বর্তমান সময়

ভারতের অন্যতম সেরা কার্টুনিস্ট

গতকাল আমরা পালন করেছি ভারতের অন্যতম সেরা কার্টুনিস্ট তথা ক্যারিকেচার শিল্পী রেবতীভূষণ ঘোষের জন্মদিনের একশত দুই বছরতাঁর স্মৃতিচারণে সংবাদ প্রতিখনের সাংবাদিক কিশলয় মুখোপাধ্যায়

কলকাতার রিপন কলেজে (এখন নাম সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) তখন বাংলা পড়াচ্ছেন বিখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশী। তিনি দেওয়াল পত্রিকায় এক ছাত্রের রাজনৈতিক ব্যাঙ্গচিত্র তাঁকে মুগ্ধ করে। তিনি ছাত্রটিকে ডেকে বললেন এই কার্টুন চিত্রটি কোন ভালো পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়া দরকার। তখন ছাত্রটি সংস্কৃত নিয়ে পড়ছেন। মূলত এই সাহিত্যিকের উৎসাহে সে সময়কার অন্যতম পত্রিকা ‘ সচিত্র ভারত’  পত্রিকায় প্রকাশিত হল চিত্রটি। আর এখান থেকেই শুরু হল তাঁর সুদীর্ঘ কর্মময় জীবনের পথ চলা। এই ছাত্রটি হলেন ভারতের অন্যতম সেরা কার্টুনিস্ট তথা ক্যারিকেচার শিল্পী, অলঙ্করণ, কবি রেবতীভূষণ ঘোষ। যিনি আজকের দিনে অর্থাৎ ৫ সেপ্টেম্বর ১৯২১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কলেজ পাশ করার পর অবশ্য কিছুদিন  তিনি জুনিয়র ক্লার্ক পদে কাজ করেন বার্মা শেল কোম্পানিতে আর অবসরে চলত কার্টুন আঁকা। তারপর ‘ফুল টাইম’ মনসংযোগ করলেন কার্টুন অঙ্কন চর্চায়।

এই সময় উল্টোরথ, সচিত্র ভারত, সত্যযুগ,  আনন্দবাজার পত্রিকা, অচলপত্র, নবকল্লোল প্রভৃতি পত্র পত্রিকায় তাঁর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশিত হতে থাকে। দেশের অন্যতম সেরা কার্টুনিস্ট কেন উল্লেখ করা হল। কারণ তিনি প্রায় ২০ বছর সুনামের সঙ্গে দিল্লিতে কাজ করেছেন। রেবতীভূষণ শঙ্কর উইকলিতে নিয়মিত আঁকা পাঠাতেন। প্রতিটি  কার্টুনে মুখ্য চরিত্রে থাকতো পশু আর পাখি।দেশের কার্টুনের জনক শঙ্কর রেবতীভূষণের সহজ সরল পশুপাখির স্কেচ দেখে বুঝেছিলেন তাঁর প্রতিভা। শঙ্কর পিল্লাই ‘ চিলড্রেন বুক ট্রাস্ট’ পত্রিকায় সিনিয়ার আর্টিস্ট পদে যোগ দিতে আমন্ত্রন জানালেন। দিল্লিতে শুরু হল রেবতীভূষণের অসাধারণ কর্মময় জীবন। রেবতীভূষণের আঁকা, ছোটদের মনমতো সুন্দর সুন্দর সব গল্প আর ঝকঝকে ছাপা। ‘মাংকি অ্যান্ড দ্য ওয়েজ’,  ‘দ্য ফুল প্যারাডাইস’  ইত্যাদি গল্পগুলি অসম্ভব জনপ্রিয় হল খুদে পাঠক মহলে। ছোটদের পত্রিকাটি ছাড়াও তিনি ফ্রিল্যান্স করতেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস,  জনযুগ, ন্যাশানাল হেরাল্ড,  হিন্দুস্তান টাইমের মতো পপুলার পত্র পত্রিকায়। ১৯৪৫ সালে দেশের ফিল্ম বিভাগে প্রতিষ্ঠিত হল কার্টুন বিভাগ।

 

প্রথম সফল কার্টুন ছবি ছিল দুটি। একটি হল ‘জাম্বোফক্স’  আর অপরটি হল ১৯৫১ সালে রিলিজ হওয়া নিউ থিয়েটার্সের একটি ধুরন্ধর ইঁদুরের গল্প ‘মিচকে শয়তান’। এই অ্যানিমেশন ফিল্মের চরিত্র চিত্রন থেকে শুরু করে গল্প তৈরি করা সবক্ষেত্রেই অনবদ্য সৃজণের ছাপ রেখেছিলেন রেবতীভূষণ। তিনি এই গল্পটি আগে সচিত্র ভারতে এঁকেছিলেন। তাঁর অ্যানিমেশনে হাতেখড়ি হয় মন্দার মল্লিকের অ্যানিমেশন স্টুডিওতে। রেবতীভূষণ নিজেই যোগাযোগ করেছিলেন। দুজনে মিলে ১৯৩৯ সাল নাগাদ ‘আকাশ পাতাল’  নামে অ্যানিমেশন ফিল্ম তৈরি করলেন। এরপর ম্যলেরিয়ার বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে ‘কুইন অ্যানোফিলিশ’  নামে তৈরি করলেন কার্টুন ছবি।

আঁকার সঙ্গে সঙ্গে  তিনি কবিতা, ছড়াও লিখতেন। যুগান্তর সংবাদপত্রে তিনি শুরু করলেন ‘ব্যঙ্গ বৈঠক’ নামে একটি বিভাগ। তাতে রেবতীভূষণের আঁকার সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা ছড়া। বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল এই বিভাগটি। দিল্লি থেকে ফিরে এলেন কলকাতায়। এই সময় কার্টুন এঁকেছেন স্টেটসম্যান ও আজকাল সংবাদপত্রে। রেবতীভূষণ ছিলেন আড্ডাপ্রিয়, মিশুকে আর বাংলা ভাষা ছাড়া অসাধারন দক্ষতা ছিল ইংরাজি, হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষায়। খুব ভালো সেন্স অফ হিউমার এই মানুষটির প্রথম একক প্রদর্শন হয় ১৯৯৭ সালে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে। শিশুসুলভ সারল্য, উদারমন, আঁকায় স্বশিক্ষিত রেবতীভূষণ ঘোষ ২০০৭ সালে ইহলোক ত্যাগ করেন।