যে বাড়ির কালীঠাকুরের চোখের সঙ্গে জগন্নাথ দেবের চোখের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়

কিশলয় মুখোপাধ্যায়, হুগলি: হুগলি জেলার গুড়াপ একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। এই গ্রামের মাঝেরপাড়ায় প্রাচীন ঐতিহ্যময় কালীপুজো হয় যা মুখোপাধ্যায় বাড়ির কালীপুজো নামেই পরিচিত। এই অঞ্চলের কবি যতীন্দ্রমোহন আষ আনুমানিক ১৩৩০-৩১ বঙ্গাব্দে ‘ভক্ত পুষ্পাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থে এই কালীপুজো সম্পর্কে একটি কবিতা লিখেছিলেন। তার কয়েকটি বাক্য হল-‘ মহাঘোরা কালরূপা করাল বদনা।/ শব-শিব পরি দেবী তাণ্ডবে মগনা।/ পদভার যেন ক্ষিতি করে টলমল।/ রাঙ্গাপদে শোভাপায় জবা বিল্লদল।।’ পঞ্চমুণ্ডি আসনের ওপর দেবী বিরাজমান। দেবী ভয়াল দর্শনা, ত্রিনয়নী। চোখ দুটির সঙ্গে জগন্নাথ দেবের চোখের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রায় ১০-১১ ফুট উচ্চতার এই দেবী চতুর্ভুজা ও দক্ষািণা কালী অর্থাৎ ডান পা শিবের বুকের ওপর স্থাপিত। কালী, সহজ করে বললে বলা যায় যে কাল অর্থাৎ সময় কে কলন অর্থাৎ রচনা করেন যিনি,  তিনিই কালী। মুখোপাধ্যায় বাড়ির এই দেবী কালী এই অঞ্চলে খ্যাপা কালী নামেও পরিচিত। কারন অন্যান্য কালীপুজোর মতো এই কালীকে ঘিরে রয়েছে অনেক আশ্বর্য গল্প। যতীন্দ্রমোহন আষ ওই কবিতায় আরেক বাক্যে লিখছেন ‘ ক্ষেপী বেটী রণমাঝে ধিয়া ধিয়া নাচে।/রবি সুত সদা ভীত ঐ বেটীর কাছে’।

এই বাড়ির কালীপুজোয় ঢাক ও কাঁসি আর পুজোতে যা ব্যাবহার করা হয় যেমন ঘণ্টা,  শাঁখ এগুলো ছাড়া অন্য কোন বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ। এমনকি যাঁরা মানত করেন সেক্ষেত্রেও অন্য বাদ্যযন্ত্র ঠাকুর দালান চত্বরে বাজানো যায়না। বাড়ির পুজোর অন্যতম ঐতিহ্য হল ধুনো পোড়ানো। মুখোপাধ্যায় বাড়ির পুজোয় এই প্রথাটি রয়েছে। পরিবারের বয়ঃজ্যেষ্ঠ মহিলারা মাথায় মাটির সড়া নেন। দুই হাতেও সড়া নেন। তার আগে মোটা গামছা বেঁধে তার ওপর ধুনুচি বা মাটির সড়া বসানো হয়। তাতে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হতে থাকে। সেই মহিলার কোলে তাঁর পুত্র বা নিকট আত্মীয় বালক বা বালিকা বসে। ধুনো পোড়ানোর মাধ্যমে মা কালীর কাছে প্রার্থনা নিবেদন করা হয় পরিবারের মঙ্গল কামনার জন্য।

কালীপুজোর পরদিন হয় কুমারী পুজো। অন্নভোগ, খিচু্ড়ি ভোগ, পায়েস,  মোহনভোগ অর্থাৎ লুচি ও সুজি ভোগ দেওয়া হয়। আরও থাকে বিভিন্ন সবজির পদ, শুক্তো, শাক,  মোচা,  ভাজা,  মাছের ঝাল,  মাছের টক,  চালতার টক সহ বিভিন্ন নিরামিষ ও আমিষ পদ। অতীতে বলি প্রথা ছিল এখন সমস্তরকম বলি প্রথা বন্ধ। অর্থাৎ ছাঁচি কুমড়ো,  আখ এসবও বলি হয়না। অমবস্যা যখনই পরুক রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে পুজো শুরু হয়। সোমবার থেকে রবিবার যে বারই পরুক পরেরদিনই বিসর্জন হয়। আগে কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে বিসর্জন দেওয়া হত,  এখন ট্রেলারে করে ঠাকুর নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিমা নিরঞ্জনের দায়িত্বে যাঁরা আছেন তাঁরা বংশ পরম্পরায় এই দায়িত্ব পালন করছেন। নিরঞ্জন করা হয় যে পুকুরে তার নাম আহিরী।

 

%d bloggers like this: