বিবিধ

কৈশোরকালীন পুষ্টি

0214563

pusti

আত্রেয়ী দো: কৈশোরকাল যার ইংরেজি অর্থ ‘Adolescent’, শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘Adolescere’ থেকে যার অর্থ হল ‘ to grow’ অর্থাৎ বৃদ্ধি হওয়া। সাধারণত ১০-১৯ বছর বয়স অবধি সময় কালটাকে বলা হয় কৈশোরকাল। এই সময়টাকে জীবনের ‘দ্বিতীয় সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধির পর্যায় (second fastest growing stage of life) বলা হয়। কারণ এই সময়েই শরীর বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায়, বয়:সন্ধির সূচনা হয়। তবে শুধু শারীরিক পরিবর্তনই নয়, মানসিক, সামাজিক, প্রাক্ষোভিক, বৌদ্ধিক/ জ্ঞানের বিকাশও হয়। তাই এই সময় পুষ্টির ঘাটতি হলে তা বৃদ্ধি ও বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। বয়:সন্ধির এই সময়টাতে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজের জন্য প্রচুর শক্তির (এনার্জি) প্রয়োজন হয়, যা আমরা প্রতিদিনের খাবার থেকে পেয়ে থাকি। প্রথমেই আসি শর্করার (কার্বোহাইড্রেট) কথায়। মোট শক্তির প্রায় ৫০% হতে হবে শর্করা জাতীয় খাবার। অর্থাৎ শর্করা জাতীয় খাবার যেমন ভাত, রুটি, পাউরুটি, শ্বেতসার বহুল শাকসবজি, ফল, দুধ, দুধ জাতীয় খাবার ইত্যাদি প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় থাকা আবশ্যক। প্রাত্যহিক প্রায় ১৩০ গ্রাম শর্করা জাতীয় খাবার খাওয়া প্রয়োজন। শরীরের কোষ, মাংসপেশীর বৃদ্ধি ও মেরামতের জন্য প্রোটিন অপরিহার্য। দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার, ডিম, মাছ, মাংস, সবুজ শাকসবজি, ডাল এবং ডাল জাতীয় শস্য যেমন সয়াবিন, মটরশুঁটি, বরবটি ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন পাওয়া যায়। প্রতিদিন দৈহিক ওজনের প্রতি ১ গ্রাম পরিমাণ প্রোটিন গ্রহণ প্রয়োজন। অর্থাৎ, কারোর ওজন যদি ৩৪ গ্রাম হয় তার প্রতিদিন প্রায় ৩৪ গ্রাম প্রোটিন জাতীয় খাবার খাওয়া দরকার।

new-advt

ফ্যাট/ স্নেহজাতীয় পদার্থ শরীরে প্রচুর পরিমাণে শক্তির জোগান দেয়। শুধু তাই নয় বেশি কিছু ভিটামিন (Fat Soluble Vitamins) গ্রহণেও সাহায্য করে। দুধ, ঘি, মাখন, পনীর, চিজ, বাদাম, তেল ইত্যাদি হল স্বাস্থ্যকর স্নেহপদার্থ। মোট এনার্জির প্রায় ২৫-৩৫% ফ্যাট জাতীয় খাবার খেতে হবে। তবে, অতিরিক্ত ফ্যাট জাতীয় খাদ্য গ্রহণ,অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট জাতীয় খাবার অর্থাৎ ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলতে হবে।

1efab-9a4f02_51435a5163204d4c9eb67ab6f3a56a68mv2

এবার আসি ভিটামিনের কথায়। ভিটামিন শারীরিক বিকাশ ও বৃদ্ধিতে অন্যতম ভূমিকা পালন করে। ভিটামিনের ঘাটতি স্বরূপ বিভিন্ন অসুখ দেখা যায়। যেমন – ভিটামিন A এর ঘাটতিতে হতে পারে রাতকানা। প্রাত্যহিক প্রায় ৭৭০-৮৬০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন A সেবন প্রয়োজন, যা আমরা মূলত পাই বিভিন্ন শাক সবজি যেমন টম্যাটো,গাজর, পেঁপে, পালং শাক, লেটুস শাক, ব্রোকোলি, ক্যাপসিকাম , কুমড়ো ইত্যাদিতে। ভিটামিন B12 এর অভাবে হতে পারে অ্যানিমিয়া। প্রতিদিন প্রায় ২.৫ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন B12 জাতীয় খাবার খাওয়া দরকার, যা আমরা মাছ (বিশেষত সামুদ্রিক মাছ), মাংস, দুধ, দুধ জাতীয় খাবার,ডিম, মাশরুম ইত্যাদি থেকে পেয়ে থাকি।ভিটামিন C এর অভাবে হতে পারে স্কার্ভি (মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ)।প্রাত্যহিক খাদ্য তালিকায় ৫৪-৬৮ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন C থাকা প্রয়োজন, যা আমরা সহজেই পেয়ে থাকি বিভিন্ন টক জাতীয় ফল (যেমন পাতিলেবু কমলালেবু,আমলা,কিউয়ি ইত্যাদি), লঙ্কা, ক্যাপসিকাম,টম্যাটো আলু, গাঢ় সবুজ শাকসবজি ইত্যাদি থেকে। ভিটামিন D এর অভাবে হতে পারে রিকেট,হাড়ের দুর্বলতা, দ্রুত ক্ষয় । এছাড়াও ভিটামিন D এর ঘাটতি শরীরে ক্যালশিয়াম শোষণেও বাঁধা দেয়। প্রাত্যহিক প্রায় ৬৬০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন D সেবন প্রয়োজন, যা আমরা সহজেই দুধ, দুধ জাতীয় খাবার, ডিম, মাছ, মাংস, কর্ড লিভার অয়েল ইত্যাদি থেকে পেয়ে থাকি।

92a03-9a4f02_3b93dab5c7d14f67afae52ceac3ab2d5mv2

প্রতিটা ভিটামিনই পর্যাপ্ত পরিমাণে সেবন করা অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন ধরনের ফল,শাকসবজি ভিটামিনের প্রধান উৎস। মিনারেলস / খনিজ পদার্থ শরীরের ইমিউনিটি/ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। কিছু মিনারেলস আছে যাদের আমাদের শরীরে অনেক বেশি মাত্রায় প্রয়োজন হয় তাদের ম্যাক্রো মিনারেলস বলে। যেমন – ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সালফার, ফসফরাস , সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্লোরাইড ইত্যাদি। কিছু মিনারেলস আছে যাদের আমাদের শরীরে ভীষণ কম মাত্রায় প্রয়োজন হয়, এদের ট্রেস মিনারেলস বলে। যেমন – আয়রন, আয়োডিন, কপার, জিঙ্ক ক্লোরাইড, সেলেনিয়াম ইত্যাদি। মিনারেলসের ঘাটতিতেও বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। যেমন -আয়রনের ঘাটতিতে অ্যানিমিয়া, ক্যালসিয়ামের ঘাটতিতে হাড় ও দাঁতের গঠন বাধাপ্রাপ্ত হয়, সহজেই ক্ষয়ে যায়, আয়োডিনের ঘাটতিতে গয়টার(গলগন্ড) হয় ইত্যাদি। শাকসবজি,ফল ইত্যাদি মিনারেলসের প্রধান উৎস।এছাড়াও কিছু মিনারেলস যেমন প্রাত্যহিক ৮৫০-১০৫০ মিলিগ্রাম ক্যালশিয়াম সেবন জরুরি,যা আমরা প্রচুর পরিমাণে পাই দুধ, দুধ জাতীয় খাবার, ডিম ইত্যাদি থেকে। প্রতিদিন প্রায় ১৬-৩২ মিলিগ্রাম আয়রন সেবন প্রয়োজন, যা আমরা প্রচুর পরিমাণে পাই শুকনো সকল প্রকার বিন থেকে, বীজ, ডাল, ছোলা, লিভার, বাদাম, মোচা, খেজুর, কিশমিশ ইত্যাদি থেকে। এছাড়াও বিভিন্ন সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে ভিটামিন এবং মিনারেলস পাওয়া যায়।

Final advt

এবার আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটির কথায়, জল। শরীরের প্রতিটা সিস্টেম জলের উপর নির্ভরশীল। তাই শরীরে জলের ভারসাম্য বজায় রাখা ভীষণ জরুরি। প্রতিদিন কমপক্ষে ২.৫-৩ লিটার জল পান করা প্রয়োজন। সবশেষে বলা দরকার, সঠিক পুষ্টির পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন না হলে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া সম্ভব নয়।