

কিশলয় মুখোপাধ্যায়: বিশ্বকবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর তখন দক্ষিণ ভারত ভ্রমন করছিলেন। ১৯১৯ সালে দক্ষিন ভারত সফর কালে অন্ধ্রপ্রদেশে থিওসফিক্যাল কলেজে কবির সম্মানে একটি সভার আয়োজন করা হয়েছিল। এখন কলেজটির নাম বেসান্ত থিওসফিক্যাল কলেজ। সেই সভায় কবি নিজে ‘জনগণমন অধিনায়ক’ গানটি পরিবেশন করেন। গানটির কথা ও সুর শুনে শিক্ষক, ছাত্র ও উপস্থিত দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে কবিকে অনুরোধ করলেন ইংরাজিতে মানে বলে দেওয়ার জন্যে। কবি গানটির অনুবাদ করে নিজের হাতে লিখে অধ্যক্ষকে উপহার দেন। রবীন্দ্রনাথের অনুমতিক্রমে ঐ কলেজের দৈনিক প্রার্থনা সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া শুরু হয় এবং পরে কলেজের পত্রিকায় কবির হাতের লেখার প্রতিলিপি সহ প্রকাশিত হয়। ইংরাজি অনুবাদের নাম কবি দিয়েছিলেন ‘দি মর্নিং সঙ অফ ইন্ডিয়া’। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলে জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকা অনিবর্য হয়ে ওঠে। জাতীয় সঙ্গীত সম্পর্কে স্পেনের দার্শনিক কাস্তোরিয়াদিস বলেন ‘নেশন-চিহ্ন হল সেই প্রতিক যার জন্য দেশপ্রেমী মানুষ জান কবুল করতে পারে। ফৌজি কুচকাওয়াজের সঙ্গে যে সুর শিরদাঁড়ায় শিহরণ খেলিয়ে তাকে যে কোন কাজে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় অনেক দেশাত্ববোধক গান লেখা হয়েছিল। তার মধ্যে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে দুটি গান সর্বজনগাহ্য হয়। একটি হল জনগণমন অধিনায়ক আর অপরটি হল বন্দেমাতরম। বঙ্কিম চন্দ্রের লেখা গানটি তখন ছিল জাগরণ মন্ত্র। ‘সুজলাং সুফলাং মলয় জশীতলাং/শস্য শ্যামালাং মাতরম’। অপূর্ব এই সুন্দর গানটির ভাষা সংস্কৃত। ১৮৯৬ সালে কংগ্রেস অধিবেশনে গানটি গাওয়া হয়েছিল। উচ্চারণ কঠিন। সাড়া পড়ল তবে সর্বজনীন হলোনা। ‘জনগণমন অধিনায়ক’ গানটি ১৯১১ সালে ২৭ ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেস অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে সরলা দেবীচৌধুরানীর পরিচালনায় প্রথম গানটি গাওয়া হয়েছিল। এই বছরেই কবি রবীন্দ্রনাথ এই গানটি লেখেন। এই অধিবশনের প্রথম দিন ‘বন্দেমাতরম’ গানটি গাওয়া হয়েছিল। গানটির ইংরাজি অনুবাদ করেছিলেন ঋষি অরবিন্দ। জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে একটি বাছার সময় শুরু হল আলাপ আলোচোনা তর্ক বিতর্ক। এক সময় পরিবেশ উত্তপ্ত পর্যায় চলে যায়। যাইহোক শেষমেশ ভারতের সংবিধান রচনার সময় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু জনগণমন অধিনায়ক গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হবে কিনা ভারতের সব কটি প্রাদেশিক সরকারের মতামত গ্রহণ করার প্রস্তাব রাখেন। দুটি প্রদেশ ছাড়া বাকি সবাই জনগণমন গানটির পক্ষে মত দেন। ১৯৫০ সালে ২৪ জানুযারি রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ সংসদে বলেন জনগণমন অধিনায়ক সঙ্গীতকে ভারতের ন্যাশানাল অ্যান্থেম হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে বন্দেমাতরম গান ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। সেইজন্য এই গানটিকেও সমান মর্যাদা দেওয়া হবে। এই দিনেই ন্যাশানাল অ্যান্থাম রূপে ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে’ এবং ন্যাশানাল সঙ রূপে ‘বন্দেমাতরম’ গ্রহণ করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। জনগণমন গানটির পাঁচ স্তবকের মধ্যে সাত লাইনের প্রথম স্তবকটি নেওয়া হয়। ৫২ সেকেন্ডের মধ্যে গানটি গাওয়া শেষ করতে হয়। রোমান ও দেবনাগরীতে গানটি লেখার অনুমতি দেওয়া হয়। কোন কোন অনুষ্ঠানে সময় সংক্ষেপের জন্য প্রথম ও শেষ পঙক্তি ২০ সেকেন্ড সময় সীমার মধ্যে গাইতে হয়। সেই সঙ্গে বন্দেমাতরম সঙ্গীতটিও সংবিধানে সমান মর্যাদা দেওয়া হয়।
