উত্তর সম্পাদকীয়

“পৃথিবীর ধুলো পথে জেগে থেকে শোনে /ঈশ্বরের চলে যাওয়া।”

pankaj-chhakkraborty-1

স্বরূপম চক্রবর্তী: কোনও কোনও সকাল আসে সকল কিছুকে পলকের মধ্যে ওলোটপালোট করে দিতে। আমাদের যাবতীয় ধ্যান-ধারণাকে নিমেষে ভ্রান্ত প্রমাণ করে দেয় নিয়তির অমোঘ বিধান। আসলে এই পৃথিবীতে সকল প্রাণীকুলের সকলেরই জন্য বিধাতা নির্দিষ্ট সময়কাল পূর্ব নির্ধারণ করে রেখেছেন। এই সময়কালেই আমরা যাঁরা প্রাণীকুলের জীবশ্রেষ্ঠ, আমাদের মধ্যে এমন কিছু মানুষের পদধূলিতে ধন্য হয় এই ধরণী, তাঁরা সকলেই আমাদের কাছে ঈশ্বরের বরপুত্র স্বরূপ।
মানব জীবন বড়োই ক্ষণস্থায়ী। খুবই অল্প পরিসরে এই অমূল্য জীবনে আমাদের মধ্যে ছাপ রেখে যান এমন কিছু মানুষ, যাঁরা সকল ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এমনই অনন্য গুণের অথচ একান্তই যিনি ছিলেন মাটির খুব কাছাকাছি, যাঁর লেখনীতে সহজেই পাওয়া যেত সোঁদা গন্ধের অপরূপ মেলবন্ধন, যাঁর লেখনী কথা বলতো প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে। যিনি আমাদের মধ্যে কাটিয়েছেন তাঁর জীবনের ৬৫টি বসন্ত, বর্তমান সময়ে যখন সকলেই ব্যস্ত আত্মপরিচয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে, সেই সময়ে এই মানুষটি কোনোদিনই আত্মগরিমায় গৌরবান্বিত না হয়ে সর্বদা সকলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মিশে যেতেন নির্ভাবনায়, সেই মানুষটিই ছিলেন কবি, লেখক, গদ্যকার তথা সাহিত্য জগৎ থেকে শুরু করে আপামরের কাছের পঙ্কজদা অর্থাত্‍ পঙ্কজ চক্রবর্তী।
সকল বাধা নিষেধের গন্ডি পেরিয়ে রামকৃষ্ণালোকে পাড়ি দিলেন এই মাটির মানুষটি, আর এই খবরটা আসার পর থেকেই আজ সকাল থেকেই আমার জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ঘটে গেল এক ছন্দপতন।
আসলে পঙ্কজদা অর্থাৎ কবি বা সাহিত্যিক যে বিশেষণই ওনার নামের পাশে বসাই না কেন সবই ফিকে হয়ে যায় ওনার সৃষ্টির পাশে, পঙ্কজদার সঙ্গে আমার কেন জানি না গড়ে উঠেছিল এক অসামান্য সখ্যতা। আজ মনে পড়ে সেই দিনগুলো, যখন বৈদ্যবাটির সাপ্তাহিক যোগাযোগ দপ্তরে প্রথম আলাপ পঙ্কজদার সঙ্গে। বহু দিন একত্রে
নানা আলোচনা, নানা অনুষ্ঠানে মিলিত হতে হতে কখন যে পঙ্কজদা বড়ই আপনার জন হয়ে উঠেছিল বুঝতেই পারি নি। আমার মায়ের শেষ সময়ে প্রায় রোজ এসে মাকে নিজের লেখা গল্প, কবিতা পড়ে শোনানো বা কী করে আমার অসুস্থ মা’কে সুস্থ করে তোলা যায় সেই বিষয়ে পঙ্কজ দার মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম এক অন্য মানুষকে। বলতো স্বরূপম তোমার মা কিন্তু আমারও মা। মা’র শ্রাদ্ধবাসরে এই মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে যে কটি লাইন পঙ্কজদা লিখেছিলেন আমার জীবনে তা অমূল্য হয়ে রয়ে গেছে। মনে পড়ে সাপ্তাহিক যোগাযোগের হয়ে কোন এক সময়ে এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাত্‍কার নিতে গিয়ে আমি ও পঙ্কজদা কিভাবে এক অনভিপ্রেত অপমানের সম্মুখীন হয়েছিলাম।
সংবাদ প্রতিখনের বিষয়ে নানা আলোচনা হয়েছে দাদার সঙ্গে। কোন এক সময়ে দাদার হাতে আমার মায়ের নামাঙ্কিত সম্মান তুলে দিয়ে নিজে ধন্য হয়েছিলাম।
ভাবনার সুতোগুলো কেমন যেন ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে এই মুহূর্তে। কলম আপনা থেকেই বিদ্রোহ করছে। আসলে পঙ্কজদা এমন একজন মানুষ ছিলেন যাঁকে নিয়ে লিখতে যাওয়া আমার মত ক্ষুদ্র এক কলমচির ধৃষ্টতা মাত্র।
ঠিক দশ বছর আগে এই মার্চের কোন এক সময়ে বিধাতা আমাদের থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন আমার খুব কাছের আরও এক মানুষ “তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়” ওরফে “রতন চাচা”কে।
আজকের পর থেকে সবই সমান তালে চলবে, কিন্তু প্রতি শনিবারের ঐতিহাসিক কফি হাউসের নির্দিষ্ট টেবিলটির নির্দিষ্ট চেয়ারে আসীন হবেন না পঙ্কজ চক্রবর্তী। আজকের পর থেকে আর কাকে নিজের মনের কথা খুলে বলবে কবি চন্দ্রশেখর ঘোষ! সবাই হতবাক, সাহিত্যের দুনিয়ায় অবাধ বিচরণকারী সাবলীল এই মানুষটির প্রয়াণে।
পঙ্কজদা’র কলমেই শেষ করবো আজ
“পৃথিবীর ধুলো পথে জেগে থেকে শোনে
ঈশ্বরের চলে যাওয়া।”
সকল সহিত্যানুরাগীর কাছে প্রকৃতই তুমি ছিলে সাহিত্যের ঈশ্বর। সাহিত্য থাকবে, পঙ্কজদাও থেকে যাবেন আমাদের সকলের অন্তরে চিরকাল।