কলকাতা ছাড়িয়ে বনেদি বাড়ির পুজোর সুলুক সন্ধান- চতুর্থ পর্ব

কলকাতা ছাড়িয়ে বনেদি বাড়ির পুজোর সুলুক সন্ধানের আজকের পর্বে হুগলি জেলার অন্যতম জনপদ মশাটের বাবু বাড়ির ৩৭৬ বছরেরও প্রাচীন দুর্গাপুজো  এবং হুগলি জেলার হরিপালের ‘সাত রায় বাড়ির’ সুপ্রাচীন পুজো সম্পর্কে আলোকপাত করলেন সংবাদ প্রতিখনের সাংবাদিক কিশলয় মুখোপাধ্যায়

বাবু বাড়ি –মশাট

হাওড়া বর্ধমান কর্ড শাখায় বারুইপাড়া স্টেশন। এখান থেকে বাসে ২০ মিনিটের পথে বনমালিপুর চৌমাথা, এখান থেকে কিছুটা গেলে পৌঁছে যাওয়া যাবে মশাটের চট্টোপাধ্যায় বংশের বাড়ি আর এই পরিবারেই প্রাচীন দুর্গাপুজো হয় যা ‘বাবু বাড়ির’ দুর্গাপুজো নামে পরিচিত। অনেক বছর আগে পুরন্দর চট্টোপাধ্যায় হুগলি জেলার মশাটে এসেছিলেন। বর্তমান দুর্গাদালান সংস্কার করা হয় ১৯৯৬ সালে। তখন ওখানে একটি ফলকে লেখা ছিল ১১৬৯ বঙ্গাব্দ। সেই হিসেবে পুজোর বয়স প্রায় ২৬০ বছর। তবে তার আগে বাড়ির মনসাতলাতে প্রায় ১১৬ বছর পুজো হয়েছে। তাহলে প্রায় ৩৭৬ বছর ধরে পুজো হচ্ছে। এই মনসাতলা বা বেদীতে এখন নবপত্রিকা স্নান করানো হয়।

দুর্গাদালানটি তৈরি করেন গৌরমোহন চট্টোপাধ্যায়। সেই সময় বাড়ির মহিলাদের বাইরে এসে পুজো দেখার অনুমতি ছিলোনা তাই দোতলার বারান্দায় তাঁদের জন্য বিশেষ ব্যাবস্থা ছিল। মহালয়ার পরদিন থেকে পুজো শুরু হয় এবং সেই দিন থেকে নিরামিশ খাওয়া শুরু হয় চলে নবমী পর্যন্ত। অতীতে এই অঞ্চলে কৌশিকি নদী বইত। বাড়ির কিছু দূরে রয়েছে সুপ্রাচীন বিশ্বেশর মন্দির এবং পাশে একই নামে পুকুর রযেছে । এখানেই প্রতিমা বিসর্জন হয়। দুর্গা দালানে খোদাই করা আছে বংশতালিকা আর রযেছে ছন্দাকারে লেখা বংশের ইতিহাস। তার কয়েকটি বাক্য হল-

‘প্রজন্ম প্রণতি লহ কাশ্যপের পুরন্দর / সন্তম জগন্নাথ, পৌত্র চন্দ্রনাথ প্রবর / একদা স্রোতাস্বতী, কৌশিকি উজানে / বংশের পত্তন করেন তটস্থ মশাণে।

সাত রায় বাড়ি-হরিপাল

হুগলি জেলার হরিপালে ‘সাত রায় বাড়ির’  দুর্গাপুজোয় এক চালার প্রতিমায় গণেশ ও কার্তিক ওপরে আর লক্ষ্মী ও সরস্বতী নিচে বিরাজমান। দশমীর দিন বিসর্জনের সুতো কাটা হয়না কারন পুজোর সময় কোনরকম সুতো বন্ধন করা হয়না। প্রতিমা ডাকের সাজ ও দেহে রয়েছে নজরকাড়া পুঁতির অলঙ্কার। ঠাকুরের ওপরে বাহন নিয়ে মহাদেব বিরাজমান। নন্দ উৎসবের দিন প্রতিমার কাঠামোয় গঙ্গা মাটির প্রলেপ দিয়ে পুজো শুরু হয়। এই দিন রায় বাড়ির গুরু বাড়ি ভট্টাচার্য বাড়ির একজন উপস্থিত থাকেন। কালিকা পূরান অনুসারে দেবীর বোধন হয়। প্রতিমার সঙ্গে থাকে তিনটি কলাবউ। প্রতিপদ, চতুর্থী আর ষষ্ঠীর দিন তিনটি নবপত্রিকা পুজো করা হয়।

ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রথম দুটি কলাবউ থাকে বোধন ঘরে। সন্ধি পুজোর সময় রায় বাড়িতে ফাটানো বাজির আওয়াজ রিলে সিস্টেমে গ্রামের পর গ্রাম সেই বাজি ফাটতে ফাটতে পাশে বাহিরখন্ড গ্রামের খাঁ বাড়িতে সন্ধি পুজোর সূচনা হয়। রায় বাড়ির সন্ধি পুজোর সময় জল ঘড়ির প্রথা চালু আছে। বাদ্যকাররা আসেন বাঁকুড়ার কোতলপুর থেকে। দশমীর দিন ঠাকুর বরণ করেন বাড়ির পুরুষ সদস্যরা এবং কনকাঞ্জলী গ্রহন করেন স্বয়ং পুরোহিত মহাশয়। চালের সাথে একটি কয়েন থাকে যা লক্ষ্মী পুজোর আগে রায়দের গুরু বাড়ি ভট্টাচার্য্য বাড়িতে পাঠানো হয়।

এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা শিবনাথ মজুমদার মোগল সম্রাট আকবরের কাছ থেকে রায় উপাধি পান। তাঁর সাতটি সন্তানের মধ্যে পালা ভাগ করে পুজোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রথম ও তৃতীয় পুত্রকে সপ্তমী পুজো, সপ্তম পুত্রকে অষ্টমী পুজো, দ্বিতীয় পুত্রকে সন্ধিপুজো এবং চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ পুত্রকে নবমী পুজোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। আজও এই সাত পুত্রের উত্তরসূরি এই নিয়মে সাত রায় বাড়ির ঐতিহ্যময় মহামায়ার আরাধনা করছেন।

 

 

 

%d bloggers like this: