উত্তর সম্পাদকীয়

বিশ্ব অকাল প্রসব দিবস কি?

বিশ্ব অকাল প্রসব দিবস” আজ ১৭ই নভেম্বর। বিশ্ব অকাল প্রসব দিবস কি? এই বিষয়ে লিখছেন সংবাদ প্রতিখনের প্রতিনিধি আত্রেয়ী দো

আজ ১৭ই নভেম্বর। আজকের এই দিনটি বিশ্ব জুড়ে উদযাপিত হয় ‘বিশ্ব অকালতা দিবস’ বা ‘বিশ্ব অকাল প্রসব দিবস'(World Prematurity Day) হিসেবে। বর্তমানে এই প্রিম্যাচিওরিটি সারা বিশ্বের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।তবে আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে অপরিণত শিশু জন্মের হার সবচেয়ে বেশি ।  প্রতিবছর আনুমানিক ১৫ মিলিয়ন প্রিম্যাচিওর শিশু জন্মগ্রহণ করে যা প্রায় বিশ্বব্যাপী জন্মগ্রহণকারী সমস্ত শিশুদের ১০জনের মধ্যে ১টি। সারাদেশে প্রায় ৫-১৮% প্রিম্যাচিওর শিশুর জন্ম হয়।

অকালতা বা prematurity কি? – বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুযায়ী, যেসমস্ত শিশুরা গর্ভাবস্থার নির্ধারিত সময়ের আগেই (৩৭ সপ্তাহের আগেই)ভূমিষ্ঠ হয়, তাদের অপরিণত শিশু বা প্রিটার্ম বা প্রিম্যাচিওর শিশু বলা হয়। এই ধরনের শিশুদের মোটামুটি ৩ ভাগে ভাগ করা হয়।  ১.অত্যন্ত অপরিণত(extremely preterm) : ২৮ সপ্তাহের আগেই জন্মগ্রহণ করা শিশুদের বলা হয়ে থাকে। ২.খুব অপরিণত (very preterm) : ২৮ থেকে ৩২ সপ্তাহের মধ্যে জন্মগ্রহণ করা শিশুদের বলা হয়ে থাকে। ৩.মাঝারি অপরিণত (moderate or late preterm) : ৩২ থেকে ৩৭ সপ্তাহের মধ্যে জন্মগ্রহণ করা শিশুদের বলা হয়ে থাকে।

প্রিম্যাচিওর শিশু জন্মানোর কারণ কি? – 

নির্ধারিত সময়ের পূর্বে শিশুর জন্মের সঠিকভাবে কোনো কারণ জানা যায়নি। তবে কিছু গর্ভবতী মায়ের কিছু শারীরিক সমস্যাকে এর জন্য দায়ী করা যেতে পারে। যেমন- সুগার (মধুমেহ), উচ্চ রক্তচাপ, হৃৎপিণ্ডের সমস্যা, কিডনির সমস্যা ইত্যাদি। মায়ের শারীরিক সমস্যা ছাড়াও গর্ভাবস্থার আগে এবং গর্ভাবস্থায় অপর্যাপ্ত পুষ্টি, ধূমপান, অতিরিক্ত মাত্রায় মদ্যপান, যোনি অথবা মূত্রনালীর সংক্রমণ,অ্যামিনিওটিক পর্দার সংক্রমণ, জরায়ুর অস্বাভাবিকতা, সময়ের পূর্বে জরায়ুর সম্প্রসারণ ইত্যাদি বিষয়গুলি প্রিটার্ম শিশু জন্মের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। জিনগত কারণেও অপরিণত শিশু জন্মাতে পারে। ১৭বছরের কম এবং ৩৫ বছরের বেশি গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে অপরিণত শিশু জন্ম দেওয়ার সম্ভবনা অনেক বেশি।

অপরিণত বা প্রিম্যাচিওর শিশুর বৈশিষ্ট্য কি? – 

স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় আকারে ছোট ও কম ওজনের হয়ে থাকে, দেহের তুলনায় মাথা বড় হয়ে থাকে, ত্বক পাতলা এবং সাধারণত অতিরিক্ত গোলাপি রঙের হয়ে থাকে।

প্রিটার্ম শিশুদের সাধারণ সমস্যা- 

শ্বাসকষ্ট, খাদ্যগ্রহণে সমস্যা,স্বাভাবিকের তুলনায় দুর্বল, দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে অক্ষম, স্বাভাবিক শিশুর তুলনায় নড়াচড়া কম করা ইত্যাদি। এছাড়াও এই ধরনের শিশুরা বিভিন্ন প্রাণঘাতি সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে,যেমন – ব্রেন হ্যামারেজ,পালমোনারি হ্যামারেজ, হাইপোগ্লাইসেমিয়া, ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন,নিউমোনিয়া, অ্যানিমিয়া,শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি।

প্রিম্যাচিওর শিশুদের বিশেষ যত্ন – 

প্রিম্যাচিওর শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি কম থাকে, ফলে খুব সহজেই রোগ- জীবাণু দ্বারা সংক্রামিত হয়। তাই এদের প্রতি বাবা-মায়ের বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। ১. সঠিক পুষ্টি: জন্মের পর প্রায় কমপক্ষে ৬ মাস বয়স অবধি বাচ্চাকে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেস্ট ফিডিং করাতে হবে।  ২. পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা: এই শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব কম, তাই বাড়িতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শিশুদের ঘিরে ভীড় করা, পাবলিক প্লেস থেকে দূরে রাখতে হবে, বাইরের অন্য বাচ্চা ও দর্শনার্থীদের থেকে দূরে রাখতে হবে। শিশুদের সংস্পর্শে আসার আগে হাত ভালোভাবে ধুয়ে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে আসতে হবে। ৩. তাপমাত্রা: বাচ্চার শরীরের তাপমাত্রার দিকে বাবা-মাদের নজর রাখতে হবে। উপযুক্ত তাপমাত্রা শিশুর রোগ প্রতিরোধে এবং বৃদ্ধিতে সহায়ক। শিশুকে যে ঘরে রাখা হবে, সেই ঘরের তাপমাত্রা ২৪-২৮ ডিগ্রীর মধ্যে রাখতে হবে। ৪. নিয়মিত বিশষজ্ঞের পরামর্শ: এই শিশুরা ভীষণ দুর্বল, সহজে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ভ্যাকসিন, প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট ইত্যাদির দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ৫. খাওয়ানোর সমস্যা: এই শিশুরা খুব দুর্বল, একটু নড়াচড়া করলেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই খাওয়ানোর সময় সমস্যা হয়। অনেক সময় এদের টিউবের মাধ্যমে খাওয়ানো হয়।  ৬. ঘুম: শিশুর ঘুমের পরিমাণের থেকে গুণমান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রিটার্ম শিশুদের সঠিক খাওয়াদাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত চেক্ আপ প্রয়োজন।

প্রিম্যাচিওর শিশুকে অবহেলা করবেন না বরং যত্নে বড়ো করে তুলুন। এই প্রিম্যাচিওরিটি দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে বেগুনি রং দিয়ে উদযাপন করা হয়।