ঞাপনকে খাই, আমরা নিজেদের বিচার, বিবেচনা, বুদ্ধি সব শিকেয় তুলে রাখি, কারণ বিভিন্ন ভাবে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ওই সকল বহুজাতিক সংস্থাগুলি আমাদের সবসময়ই নিয়ন্ত্রন করে চলেছে।

এখন দেখা যাক বোতলে ভরা ওই সকল ঠান্ডা পানীয় আমাদের কতটা উপকার সাধন করে। এই সকল পানীয় যে সকল রাসায়নিক পদার্থের সংমিশ্রনে তৈরী তা কতটা আমাদের উপকার সাধন করতে পারে তার দিকে একটু নজর দেওয়া দরকার। এই সকল ঠাণ্ডা পানীয় অধিক পরিমানে নিয়মিত পান করার ফলে একজন মানুষ নানা শারীরিক অসুবিধার সম্মুক্ষীণ হতে পারে, যার মধ্যে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের রক্তচাপ বাড়তে পরে ৩৬ শতাংশ বা ক্রমশ মোটা হয়ে যাওয়া, কোন কোন ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস রোগের কারণও এই জাতীয় ঠান্ডা পানীয়, আবার বিশেষ কোন কারণ ছাড়াই দাঁতের ক্ষয়, এ সবই ঘটতে পারে ঠান্ডা পানীয়’র দৌলতে। আসলে এই সকল ঠাণ্ডা পানীয়তে যে সকল রাসায়নিক উপাদান মেশানো হয় তার প্রধান উপকরণ জলের সাথে সেগুলিই আমাদের শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক বলে ক্রমশ জানা যাচ্ছে। প্রধানত এই সকল পানীয়তে থাকে ফসফরিক জাতীয় এ্যাসিড, অপর দিকে এই এ্যাসিডের টক স্বাদ ঢাকতে মেশানো হয় চিনি বা স্যাকারিন, এর সাথে মেশানো হয় কোক প্রধানত কোলা জাতীয় পানীয়গুলিতে।

অপরদিকে প্রকৃতির অপরূপ দান ডাব। যার জল প্রাকৃতিক পানীয়র মধ্যে অন্যতম এক মহার্ঘ পানীয়। বিশেষ করে গরমের সময়ে শরীরের কোনরকম ক্ষতি না করে আমাদের দেহের ক্লান্তি দুর করতে এবং শরীরকে চাঙ্গা করতে একমাত্র সক্ষম ডাবের জল। ডাবের জলে অল্প ক্যালোরি ছাড়াও থাকে বিভিন্ন ভিটামিন, পটাসিয়াম, সোডিযাম, ক্লোরাইড ও ফসফরাস জাতীয় মিনারেলস, এ ছাড়াও থাকে কার্বোহাইড্রেট,

সুগার, আঁশ ও সামান্য পরিমানে থাকে প্রোটিন। ডাবের জল শরীরের ইলেকট্রোলাইটিক ভারসাম্যে বিশেষ সহায়তা করে থাকে এবং শারীরিক ক্লান্তি দূর করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহন করতে পারে, যা অন্য কোন পানীয়তে পাওয়া সম্ভবপর নয়। ডাবের জলে শতকরা ৯৫.৫ ভাগ থাকে জলীয় অংশ, ০১ ভাগ থাকে আমিষ .০১ ভাগ স্নেহ ৪.০ শর্করা, ০.০৪ ভাগ খনিজদ্রব্য, আর ডাবের শাঁসে থাকে স্নেহ জাতীয় পদার্থ বেশী পরিমানে, তবে ডাবের শাঁসে ও জলে থাকে অনেক কম ভিটামিন। ডাবের জলে থাকা খাদ্যশক্তি ৪৪৪ কিলোক্যালরি, ক্যালসিয়াম, লৌহ, ভিটামিন বি২, সহ পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও গ্লুকোজ সমেত থাকে সোডিয়াম জাতীয় পদার্থ যা অন্য কোন জলে বা পানীয়তে পাওয়া সম্ভবপর নয়, আর মনে রাখতে হবে এগুলি সবই কিন্তু প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত। সম্প্রতি এক সমীক্ষায় জানা গেছে খেলোয়াড়দের জন্য ব্যবহৃত স্পোর্টস্ ড্রিংক্স এর থেকে ডাবের জলে বেশী পরিমানে পুষ্টিগত ও গুনগত বৈশিষ্ট থাকায় অদুর ভবিষ্যতে হয়তো বা ডাবের জল খেলোয়াড়দের নতুন স্পোর্টস ড্রিংক্স হিসাবে বাজারে আসলে অবাক হবার কিছুই নেই ।

কাজেই সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে ডাবের বিকল্প আজ অবধি নেই, একথা সতত প্রমানিত। তাই স্বাস্থ্যর সুরক্ষায় বোতলে ভরা বহুজাতিক সংস্থার ঠান্ডা সফট্ ড্রিংক্স নয়, অভ্যাস করুন সম্পূর্ণ দেশজ, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ডাবের জল। তাহলেই দেখবেন আপনার স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবনা কিছুটা হলেও দূর হবে।

%d bloggers like this: