পীরের মাজারে মিষ্টি ও সিন্নি চড়িয়ে দুর্গাপুজো শেষ হয় যে পরিবারে

পারমিতা চক্রবর্তী ভট্টাচার্য্য: আমাদের এই বঙ্গে তৎকালীন বনেদি বাড়ির যে দুর্গাপুজো গুলো প্রচলিত ছিল সেগুলোর মধ্যে খুব সামান্য কয়েকটিই আজ টিকে আছে। এর মধ্যে কিছু হল রাজবাড়ির পুজো, কিছু জমিদার বাড়ির পুজো, কিছু সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী বাড়ির পুজো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজতন্ত্রের অবসানে বিলোপ হয়েছে জমিদারি প্রথা। ভেঙে গেছে সেসব পরিবারগুলিও, পরিবারের সদস্যরা ছড়িয়ে গেছে অনেক দূরে, পূর্বের মত স্বমহিমায় তাই দুর্গাপুজোর আয়োজন তাই বেশ দুস্কর। হাতেগোনা কিছু বাড়িতে আজও প্রাচীনকালের দুর্গাপূজা হয়ে চলছে। এই বনেদি বাড়ির পুজোগুলির মধ্যেই আজ এমন একটি বাড়ির পুজোর কথা বলব যেটি এখনো মহাসমারোহে পুরনো ঐতিহ্যের ধারা বহন করে চলেছেন।

হুগলী জেলার পাণ্ডুয়ার নিকটবর্তী গ্রাম জামগ্রাম। এই জামগ্রামের নন্দী বাড়ির আনুমানিক ২৫০ বছরের পুজো এই বঙ্গের বনেদি বাড়ির পুজোর ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। ফিরে যাওয়া যাক, একটু পিছনের দিকে। এই বংশের আদি নিবাস ছিল  চব্বিশ পরগনার হালিশহরের কেওটা গ্রামে। সময়টা ছিল বাংলায় মুর্শিদকুলি খাঁর রাজত্বকাল বা তার কিছু আগের সময়। বর্গী আক্রমণে বিপর্যস্ত বঙ্গদেশ। বর্গীদের আক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচাতে আজ থেকে প্রায় ২৫০ বছর আগে ১১৭২ বঙ্গাব্দে অধুনা হালিশহরের কেওটা গ্রামের নন্দী পরিবারের দুই ভাই, রামশঙ্কর ও কুবেরশঙ্কর চলে আসেন হুগলী জেলার পান্ডুয়ার কাছের  জামগ্রামে। জীবনরক্ষায় সেসময়ে  তারা ঘরে ফুলুরি বানিয়ে সেই ফুলুরি নিয়ে আশেপাশের গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় ফেরী করে বেড়াতেন। এমনই একদিন ফুলুরি ফেরি করে বেড়ানোর সময় এক পীরের দেখা পেলে  গরমের দুপুরে সেই পীরকে খাবার ও জল দিয়ে পীরের আশীর্বাদ পান তারা । খুশি হয় পীর তাঁদের একটি স্বর্ণ মোহর দেন ও তার সাথে বলেন যে এই মোহর দিয়ে যেন অবিলম্বে তারা কিছু ব্যবসা শুরু করেন, আর অচিরেই তাঁদের অবস্থা ফিরবে এমনও ভবিষ্যৎবানী করেন। দুই ভাই জানতে চাইলে পীর বলেন,  সামনে যা দেখবে তার  ব্যবসা যেন তারা শুরু করে।  এমতবস্থায় দুই ভাই রামশঙ্কর ও কুবেরশঙ্কর নন্দী কলকাতায়  আদি গঙ্গার তীরে সুপারি  ভর্তি জাহাজ নোঙ্গর করা দেখে পীরের ওই মোহর দিয়ে সমস্ত সুপারি বায়না করে নিয়ে সেই সুপারি বিক্রি করেই শুরু করেন তাঁদের ভাগ্য ফেরানোর পালা। এরপো ধীরে ধীরে আরো বেশকিছু  মশলা যেমন হলুদ, জিরে, ধোনের  ব্যবসাও শুরু করেন এবং তাদের এই ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ে গড়িয়া থেকে পোস্তা পর্যন্ত। এভাবেই একসময় ব্যবসায় উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ঘটে তারা সেসময় পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক সংস্থায় পরিণত হয়।

বর্তমানে প্রায় ১৩ বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত এই নন্দীবাড়ির মূল বসত বাড়ির শুরুতেই রয়েছে রাস মন্দির, শ্রীকৃষ্ণ যেখানে আরাধ্য দেবতা। পঞ্চ শিখর বিশিষ্ট এই মন্দিরের সবচেয়ে উপরে খোদিত আছে কৃষ্ণের আবক্ষ মূর্তি, তার পরবর্তী নীচের ধাপে আছেন, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের আবক্ষ মুর্তি। রাস মন্দির ছেড়ে মূল ভবনে প্রবেশ করলে দেখা মেলে সুপ্রাচীন সেই  ঠাকুর দালান, যেখানে এই পরিবারের  দুর্গা পুজো ও অন্যান্য পুজো হয়।  বাইরে থেকে দেখলে এই বসত বাড়ির বিশালত্ব আন্দাজ করা যাবেনা। বাড়ির ভেতর দিকে ঢুকলে এক অদ্ভুত রকমের স্থাপত্য চোখে পড়বে, অলিগলি, ছোট উঠোন সম্বলিত বসতবাড়ির অন্দরটা অনেক ছোট ছোট পরিবারের আবাসস্থল। আর অন্যান্য বনেদি বাড়ির মতো সেগুলি ফাঁকা পরে নেই, এখনো সমস্ত বসতবাড়িতে রয়েছে বংশের সব সদস্যরা। খুব জটিল অলিগলির ভেতর দিয়ে চলে গেলে চোখে পড়বে  এক বিশাল দালান যেখানে প্রায় শ’পাঁচেক লোক একসাথে খেতে পারে, আর পাশের ফাঁকা অংশটিকে আরো একটু বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে আরো লোক বসিয়ে খাওয়ানোর জন্য। ভেতরে রয়েছে নন্দীদের গৃহদেবতা লক্ষ্মী জনার্দন এর মন্দির। আজও এই পরিবারের পুজো সহ সকল কাজ চলে এই ট্রাস্টের নামেই।

সারা বছর এই নন্দীবাড়িতে  জন্মাষ্টমী, রথযাত্রা, সরস্বতী পুজো, কার্তিক পুজো এবং দুর্গাপুজো সাড়ম্বরে পালিত হয় । অজক্যের সময়ে অধিকাংশ বনেদি বাড়ির পুজোগুলি তাঁদের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার কারণে আড়ম্বর হারালেও আজও জামগ্রামের নন্দী বাড়ির দুর্গা পুজো সেই অতীত আড়ম্বর ধরে রেখেছে। এর কারণ, কোনও যৌথ পরিবারের এতো সদস্যদের সকলে একসঙ্গে থাকার নজির সারা ভারতে খুব দুর্লভই। প্রথমে মূল ভবনে পরিবারের সকল সদস্যরা থাকলেও পরবর্তীকালের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকে আশেপাশের তাদেরই অধিকৃত জায়গায় পৃথক বাসভবন বানিয়ে থাকা শুরু করেন। ফলত আজ নন্দী বাড়ির দুর্গাপুজো যে আদি বসত ভিটেতে হয় তার আগে পিছে অনেক খানি এলাকা জুড়ে শুধু নন্দীদেরই পরিবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। জামগ্রামের এই এলাকাটি যেন নন্দীদের গ্রামে পরিণত হয়েছে। বাংলা তথা ভারতের আর কোথাও এত বড়ো যৌথ পরিবার ক’টা আছে হাত গুনে বলা যায়৷ জামগ্রামের নন্দীদের এই বসতবাড়িতেই বর্তমানে প্রায় ২০ টির মতো পরিবার বাস করে।

বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজোর সময় এদের পরিবারের সকল সদস্যরা একত্রিত হন। বাইরে যারা থাকেন তাঁরাও চলে আসার চেষ্টা করেন এসময়। ফলত পরিবারের সকল সদস্যরাই পুরো উৎসবের কাজে নেমে পড়েন। এক সদস্যের কথায় জানা গেল যে এসময় তাদের নিজেদের জন্য রোজ প্রায় হাজার দুয়েক লোকের রান্নার আয়োজন করতে হয়।

এই বাড়ির পুজো হয় বৈষ্ণব মতে, তাই এখানে বলিপ্রথা নেই আর পুজোর কদিনের এই বাড়ির খাওয়া দাওয়াও নিরামিষ। ষষ্টীতে দেবীর বোধন থেকে পুজোর শুরু, পুজোর চারদিনের মধ্যে নবমী বাদের রোজই চালের নৈবেদ্য সহ ফল মিষ্টির ভোগ দেওয়া হয়। পুজোর পাঁচদিন মোট ৩৫-৩৬ মন চালের নৈবেদ্য অর্পণ করা হয় মাকে। নবমীতে হয় অন্ন ভোগ, সম্পুর্ন নিরামিষ খাওয়া হয় পুজোর চারদিনই। আর এই নবমীর দিনই যে কেউ এখানে ভোগ গ্রহণ করতে পারেন সে ব্যবস্থা করা হয়। এই দিন তাই বিশাল আয়োজন হয়, পরিবারের ২০০০ সদস্য সংখ্যার বাইরে ভোগ প্রার্থীর সংখ্যা কত হবে তা জানা থাকেনা। যেমন যেমন ভিড় হয় সেই বুঝে আয়োজন হতে থাকে। কেউ সেদিন নন্দীবাড়ি এসে অভুক্ত থাকেন না। যে বিষয়টি এই সময়ে বিশেষ কৃতিত্বের দাবি রাখে সেটি হলো দুর্গাপুজোর চারদিন এই গ্রামে কোনো মাইক বাজে না৷ তখন শুধুই ঢাকের বোল শোনা যায়৷ সব মিলিয়ে আজও নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অক্ষুন্ন রেখেছে এই পরিবার৷ পরিবারের বর্তমানের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য ৯১ বছরের সত্যনারায়ণ নন্দী জানলেন এক হৃতপ্রায় উপাচারের কথা, আজও এই পরিবারের পুজোয় নবমীতে  নবগ্রহ হোম হয়। আর এই হোমের  যে বেদী তৈরী হয় তা মূলত একটি ঘনক আকৃতির মঞ্চ, যে ঘনকের এক বাহুর মাপ নেওয়া হয় পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্যের হাতের মাপ অনুসারে। এই ভাবে বেদী তৈরী করে নবগ্রহ হোম করার রীতি পালিত হত বর্ধমান রাজ পরিবারে, কিন্তু এখন সেখানেও আর এই পুজোর নিয়ম পালিত হয় না।

 

নিতান্ত সাধারণ অবস্থা থেকে ব্যবসায় রমরমিয়ে শ্রীবৃদ্ধি হলেও আজও কিন্তু নন্দী বাড়ির সদস্যরা মনে করেন এসব পীরের আশীর্বাদেরই ফল, তাই আজও নবমীর অন্নভোগ দিয়ে মায়ের পুজো শেষ হলে সেই ভোগ প্রথম কোনও মুসলিম সম্প্রদায়ের লোককে দেওয়া হয় বা খাওয়ানো হয়, আর তারপরই কেবল পরিবারের লোকেরা সেই ভোগ গ্রহণ করেন। আবার অন্যদিকে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর পরদিন নন্দী বাড়ি থেকে সদস্যরা মহা সমারোহে ঢাক কাঁসর বাজিয়ে দে পাড়ার পীরের দরগায় যান। সেখানে পীরের মাজারে মিষ্টি ও সিন্নি চড়িয়ে তবেই দুর্গাপুজোর অনুষ্ঠানিক সমাপন  হয় সেই বছরের মত এই পরিবারে।

ছবি: পারমিতা চক্রবর্তী ভট্টাচার্য্য ও জামগ্রাম নন্দী বাড়ি ফেসবুক গ্রুপ

%d bloggers like this: