ফিরে দেখা এক রাজার বাড়ি

rajaপারমিতা চক্রবর্তী ভট্টাচার্য্য:  ৮৫ এ  আর্মহার স্ট্রিট এর সেই প্রাচীন বাড়িটি যা একসময় সিমলা হাউস নামে পরিচিত ছিল, আদপে ছিল সেটি রামমোহন রায় এর পরিবারের বসত বাড়ি। পরবর্তীতে রামমোহন কলেজ দ্বারা সেটি অধিকৃত হয় এবং এর একটি অংশ পুনরুদ্ধার করে একটি অসামান্য প্রদর্শনীশালা ও লাইব্রেরি তৈরী করা হয়, যা আজ সাধারণের জন্য উন্মুক্ত। মহাত্মা গান্ধী মেট্রো স্টেশন এর কাছেই এই এক টুকরো গর্বের ইতিহাস মোড়া বাড়িটি হয়ত কলকাতার দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে সেভাবে উঠে আসে না কিন্তু শুধু ইতিহাসপিপাসু মানুষদের কাছেই নয় এটা তো আমাদের বাঙালি হিসেবে এক অত্যন্ত গর্বের জায়গা হতেই পারে। বাঙালিদের বর্বরচিত কুসংস্কার এর ঘেরাটোপ থেকে উদ্ধার করে যে মানুষটি তাদের নবজাগরণ এর আলোয় উদ্ভাসিত করে আধুনিক করলেন তাদের কাছে এই বাড়িটি তো নিছক এক ঠিকানা নয়, এ যেন এক যুগান্তরের সাক্ষী স্বরূপ বলা যায়। প্রাচীন এই লাইব্রেরি আর প্রদর্শনীশালা যেন  শতাব্দীকাল অতীতের একটুকরো জীবন্ত দলিল। কি নেই এখানে? রাজা রামমোহন রায়ের ব্যবহৃত বিশাল মাপের বার্মা কাঠের গোল টেবিল, তাঁর ব্যবহৃত বেশি কিছু জিনিস পত্র, তাঁর হাতে লেখা চিঠি যদিও আজ তা অনেকটাই বিবর্ন, এমনকি রাজা রামমোহন রায়ের পৈতে ও একগুচ্ছ মাথার চুলও। রয়েছে অনেক পুরোনো নথিও। মৃত্যুর সময়ে ইংল্যান্ড এর ব্রিসলসের সেসময়ের সাক্ষী বা উইটনেসদের স্বাক্ষর সম্বলিত নথিও রাখার আছে এখানে। কিন্তু এসব ছাড়াও এখানে এমন একটি জিনিস আছে যেটি একেবারে অন্যরকম। আসলে অন্য কোনো ব্যক্তি কেন্দ্রিক সংগ্রহশালায় এরকম ক্ষেত্রে এই জিনিসটির হয়ত ঠায় মিলবেনা, তাই এটি একটু আলাদা ভাবে উল্লেখ্য। এটি হলো রাজা রামমোহন রায়ের ডেথ মাস্ক। ব্যাপারটা একটু খুলে বলা যাক। ১৮৩০ সালে ইংল্যান্ডে পাড়ি দিয়েছেন রাজা রামমোহন রায়। ইংল্যান্ডের ব্রিসলসে হঠাৎই ১৮৩৩ এর ২৭ সেপ্টেম্বর মেনিনজাইটাইসে ভুগে মৃত্যু হলো তাঁর। সেখানেই তিনি সমাধিস্ত হলেন।

ব্রিসলসের মানুষ কিন্তু যথাযথ মর্যাদা দিয়েছিলো রাজাকে তাঁর অন্তিম দিনে কারণ রাজা ও তাঁর কর্মকান্ড নিয়ে অবগত ছিল সেদেশের মানুষও তাই রামমোহন আজও সেখানে এক সম্মানিত জন। মাটির নিচে শায়িত রাজার শয্যার ওপর একটু মন্দির আকৃতির গোম্বুজও তৈরী করে দিয়েছেন তাঁরা। আর তার সাথে এই বিদেশ বিভুঁয়ে দেহ রাখা এই মহান মানুষটির দেশের লোকের কথা কি খুব গভীর ভাবে ভাবিয়েছিল সেসময় ব্রিসলসের লোকদের?  তাঁরা হয়ত একবারের জন্যও ভেবেছিলেন যে আর চাইলেও তার আপনজনেরা আর ফিরে পাবেন না রামমোহন রায়কে, বা তাঁর দেশের গুনমুগ্ধরা চিরবঞ্চিত থেকে যাবেন তাঁদের হয়ে এই বিশাল লড়াই করে নতুন যুগ এনে দেওয়া রাজদর্শনে । নিশ্চয় ভেবেছিলেন, নইলে মৃত্যুর পর তাঁর ডেথ মাস্ক বানাবেন কেন তাঁরা?  আজ্ঞে হ্যাঁ, চির নিদ্রায় শায়িত রাজার মুখের অবিকল ছাপ তুলে রাখার এই কাজটি চলল ওনার ডাক্তারেরই (ডাঃ এস্টলিন) উদ্যোগে ও তত্ত্ববধানে।

  advt112-for-advt-sankha-sen

আরো পরে ব্রিসলসে 1939 সালে তার একটি প্রতিলিপি তৈরী করে সেটি এদেশে আনা হয় আর বর্তমানে সেটি রয়েছে এই রামমোহন সংগ্রহশালায়। মৃত্যুর পরের মুখাবয়ব তুলে রাখার শিল্পভাবনা তো আমরা আর কোনো এদেশের গুণী জনের জন্য করিনি, সেদিক থেকে যেন ব্যাপারটা বেশ অন্যরকম অনুভূতি জাগায়। আর ব্রিসলসের মানুষের সেই মুহূর্তের এই দুরন্ত ভাবনা কে স্যালুট জানিয়ে মৃত্যুর পরের এক অদ্ভুত প্রশান্তি মাখা মুখের প্রতিকৃতিতে আজও যেন জীবন্ত রাজা তাঁর পারিবারিক ভবনে রয়ে গেলেন একটা জাতির নবজাগরণ এর ইতিহাস বুকে নিয়ে। আজ তাই বাংলার নবজাগরণ এই পথিক রাজা রামমোহন রায়ের জন্ম বার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করে দেখার ইচ্ছে রয়ে যায় তার এই বাসভবনের সংগ্রহশালাটি কারণ আজও ফিরে তাকাতে ইচ্ছে হয় আমাদের ফেলে আসা অতীতের দিকে, আজও জানতে ইচ্ছে হয় কিভাবে সেই রাজা তাঁর নিজের ঘরের লোকদের এতো বাধা কাটিয়ে তাঁদেরই এক কালিমাখা সংস্কার থেকে রক্ষা করার যজ্ঞে নেমেছিলেন অনেক প্রতিকূলতাকে জয় করে।

output_XelYeX

তথ্য: রাজা রামমোহন রায় মেমোরিয়াল মিউজিয়াম বা প্রদর্শনীশালাটি ও সন্নিহিত লাইব্রেরিটি সাধারণের জন্য প্রতিদিন খোলা সকাল ১১ টা থেকে বিকেল ৪ টা । (সোমবার এটি পুরোপুরি বন্ধ থাকে)

(রামমোহন রায় মেমোরিয়াল মিউজিয়াম এর ভেতরের ছবি গুলি চিত্রগ্রাহক কৌশিক গোস্বামী মহাশয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে নেওয়া)

149560606_1955498754590550_7537541499495602122_o149274739_1955175504622875_8761804105952090197_oadvt-1advt-3advt-4advt-5gnc-advt-6x4-for-web

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading