বিস্মৃতির অন্তরালে শরীরম আদ্যম

আগামীকাল বিশ্ব যোগ দিবসবিশ্ব যোগ দিবসের প্রাক্কালে যোগ ব্যায়াম শিক্ষার বই এর লেখিকা তথা বাংলার মহিলা যোগব্যায়াম বিশারদ ব্যায়াম শিক্ষিকা লাবণ্য পালিত এবং যোগীরাজ ডাক্তার গৌরিশংকর মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে জানাচ্ছেন কিশলয় মুখোপাধ্যায়

১৯৫৫ সালে বাংলার মহিলা যোগব্যায়াম বিশারদ তথা ব্যায়াম শিক্ষিকা লাবণ্য পালিত যোগব্যায়াম শিক্ষার একটি বই লিখেছিলেন। বাংলা ভাষায় লেখা বইটির নাম শরীরম আদ্যম। বইটি এখন লুপ্তপ্রায়। তিনি যোগাচার্য বিষ্ণুচরণ ঘোষের কাছে যোগাসন শেখেন। বেথুন কলেজে পড়াশোনা করেছেন। যোগাসনের প্রামাণ্য বই ধরা হয় প্রখ্যাত ব্যায়ামাচার্য বি কে এস আয়েঙ্গার লিখিত লাইট অন যোগা বইটি। প্রকাশকাল ১৯৬৬। আর ১১ বছর আগেই বাংলার একজন মহিলা লিখেছিলেন যোগশিক্ষার বই। এখন অনেকেই জানেননা এই বইটির কথা। বিস্মৃতির আড়ালে রয়ে গেছে এই বই আর লাবণ্য পালিত। প্রায় ৪০টি চিত্র সহযোগে যোগাসন সম্পর্কে লেখা আছে এই বইতে। তখনকার দিনে মহিলাদের মধ্যে দারুন সাড়া পড়েছিল এই বই।

joga-1

সময়টা ১৯৫০সাল,  বাংলার এক যোগবিশারদ হৃষিকেশে স্বামী শিবানন্দজীর আশ্রমে যোগাসন দেখাচ্ছেন। একটার পর একটা আসন নিঁখুত ভঙ্গিমায় দেখালেন। স্বামী শিবানন্দজী মুগ্ধ হয়ে তাঁকে যোগীরাজ উপাধিতে সন্মানিত করলেন। ইনি হলেন বাংলার বিখ্যাত যোগবিশারদ ডাক্তার গৌরিশংকর মুখোপাধ্যায়। ঐ সময় তিনি শ্রীশ্রী কেদারনাথ ও শ্রীশ্রী বদ্রিনাথ ধামের মন্দির প্রাঙ্গনে যোগাসন দেখান। এছাড়া যুযুৎসু ও রাইফেল শুটিংএ ও সমান দক্ষ ছিলেন। ১৯৪৬ সালে অল বেঙ্গল বীরাষ্টমী টুর্নামেন্টে যুযুৎসুতে প্রথম স্থান লাভ করেন আর রাইফেল শুটিংএ তৎকালিন রাজ্যপাল হরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের কাছে রৌপ্য পদক পান। তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হল ১৯৬৩ সালে তিনি একটি বই লেখেন। তাতে ৮৪ টি আসনের বিশদ বিবরন রয়েছে। যোগাসনে চিকিৎসার সুবিধাটাও বর্ণনা করেন। তিনি পার্ক ইনিস্টিউট থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে আই এস সি পাস করে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়া শুরু করলেন তখন তাঁর ভগ্ন স্বাস্থ্য। ছোট বেলায় ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পরতেন। ক্লাস এইটে পড়ার সময় প্রায় আট মাস স্কুলে অনুপস্থিত থাকতে হয়েছিল এই দুর্বল স্বাস্থ্যের জন্য। ডাক্তারি পড়ার সময় হঠাৎ পরিচয় হল বিষ্ণুচরণ ঘোষের সঙ্গে। ডাক্তার গৌরিশংকর মুখোপাধ্যায়ের জীবনে এল নতুন বাঁক। আর এই বাঁকে পেলেন যোগাসনের পথ। শুরু হল যোগাসন চর্চা। ১৯৪৭ সালে মানিকতলা বারোযারি ক্লাবের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত শ্রেষ্ঠদেহী প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান লাভ করেন। এম.বি.বি.এস পাশ করে বিষ্ণু ঘোষের ব্যায়ামগারে চিকিৎসক রূপে রোগের ওপর যোগব্যায়ামের প্রভাব কীরকম পড়ে তার গবেষণা করেছিলেন। ঐ গবেষণার জন্য তৎকালীন বিশিষ্ট চিকিৎসক নলিনীরঞ্জন সেনগুপ্ত,  সুশীল বসু তাঁর ভূয়ষী প্রশংসা করেন। এরপর যোগব্যায়াম সম্পর্কে বক্তৃতা দেবার জন্য ফ্রান্স ও জার্মানি থেকেও আমন্ত্রণ পেলেন। ১৯৫৩ সালে ১৫ সেপ্টম্বর তিনি বিদেশ যাত্রা করলেন। ওখানে সাফল্য এল এবং জার্মানি থেকে এম.ডি. করলেন। যোগব্যায়াম আর যোগদর্শন এক রুগ্ন বালক ও ভগ্ন স্বাস্থ্য তরুনের জীবন পাল্টে দিয়েছিল। তিনি পরে বলেছিলেন, “আমার স্কুল জীবনে আমি বড় অসুস্থ ছিলাম। বারোমাস সর্দিজ্বর। সবচেয়ে মুস্কিল ছিল মাথাধরা। সন্ধেবেলা এসপ্ল্যানেডে বেড়াতে পারতুম না। ঐ সব আলো দেখলে মাথা ধরত। সার্কাস গেলেই আলোতে মাথা ধরত এবং পরদিন সকাল পর্যন্ত থাকত। অথচ এই যোগব্যায়াম প্রভৃতি করে ৭-৮ বছরের মধ্যে একদিনও মাথা ধরেনি। কথাটা ঠিক ট্রেনে তানসেন গুলি বিক্রী বিজ্ঞাপনের মতো শোনালো না?  কিন্তু সত্যি কথা”।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading