বিবিধ

কোটিবর্ষ

ezgif-3-19c43dfabd55ক্যাপটেন নীলাঞ্জন দাস(অবসরপ্রাপ্ত) : কোটিবর্ষ, অর্থাত্‍ কোটি কোটি বছরের কথা বলতে এই অবতারনা নয়। আজ আপনাদের জানাবো কয়েক হাজার বছরের পুরোনো একটি নগরীর কথা। যে নগরী প্রসিদ্ধ ছিল মৌর্য আমলে।পুরাণেও উল্লেখ রয়েছে এই নগরীর, বায়ুপুরাণ ও বৃহত্‍সংহিতায় বর্ণনা আছে এই নগরীর। সন্ধ্যাকর নন্দী এই শহরের মন্দির ও হ্রদগুলির বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর রামচরিত মানসেও। একটু পিছনে ফিরে তাকালে আমরা জানতে পারি আমাদের প্রাচীন দুই মহাকাব্যর অন্যতম মহাভারত থেকে যে দুটি বিশেষ নগরীর নাম তারা হল যথাক্রমে গৌড়পুর ও কোটিবর্ষ। চৈনিক পরিব্রাজকদ্বয় হিউয়েন সাং ও ফা- হিয়েন তাদের রচনায় বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছে যে নগরীকে সেটি হল এই “কোটিবর্ষ” বা “বানগড়” নামে যা সমধিক পরিচিত। ইতিহাস অনুযায়ী এই রাজ্য শাসন করতেন বলি রাজা। সেই সময়ে এই নগরী ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শিল্পে প্রভূত ঐতিহ্যশালী।  অতীতের ‘কোটিবর্ষ’ ‘বানগড়’ হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে ছোট্ট একটি ইতিহাস। রাজা বলির মৃত্যর পর তাঁর পুত্র বান এই নগরীর ভার গ্রহণ করেন।এবং সেই থেকেই রাজ্যের নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় বানরাজ্য এবং নগরীর নাম হয় বাননগর। কথিত আছে দ্বারকা রাজ শ্রীকৃষ্ণের নাতি অনিরুদ্ধ শ্রীকৃষ্ণের দূত হিসাবে একবার এসেছিলেন এই বানরাজ্যে। বান রাজকুমারী উষা ও অনিরুদ্ধ দুজনে প্রেমে বিগলিত হয়ে সকলের অলখ্যে গোপনে বিবাহ করেন এবং তারা বান রাজ্য থেকে পালিয়ে অন্যত্র চলে যান। অপরদিকে বানরাজা অনিরুদ্ধ ও উষার বিবাহ ও পলায়নের খবর পেয়ে সৈন্য পাঠিয়ে তাদের ধরে এনে অনিরুদ্ধকে বন্দী করেন ও কারাগারে প্রেরণ করেন। অন্যদিকে অনিরুদ্ধর দাদু তার নাতির এই খবরে বিশাল সৈন্য-সামন্ত নিয়ে নাতিকে উদ্ধার করতে বানরাজ্যে উপস্থিত হন। প্রবল লড়াই বাঁধে দুই পক্ষে, যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ জয়ী হন এবং তিনি তাঁর নাতি ও নাতবৌ কে নিয়ে দ্বারকায় প্রত্যাবর্তন করেন। দ্বারকা ফিরে যাবার কালে যুদ্ধে নিহত বানরাজ্যের সৈন্যদের কব্জি কেটে সেই কর দাহ করেন একটি স্থানে, যা বর্তমানে “করদহ” নামে প্রসিদ্ধ।

বাংলার পাল রাজাদের আমলে ৩য় পাল রাজা দেবপালের নামানুসারে বানগড় পরিচিতি পায় দেবকোট নামে। পাল ও সেন আমলে সদাই চর্চিত হয়েছে দেবকোট বা দেবিকোট। এই স্থানে পাল ও সেন রাজাদের আমলে স্থাপন করা হয়েছিল পরিখা ও উচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত দুর্ভেদ্য দুর্গ। দুর্গ প্রসাদ ছাড়াও ছিল বহু হিন্দু মন্দির, বৌদ্ধ বিহার, বাগিচা, সরাইখানা, পরিকল্পিত জলাধার প্রভৃতি।আপনারা হয়ত ভাবছেন কোথায় ভ্রমণের জন্য একটা ভাল জায়গার হদিস দেব তা না দিয়ে কি সব ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করছি। একটা কথা জানেন নিশ্চয়, কোনও জায়গাকে জানতে হলে তার প্রচীন ইতিহাস জানাটাও বিশেষ দরকারী। না হলে সেই স্থানটি দেখা অপূর্ণ থেকে যায়। ভাবছেন তো জায়গাটা কোথায়? পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুরেই রয়েছে এমন একটি ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান।বালুরঘাট স্টেশন থেকে গাড়িতে তপন-বালুরঘাট বাইপাস ধরে ৩৮ কিমি ১ ঘণ্টা ১০ মিনিটের দূরত্বে। অপরদিকে গঙ্গারামপুর স্টেশন থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার পথ পেরোলেই হাজির হবেন ইতিহাসের সাক্ষী হতে। এই বানগড় এখন শুধুই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। স্বাধীনতার আগে ১৯৩৮ থেকে ১৯৪১ সাল অবধি এই স্থানের খননকাজ চলেছিল অধ্যাপক কুঞ্জ বিহারী গোস্বামীর নেতৃত্বে। জায়গাটি লম্বায় ও চওড়ায় যথাক্রমে ৬০০ মিটার ও ৫০০ মিটার ছিল।

কিভাবে যাবেন : কলকাতা থেকে সরাসরি ট্রেন পথে প্রায় ১২ ঘন্টার জার্নি করে বালুরঘাট পৌঁছে সেখান থেকে পৌঁছতে পারেন বানগড়ে। মজার কথা কলকাতা থেকে সরাসরি সড়ক পথে এখানে পৌঁছতে সময় লাগে ১০ ঘণ্টা।

কি দেখবেন এখানে?:  পুনর্ভবা নদীর পাড়ে অবস্থিত পাল ও সেন যুগের সেই সময়ের ইতিহাস এখনোও জানান দিচ্ছে কত উন্নত ছিল আমাদের প্রাচীন সভ্যতা। বানগড়ে খনন কার্যের ফলে প্রাপ্ত জিনিসপত্র দেখতে গেলে অবশ্য আপনাদের যেতে হবে বালুরঘাট কলেজ মিউজিয়ামে। আর যে পথ ধরে অনিরুদ্ধ উষাকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন তার নাম উষাহরণ সড়ক যা বর্তমানে উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জে অবস্থিত। আর তপন থানার কাছেই রয়েছে করদহ নামক স্থানটি। কাজেই উত্তরবঙ্গ ভ্রমণে ইতিহাসের সাক্ষী হতে হলে একবার না একবার আসতেই হবে এখানে।

বিভাগ:বিবিধ, ভ্রমণ