উত্তর সম্পাদকীয়

স্বচ্ছ স্যানিটেশন ও বিশ্ব শৌচালয় দিবস

১৯ নভেম্বর আমরা পালন করেছি বিশ্ব শৌচালয় দিবস। বিশ্ব শৌচালয় দিবস নিয়ে কলম ধরলেন সংবাদ প্রতিখনের সিনিয়র সাংবাদিক কিশলয় মুখোপাধ্যায়

গত ১৩ নভেম্বর রায়গঞ্জের দেবীনগর কৈলাস চন্দ্র রাধারানী বিদ্যাপিঠের নবম ও একাদশ শ্রেনির ছাত্রীরা শৌচকর্ম নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে এক বর্ণাঢ্য মিছিল করে। এরপর কন্যাশ্রী ছাত্রীরা আশে পাশের মানুষদের এ বিষয় বোঝায়। রাজ্যে ‘নির্মল বাংলা অভিযান’ প্রকল্পে বাড়িতে বাড়িতে শৌচাগার তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের জলশক্তি মন্ত্রক ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন’ প্রকল্পে  যে সমস্ত জেলা ও রাজ্য ভালো কাজ করে  তাদের পুরস্কৃত করে। এই বছর বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের বিভিন্ন পঞ্চায়েত এলাকায় ‘সচ্ছ রান’ কর্মসূচি নেওয়া হয়।

১৯ নভেম্বর আমরা পালন করেছি বিশ্ব শৌচালয় দিবস। এই দিবস পালনের শুরুটা হয়েছিল সিঙ্গাপুর থেকে,  ২০০১ সালে জ্যাক সিম সিঙ্গাপুরে বিশ্ব টয়লেট সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে ১৯ নভেম্বর বিশ্ব শৌচালয় দিবস রূপে ঘোষণা করেন। এরপর জাতিপুঞ্জ ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই দিবসকে মান্যতা দেয়। এই বছর ২০২২ সালের থিম ‘ মেকিং দা ইনভিসিবিল ভিসিবিল’। শৌচাগারের অভাবে জল দূষিত হচ্ছে। সাধাররণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর যে প্রভাব পড়ছে তা বোঝাতেই এই থিম। বিশ্বের প্রায় ৬৭৩ মিলিয়ন মানুষ খোলা জায়গায় শৌচকর্ম করেন। আমাদের দেশে ২০১১ জনগণনার রিপোর্টে বলছে প্রায় ৬৭% গ্রামের মানুষ আর প্রায় ১৩% শহুরে মানুষ খোলা জায়গায় শৌচকর্ম করছেন। এর থেকেও যেটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার সেটা হল প্রায় ৪০% বাড়িতে শৌচাগার থাকা সত্ত্বেও পরিবারের কোননা কোন সদস্য খোলা জায়গায় শৌচকর্মটি করছেন। তার মানে শুধুমাত্র দারিদ্রের কারণ নয় রয়েছে সচেতনতার অভাব। একটি সমাজ কতটা সভ্য তা স্যানিটেশন সচেতনতা থেকে বোঝাযায়। আমাদের দেশের ইতিহাস বলছে সেই মহেঞ্জোদারোর আমল থেকে টয়লেট ব্যাবহার করা হচ্ছে। অনেকেরই জানা যে এখানে ব্যাক্তিগত ও সাধারণ স্নানাগার ছিল। এই সব ইতিহাস ভালো করে জানা যায় নতুনদিল্লীর ‘সুলভ ইন্টারন্যাশানাল মিউজিয়ামটিতে প্রবেশ করলে। এই মিউজিয়ামটি তৈরি করেন সমাজ কর্মী বিন্দেশ্বর পাঠক। দেশে ‘টয়লেট’ সচেতনতায় তাঁর অবদান অনেকখানি। বিহারের বাসিন্দা বিন্দেশ্বর পাঠক ছোট বেলায় দেখেছেন সমাজে স্বচ্ছ স্যানিটেশন নিয়ে নানা রকম অন্ধবিশ্বাস। পরবর্তীকালে তিনি তৈরি করলেন সুলভ ইন্টারন্যাশানাল। রূপান্তরকামী লক্ষ্মী নারায়ন ত্রিপাঠী পরিস্কার পানীয় জল, সেফ স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতার জন্য কাজ করছেন। নিউস১৮ ও হারপিক ইন্ডিয়ার যৌথ উদ্যোগে ‘মিশন পানি’ নামক কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশ নিয়ছিলেন লক্ষ্মীনারায়ণ ত্রিপাঠী।  এই মিশনে অংশ নিয়েছিলেন আই এন এন সার্টিফায়েট কোচ তথা পুষ্টিবিদ পায়েল কোঠারি। দা গাট স্টোরি অফ আওয়ার ইনক্রেডিবেল সেকেন্ড ব্রেন নামে একটি বই লিখেছেন। তিনি ছোটবেলায় দু বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন গাট-অবতার অ্যান্ড ইনইউএন। তাঁর বিভিন্ন  উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা ও কাজের মাধ্যমে জল, স্যানিটেশন,স্বাস্থবিধি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে  সচেতন করছেন। স্যানিটেশন ও স্বচ্ছ জলের সুবিধে পৌঁছনোর জন্য কাজ করছে ওয়াটার ডট অরগ ( Water.org)। এই এনজিওটির নেতৃত্বে রয়েছেন মনোজ গুলাটি। এই ভাবে সরকারি ও বেসরকারি ভাবে নিরন্তর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই সচেতনতা খুবই জরুরি। অপরিচ্ছন্নতা ও খোলা স্থানে শৌচকর্মে ডায়েরিয়া, হেলসিনথিয়াসিস প্রভৃতি রোগ ছড়ায়। এছাড়া সবচেয়ে বিপদ মহিলাদের। রাতে একা থাকলে আক্রমণের ঝুঁকি থাকে।

স্যানিটেশন সম্পর্কে রাষ্ট্রপুঞ্জ ৬ টি দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে। সেগুলো হল ১) সবার জন্য নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা করা। ২) সবার জন্য স্যানিটেশন ব্যাবস্থা ৩) জলের গুণগ  মান বৃদ্ধি ৪) জলের ব্যবহার ভালোভাবে করা ৫) সমন্বিত জল ব্যবস্থাপনা ৬) সাস্থ্য সম্বন্ধ ইকোসিস্টেম গঠন করা। ২০৩০ সালের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে এবং বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জন্য শৌচাগার নিশ্চিত করতে হবে ২০৩০ সালের মধ্যে। তবে যেভাবে কাজ চলছে তাতে লক্ষ্যমাত্রা থেকে এখন অনেক দূরে। আট বছরে অনেক বেশি কাজ করতে হবে। আশা করা যায় একদিন সবার শৌচাগার হবে। জীবন আর যাপন অনেক ভালো হবে। ছোটরা আরো ভালো থাকবে।