ভ্রমণের দুনিয়া

রেশম পথে আমরা

sr

লেখক পরিচিতি: কল্যানী-নদীয়া নিবাসী সখের ছোট গল্প, ভ্রমন কাহিনী লেখক। তাঁর সাম্প্রতিক সংক্ষিপ্ত পুর্ব সিকিম ভ্রমনের অভিজ্ঞতার নিরিখে ভ্রমন পিপাষু বাঙালীদের প্রতি তাঁর এই নিবেদন।

সম্মোহন রায়: এই ২০১৮ সালে জুলাই মাসে আমার ভগ্নীপতির বাৎসরিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে আমার ভাইঝি জামাই অমিতাভ আমার কাছে  বারো-তেরো জন ব্যক্তি সমন্বিত সাত দিনের দলবদ্ধ পুর্ব সিকিম ভ্রমনের প্রস্তাব রাখে। আমার পরিবারের সকলের ভ্রমনের ব্যপারে দুর্বলতা হেতু এই প্রস্তাব লুফে নিতে চিন্তা ভাবনার অবকাশ ছিল না। সামনের সেপ্টেম্বর  মাসেই  এই ভ্রমনের বিষয় টা ঠিক হলো কারন এই সময়ে বর্ষাস্নাত সিকিম তার অপরূপ সৌন্দর্য্যের ডালি নিয়ে প্রকৃতি প্রেমিক পর্যটকদের কাছে ধরা দেয়। শীতের সময়ে যে সব এলাকা বরফে ঢাকা থাকে, এই সময়ে সেখানে দেখা যায় বিভিন্ন নাম না জানা অদেখা বন্য ফুল আর অর্কিডের শোভা।

ট্রেনের টিকিট প্রাপ্তির ভিত্তিতে যাত্রা শুরু ১০ই সেপ্টেম্বর’২০১৮ আর যাত্রার সমাপ্তির শেষে গৃহে প্রত্যাগমন ১৬ই সেপ্টেম্বর’২০১৮। যাওয়ার টিকিট শিয়ালদা থেকে কাঞ্চনকন্যায় আর ফেরার টিকিট ১৫ই সেপ্টেম্বর’২০১৮ নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং মেলে। সব টিকিটই স্লিপার ক্লাসের পাওয়া যায়। নেট ঘেঁটে ছেলে মেয়েরা পুর্ব সিকিমের পর্যটন স্থানের আবহাওয়ার যে তথ্য আহরন করেছিল তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় শীতের পোষাক নেওয়া হলো। যাত্রার দিনটায় ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ডাকা অর্ধ দিবসের ‘ভারত-বন্ধ্’। ট্রেন ছাড়ার সময় সন্ধ্যা সাড়ে আটটায় থাকাতে সপরিবারে কল্যানীর বাড়ী থেকে  বিকালে বেরিয়ে এবং কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় বন্ধ্-এর প্রভাব না থাকাতে গাড়ীতে শিয়ালদা ষ্টেশনে সময় মতো পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়নি বরং রাস্তা ঘাটে গাড়ী-ঘোড়া, লোকজন কম থাকাতে সুবিধাই হয়েছিল।  রাজাবাজার অতিক্রম করার সময় অমিতাভের ফোনে জানতে পারলাম ওরা ৯-বি প্ল্যাটফর্মের বাইরে অপেক্ষা করছে, এবং সেখানে গিয়ে সকলের সাথে একত্রিত হলাম। এখানে বলে রাখা ভাল এই যে আমাদের এই দলে মোট সদস্য সংখ্যা তেরো জন। আমি ছাড়া আমার স্ত্রী সীমা, মেয়ে ঋতব্রতা ও ছেলে সৌম্যদ্যুতি, ভাইঝি মৌমিতা, জামাই অমিতাভ এবং ওদের মেয়ে মনস্বিতা ও ছেলে কোরক আর ওদের সঙ্গে ছিল ভাইঝির বান্ধবী ছন্দা, এ ছাড়া ছিলো আমাদের স্বামী-স্ত্রী-র বয়সী প্রবীন ঘোষ দম্পতি স্বপন ও মীনাক্ষী। আর ছিলো এই দলবদ্ধ পুর্ব সিকিম ভ্রমনের সংগঠক রিষড়া নিবাসী স্বরূপম ও তার স্ত্রী দিপান্বীতা। আমাদের ট্রেন নির্দিষ্ট সময়েই শিয়ালদা ষ্টেশন ছেড়ে চলতে শুরু করল। ট্রেনে গল্প গুজব করে সময় কাটতে লাগল। তারপর  বাড়ী  থেকে নিয়ে যাওয়া ডালপুরী, আলুর দম, আলুভাজা ও মিষ্টি সহযোগে রাতের খাবার সাঙ্গ করে যে যার বার্থে শুয়ে পড়লাম। পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙ্গল, ঘড়িতে সময় দেখলাম সওয়া ছটা। ট্রেন থেমে আছে ডালখোলা ষ্টেশনে, মোবাইলে টাইম টেবলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলাম আমাদের ট্রেন প্রায় এক ঘন্টা দেরীতে চলছে। অবশেষে পাক্কা এক ঘন্টা দেরীতে সকাল সাড়ে আটটায় নিউ জলপাইগুড়ি ষ্টেশনে এসে পৌঁছলাম । মালপত্র নিয়ে ওভার ব্রীজ অতিক্রম করে ষ্টেশনের বাইরে এসে আমাদের দলের জন্য নির্দিষ্ট দুটো বোলেরো গাড়ীতে এসে সকলে বসলাম, গাড়ী চলতে শুরু করে ষ্টেশনের সংলগ্ন অল্পকিছু দূরে একটি রেষ্টুরেন্টের সামনে এসে থামল, উদ্দেশ্য রওনা দেওয়ার আগে প্রাতঃরাশ সেরে নেওয়া। আমাদের প্রথম গন্তব্য স্থল পুর্ব সিকিম জেলার অন্তর্গত রংলি মহকুমার ‘আরিটার’ নামে একটি জায়গায়। এই জায়গার উচ্চতা সমুদ্র তল থেকে ৪,৯০০ ফুট। রাস্তা কম বেশি সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘন্টার। সেখানেই  দলপচাঁদে ‘বখিম ভিলেজ রিসর্টে’ রাত্রিবাস এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা। প্রাতঃরাশের পর গাড়ী ছাড়ল সকাল দশটায়। প্রথমে সেবক ও তারপর মহানন্দার জনপদ ছাড়িয়ে আমাদের গাড়ী রাস্তার বাম দিকে খাড়া পাহাড় আর ডান দিকে খাদ ও তার পাশে তিস্তা নদীকে রেখে ছুটে চলেছে। এই ভাবে চলতে চলতে এক সময় রাস্তা দুই ভাগে ভাগ হয়ে ডান দিকের রাস্তা চলে গেল কালিম্পং আর বাম দিকের রাস্তা অল্প কিছুটা গিয়ে তিস্তার ওপর আড়াআড়ি একটা সিমেন্ট কংক্রিটের ব্রীজ অতিক্রম করে রংপো চেক পোষ্টে পৌঁছাল। সেখানে কলকাতার পর্যটক শুনে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ না করে ছেড়ে দিল। আমাদের গাড়ী এবার রংপো বাজার ছাড়িয়ে ডান দিকের রাস্তা ধরলো, এই রাস্তা সরাসরি ‘আরিটার’ গিয়েছে আর বাম দিকের রাস্তা গিয়েছে গ্যাংটক। আমাদের গাড়ী চলেছে পাহাড়ের গায়ে গায়ে পাথর কেটে তৈরী করা পিচ বাঁধানো রাস্তা ধরে, কোথায়ও আবার রাস্তা এবড়ো খেবড়ো। দেখে বোঝা গেল কিছুদিন আগে ধ্বস নামা রাস্তা গাড়ী যাতে চলতে পারে সেই মতো তৈরী করা। রাস্তায় কখনো ডান দিকে পাহাড় আর বাম দিকে খাদ আবার কখনো ডান দিকে খাদ আর বামে পাহাড়। যত উপরের  দিকে উঠছি তত দেখছি প্রকৃতির শোভা ক্ষনে ক্ষনে পাল্টিয়ে যাচ্ছে। বর্ষা শেষের সিকিম, বৃষ্টি স্নাত সিকিমের অপুর্ব শোভা দু-চোখ ভরে উপভোগ করতে করতে চলছি। যত্র তত্র ছোট বড় ঝর্না পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে। রাস্তায় কখনো মেঘের মধ্যে দিয়ে চলেছি, কখনো বা ঝলমলে কাঁচা সোনার রোদ, আবার কখনো মেঘের জন্য আলো এত কমে আসছে যে মনে হচ্ছে পাহাড়ের কোলে সন্ধ্যা নেমে এলো। রাস্তায় দুটো বড় ঝর্না পেলাম, একটার নাম কালী খোলা আর অন্যটার নাম রাতায় খোলা। এখানে স্থানীয় ভাষায় ‘খোলা’ মানে নদী, এই ঝর্না নীচে নেমে নদী হয়ে বয়ে চলে। পথে রাস্তার ধারে বাম পাশে খাদের দিকে রাস্তা থেকে একটু নীচে দেখলাম রয়েছে ‘হেলিপ্যাড’, খুব দক্ষ পাইলট ছাড়া এখানে হেলিকপ্টার নামানো বেশ কঠিন বলেই মনে হলো। অবশেষে দলপচাঁদে ‘বখিম ভিলেজ রিসর্টে’এসে পৌঁছলাম। তখন ঘড়িতে দুপুর ঠিক তিনটে। রিসর্টের মালিক ও তাঁর স্ত্রী আমাদের সকলকে ‘খাদা’ পরিয়ে স্বাগত জানালেন। ‘খাদা’ হচ্ছে এক ধরনের উত্তরীয় গলায় পরানো হয়, এটা সিকিমের মানুষদের সামাজিক প্রথা অতিথিদের স্বাগত জানানোর জন্য। আমরা সকলে যে যার নির্দিষ্ট ঘরে ঢুকে পড়লাম। গতকাল দুপুরে স্নানের পর প্রায় বিকেল পর্য্যন্ত স্নান না হওয়ায় শরীর গরম হয়ে থাকাতে ঠান্ডা জলেই স্নান সেরে নীচে ডাইনিং-এ খেতে নামলাম। খাওয়ার পর ঘন্টা খানেক ঘুমিয়ে নেওয়ার ফলে শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছিলো। সন্ধ্যায় পকোড়া সহযোগে চা খেতে খেতে জমিয়ে আড্ডা চলতে লাগল।

 পরের দিন ১২ই  সেপ্টেম্বর’ ২০১৮  প্রাতঃরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম স্থানীয় দ্রষ্টব্য বিষয় গুলি দেখার জন্য। প্রথমে গেলাম পাহাড়ের কোলে প্রশস্ত জায়গায় স্থাপিত অতীব দৃষ্টি নন্দন ‘বিশ্ব বিনায়ক’ মন্দির, এই মন্দিরের বাম পাশে প্রশস্ত নাট মন্দির চত্বর, এখানে গণেশ চতুর্দশী উপলক্ষে উৎসব চলছে। এই মন্দিরের ডান পাশে হনুমান মন্দির। আর  সামনে  রয়েছে ‘সমুদ্র মন্থনে’র ভাস্কর্য্য।  এই মন্দিরের স্থানীয় এক ভক্ত এগিয়ে এসে আমার সঙ্গে আলাপ করলেন। তাঁর থেকে জানা গেল এই মন্দির দুই বছর আগে স্থাপিত হয়েছে, এই মন্দিরে মোট পঞ্চান্নটা গনপতির মুর্তি আছে। এই মন্দির চত্বরের প্রাকৃতিক শোভা এতই মনোরম যে আমরা সকলে কিছুটা সময় এখানে কাটালাম। এবার আমরা গেলাম ‘মানখিম ভিউ পয়েন্ট’, রাস্তা থেকে একশ পঁয়ষট্টি টি সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে এই ভিঊ পয়েন্ট। এখান থেকে ‘মানুষের পায়ের পাতার আকৃতির আরিটার লেক’ দেখা যায়। আমাদের দুর্ভাগ্য ঘন মেঘের কল্যাণে কিছুই দেখতে পেলাম না। এখানে একটা মন্দির রয়েছে, যেখানে দেবতার মুর্তির বদলে বেদিতে রয়েছে ফুল, পাতা। ভিঊ পয়েন্ট থেকে নেমে এসে আমরা ‘আরিটার মনাস্ট্রি’ হয়ে গেলাম ‘আরিটার লেক’-এ। এখানে প্রবেশ মুল্য মাথা পিছু দশ টাকা। চতুর্দিক ঘেরা পাহাড়ের কোলে বিরাট এক প্রাকৃতিক লেক। বর্তমানে রেলিং ঘেরা এবং বাঁধানো। এই লেক ঘিরে পায়ে চলার উপযোগী রাস্তা দিয়ে সকলে এক চক্কর পাক মারলাম। তারপর ফিরলাম আমাদের রিসর্টে। সেই দিনের মতো বেড়ানোর ইতি। তারপর খাওয়া দাওয়া আর বিশ্রাম।

পরের দিন ১৩ই সেপ্টেম্বর’ ২০১৮, আমরা সকাল সকাল প্রাতঃরাশ সেরে যাত্রা করলাম। আমাদের গাড়ী যথারীতি পাহাড়ি রাস্তা ধরে এঁকে বেঁকে চলতে থাকল, আজকের ভ্রমন প্রায় আট-নয় ঘণ্টার, সেই জন্য প্রাতঃরাশ করা হল একটু ভারী ধরনের। চলতে চলতে দেখলাম ডান দিকে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে ‘রঙ্গলি খোলা’ ঝর্না আর এই ঝর্না থেকে নদী হয়ে রাস্তার বাম দিক ধরে আমাদের সাথে সাথে চলতে লাগল। তারপর আমরা এসে পৌঁছলাম মহকুমা শহর ‘রঙ্গলি’, এটা পাহাড়ের কোলে একটা ছোট জনপদ। এখানে দোকান, বাজার, থানা ইত্যাদি সরকারী দপ্তর রয়েছে। এই ‘রংলি থানা’ থেকে জুলুক যাওয়ার জন্য গতকালই পারমিট সংগ্রহ নিয়ে গিয়েছে স্বরূপম আর দীপান্বিতা, এর জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে গতকালই পাসপোর্ট সাইজ ফটোগ্রাফ আর ভোটার কার্ডের জেরক্স নিয়েছিল। এখানেই আমাদের সঙ্গীদের দুই এক জন দোকান থেকে প্রয়োজনীয় টুকটাক জিনিষ সংগ্রহ করলেন। তারপর আবার চলতে থাকলাম, ক্রমশঃ উপরের দিকে উঠছি। প্রথমে লিংথাম চেকপোস্টে পারমিট জমা দেওয়া হলো। চলতে চলতে চোখে পড়ল রাস্তার ডান দিক দিয়ে ‘কিউ খোলা’ নদী বয়ে চলেছে, আর কিছুটা গিয়ে বামে দেখলাম বেশ বড় আকারের ‘কিউ খোলা’ ঝর্না। এর কিছুটা জল রাস্তার ওপর দিয়ে ডান দিকে নেমে যাচ্ছে আর বাকী জল পুলের নীচ দিয়ে বয়ে গিয়ে এখান থেকেই  ‘কিউ খোলা’ নদী হয়ে নীচের দিকে নেমে গিয়েছে। আমরা এখানে নেমে ঝর্নার দৃশ্য উপভোগ করলাম, বর্ষা কালের এই উচ্ছল জল ধারার দৃশ্য নিজ চোখে না দেখলে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আবারও চলা শুরু, এসে থামলাম ‘নিমাচিন’ চেক পোস্টে, জমা দেওয়া হলো মাথা পিছু পঞ্চান্ন টাকা করে। তারপর কিছু রাস্তা যাওয়ার পর গাড়ী এসে থামল ‘পেদামচেন’ চেক পোস্টের সামনে, এখানে পারমিট দেখিয়ে গাড়ী চলতে থাকল। এর পর থেকে মোটামুটি ভ্যালি শুরু হয়ে গেল, চারিদিকের দৃশ্যপট পাল্টিয়ে গেল, আমরা এসে থামলাম ‘থামবি’ ভিঊ’ পয়েন্টে, একটা সাইন বোর্ডে এখানকার উচ্চতা লেখা রয়েছে ১১,২০০ ফুট। এর পর পেরিয়ে এলাম ‘নাথান ভ্যালি’, রাস্তার দুই ধারে দেখতে দেখতে এলাম পাথরের বুকে ফুটে  থাকা বিভিন্ন রঙের ফুল, অর্কিড। এখানে ইতস্ততঃ চরে বেড়াচ্ছে চমরি গাই ।

 আমাদের গাড়ী যখন ‘বাবা মন্দিরে’র সামনে পৌঁছাল তখন সেখানে বৃষ্টি হচ্ছে, আমরা সেখানে না থেমে এগিয়ে গেলাম পরবর্তী ও আমাদের এই ভ্রমনের শেষ দ্রষ্টব্য স্থান ‘টুংলা ভ্যালি’, এখানে কুপুপে দেখলাম ‘এলিফ্যান্ট লেক’। লেক টা দেখতে হাতির শুঁড়ের মতো তাই এই নামকরন করা হয়েছে। ঝির ঝিরে বৃষ্টির মধ্যে গাড়ী থেকে নেমে চারিদিক দেখতে দেখতে হঠাৎ জোরে বৃষ্টি আসাতে আর দেরী না করে গাড়ী ঘুরিয়ে নিয়ে ফিরে আসতে থাকলাম। গাড়ী এসে থামল ‘বাবা হরভজন সিং’ মন্দিরের সামনে। বৃষ্টির মধ্যে আমাদের দলের সকলে এক প্রকার দৌড়ে গিয়ে সেখানকার সেনাবাহিনীর কাফেতে ঢুকে পড়ল। তখন দুপুর দুটো কি আড়াইটে, সেই সকালে প্রাতঃরাশের পর পেটে আর কিছু পড়েনি অবশ্য সে সুযোগও ছিল না। খাবার টেবিলে বসে ‘ব্রেড পকোড়া’র অর্ডার করা হলো, খাবার তৈরী হতে কিছু সময় তো লাগবেই, আমি সেই সুযোগে বৃষ্টির মধ্যে ‘বাবা হরভজন সিং’ মন্দিরের সামনে এলাম। সিঁড়ির পাশে একটা ঘর, সেখানে বোর্ডে লেখা নির্দেশ মতো আমার নিজের জুতো খুলে সেখানে সাজিয়ে রাখা অনেক গুলো পলিথিনের চপ্পলের মধ্যে থেকে একটা বেছে নিয়ে পায়ে পরে সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরে অর্থাৎ ‘বাবা হরভজন সিং’-এর বাঙ্কারে ঢুকলাম, সেখানে রক্ষিত মুর্তিকে প্রনাম করে সেখানকার ছোট ছোট ঘর গুলো দেখলাম। একটা ঘরে খাটের ওপর পরিস্কার করে বিছানা পাতা, সেখানে কম্বল বালিশ গুছিয়ে রাখা, পাশের ঘরে তাকে বই পত্র সাজিয়ে রাখা রয়েছে। মন্দিরের বাইরে এক জওয়ান, সেখানে রাখা এক পাত্র থেকে প্রথমে লাল টিপ পরিয়ে দিয়ে হাতে প্রসাদ হিসাবে ‘কিসমিস’ দিলেন। সেখানে পাথরের ওপর লেখা এবং স্বরূপম আর অমিতাভর থেকে এবং এক জওয়ানের কাছ থেকে যে কাহিনী শুনলাম তার সংক্ষিপ্ত বিবরন তুলে ধরলাম-“ক্যাপ্টেন ‘বাবা হরভজন সিং’-এর জন্ম পাঞ্জাব প্রদেশের ভাটিন্ডা (কেহ বলেন তরন তারন) জেলায়। মৃত্যু কালে (৪ঠা অক্টোবর’১৯৬৮) তাঁর বয়স ছিল মাত্র বাইশ বছর। সেই সময় তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ান হিসাবে নাথুলা পাস ও সাইনো ইন্ডিয়া বর্ডার অঞ্চলে (জায়গাটা ছিল সিকিম এবং চিন অধিকৃত তিব্বত সীমানায়) কর্তব্যরত ছিলেন। এক দিন ঘোড়ায় চড়ে সেনাবাহিনীর রসদ ভর্তি গাড়ীর কনভয়কে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাবার সময় রাস্তা ধ্বসে গিয়ে ঘোড়া সমেত চাপা পড়েন, সেই সময় অনেক খুঁজেও দেহ পাওয়া যায়নি। (কেহ বলেন সীমান্ত রক্ষা করতে গিয়ে চিনা সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই-এ শহীদ হন) কিছু দিন পরে এক ভারতীয় জওয়ান স্বপ্নে ক্যাপ্টেন হরভজন সিং-এর কাছ থেকে জানতে পারেন কোথায় দেহ চাপা পড়ে আছে। প্রথমে এই ব্যাপারটা কোনো গুরুত্ব পায় না, পরে এক চিনা জওয়ানের স্বপ্নে একই নির্দেশ পাওয়ার কথা শুনে উক্ত জায়গায় তল্লাশী করে ঘোড়া সমেত ক্যাপ্টেন হরভজন সিং-এর প্রান হীন দেহ উদ্ধার হয়। এখনো চিনা সেনাদের কেউ কেঊ সীমান্তে ঘোড়ায় চড়ে এক ছায়া মুর্তিকে টহল দিতে দেখেছে বলে শুনতে পাওয়া যায়। সীমান্তে কোনো গোলোযোগ দেখা গেলে কোনো না কোন জওয়ানের স্বপ্নের মাধ্যমে সেই খবর ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পৌঁছে যায়। সেনাবাহিনীর জওয়ানরা ক্যাপ্টেন হরভজন সিং–এর আত্মাকে পবিত্র বলে মেনে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করে, এবং  সেই সঙ্গে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে নিয়মিত পূজা করে। তারা বিশ্বাস করে যে এখানে প্রনাম করে গেলে কোনো বিপদ আপদের ভয় থাকে না। এই ‘বাবা মন্দিরে’ প্রতিদিন সকালে বিছানা পরিপাটি করে পেতে কম্বল, বালিশ ইত্যাদি ভাঁজ করে রাখা হয় আর পরের দিন সকালে দেখা যায় সমস্ত বিছানা অগোছালো, মনে হয় এখানে কেউ রাত্রে শুয়েছিল। এখনো নাকি ক্যাপ্টেন হরভজন সিং-এর বাড়ীতে মাইনে নিয়মিত পৌঁছে যায়, তাঁর প্রমোশন হয়, ছুটি অনুমোদন হয়, বাড়ী যাবার জন্য ট্রেনের বার্থ সংরক্ষিত করা থাকে”।

এবার ফেরার পালা, পাকদন্ডী পথ ধরে যখন আমাদের গাড়ী নামছে তখন উপর থেকে ‘জুলুক’-এ সেনাবাহিনীর ব্যারাক, সাধারন মানুষদের বাড়ী ঘর দেখতে বেশ ভালো লাগছিল। আমরা এখানেই ‘মুখিয়া হোম ষ্টে’-তে রাত্রি বাস করে পরের দিন ১৪ই সেপ্টেম্বর’২০১৮ তারিখে সকাল সাড়ে নটা নাগাদ জুলুক ত্যাগ করে ‘আরিটারে’র উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। রিসর্টে ফিরে স্নান ও দুপুরের খাওয়া সেরে বিশ্রামের পর ছোট্ট একটা সিল্ক রুটে ট্রেকিং–এর ব্যবস্থা ছিল কিন্তু বৃষ্টির জন্য সেই পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয়। সেই দিন সন্ধ্যের পর স্বরূপম এসে জানালো আগামী কাল অর্থাৎ ১৫ই সেপ্টেম্বর’২০১৮ তারিখে দুপুর বারোটার পরিবর্তে সকাল নয়টায় রিসর্ট ছেড়ে বেরিয়ে পরতে হবে কারন ভুমিকম্প ও বৃষ্টির জন্য রাস্তায় ধ্বস নেমেছে। তখনই জানলাম আরিটারে যখন আমরা স্থানীয় দ্রষ্টব্য দর্শনে ব্যস্ত ছিলাম ও গাড়ীতে থাকাকালীন ভূমিকম্প হয় যেটা আমরা গাড়ীর দুলুনিতে টের পাইনি । আজ ১৫ই সেপ্টেম্বর’২০১৮ তারিখ, আমাদের ফেরার দিন, মন খারাপের পালা। আমাদের ফেরার টিকিট আজকের দার্জিলিং মেলে যেটা নিউ জলপাইগুড়ি ষ্টেশন ত্থেকে ছাড়ার সময় রাত্রি আটটায়। সকাল থেকেই বৃষ্টি চলছে, সকালের প্রাতঃরাশ সারার পর গাড়ী যখন ছাড়ল তখন ঘড়িতে দেখলাম নয়টা বেজে কুড়ি মিনিট, বৃষ্টি তখন কমে এসেছে। অল্প রাস্তা চলার পর আবহাওয়া উন্নতি হয়ে যাচ্ছে না, আসলে এটাই পাহাড়ের অপরূপতা। আমার ধারনা ছিল আরিটার থেকে রংপো পর্য্যন্ত পাহাড়ি রাস্তার মধ্যে কোথাও ধ্বস নেমেছে এবং এতক্ষনে রাস্তা নিশ্চয়ই গাড়ী চলার উপযুক্ত করা হয়েছে। আমার ধারনা যে খুব একটা ভুল ছিল এমনটা নয়, কিছু কিছু জায়গায় রাস্তার অবস্থা দেখে সেটাই মনে হলো, তবে একটু সময় লাগলেও রংপো পৌঁছতে খুব একটা অসুবিধা হলো না। রংপো ব্রীজটা পেরিয়ে আমরা পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করলাম। তারপর সেখান থেকে তিস্তার ধার বরাবর রাস্তা মোটামুটি সমতল বলা যায় কারন তিস্তার ধার বরাবর পাহাড় কেটে রাস্তা সমতল করেই তৈরী করা হয়েছে। আমাদের গাড়ী ফাঁকা রাস্তা পেয়ে ভালই দৌড়াচ্ছে, মনে মনে ভাবলাম যাক্‌ ‘আরিটারে’ যা শুনে এসেছি সেই সব ধ্বসের বাধা পেরিয়ে এসেছি। তাই ভাবতে ভাবতে আসছিলাম যে ট্রেন ছাড়ার অনেক আগেই নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে যাব। তখন সময় কাটানোর জন্য কাছাকাছি কোনো হোটেলে একটা ঘর নিয়ে সেখানেই বিশ্রাম নিয়ে ধীরে সুস্থে দার্জিলিং মেল ধরা যাবে। তখন আমরা ভাবতেও পারিনি সামনে আমাদের জন্যে কি বিপদ অপেক্ষা করছে! গাড়ী চলতে চলতে হঠাৎ গাড়ী থেমে গেল, সামনে তাকিয়ে দেখলাম বিশাল গাড়ীর সারি, অনেকটা দূরে করোনেশন ব্রীজ দেখা যাচ্ছে। সামনের দিকে দূরে গাড়ীর নড়াচড়া দেখে একটু আস্বস্ত হলাম, ভাবলাম দেরী হলেও ট্রেন পেতে অসুবিধা হবে না। আমরা জনা ছয়েক গাড়ী থেকে নেমে সামনের দিকে হেঁটে দেখতে গেলাম, চোখের দৃষ্টি যত দূর যায় দেখলাম শুধু গাড়ীর সারি। বেশী দূর যাওয়া ঠিক হবে না ভেবে গাড়ীর দিকে ফিরতে লাগলাম, হঠাৎ একটা চায়ের দোকান চোখে পড়াতে সেখানে এক কাপ করে চা খেয়ে গাড়ীতে এসে বসলাম। গাড়ী কিছু দূর যায় আর থেমে পড়ে, এই ভাবে শম্বুক গতিতে চলতে চলতে তিনটে ধ্বস পেরিয়ে এলাম। সেনা বাহিনীর জওয়ানরা গাড়ী চলার মতো একটু জায়গা করে দেওয়াতে সেইখান দিয়েই আমাদের গাড়ী পার হলো। এক জায়গায় দেখলাম গাড়ী চলার মতো একটু জায়গা বাদে বাকী রাস্তাটাই ধ্বসে গিয়েছে। এমনি করে চলতে চলতে এক জায়গায় গাড়ী দাঁড়িয়ে গেল, অন্যান্য গাড়ীর ড্রাইভারদের থেকে জানা গেল সামনের ধ্বসের জন্য গাড়ী সামনে এগিয়ে যেতে পারবে না আবার পিছিয়ে যাওয়ারও  কোনো উপায় নেই। আমরা গাড়ী থেকে নেমে মাল পত্র নিয়ে হাঁটতে থাকলাম। আমাদের মোট তেরো জনের দলের মধ্যে ‘ঘোষ দম্পতি’ আমাদের সঙ্গ ছেড়ে ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’ এই মহা মন্ত্র জপ করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। বাকী আমরা রইলাম এগারো জন অর্থাৎ আমার পরিবারের চারজন, ভাইঝিরা চারজন, ভাইঝির বন্ধু ছন্দা আর স্বরূপম ও তার স্ত্রী দীপান্বিতা। এই এগারো জন মিলে কেঊ কাউকে ছেড়ে না গিয়ে  পরস্পরকে সহযোগিতা করতে করতে মালপত্র নিয়ে হাঁটতে থাকলাম। পথে স্থানীয় সহযাত্রী ও সেনাবাহিনীর জওয়ানদের অকুন্ঠ সহযোগিতা পেয়েছি। এই ভাবে আরও দুটো ধ্বস পেরিয়ে এলাম। একটা করে ধ্বস পেরোচ্ছি আর ভাবছি এটাই বুঝি শেষ বাধা। এমনি করে সেবক ‘লেভেল ক্রশিং’-এর একটু আগে দেখলাম সেনাবাহিনীর জওয়ানরা ‘এক্সক্যাভেটর’ (এক ধরনের আধুনিক যন্ত্র চালিত ক্রেন যা দিয়ে মাটী কাটা, মাটি সরানো ইত্যাদি কাজ করা হয়) দিয়ে ধ্বসে পড়া পাথর, মাটী, গাছ ইত্যাদি কেটে, সরিয়ে মানুষ চলাচলের উপযোগী রাস্তা করার কাজ করে চলেছে। আরও অনেক লোকজনের সঙ্গে আমরাও সেখানে আটকা পড়ে গেলাম। তখন সন্ধ্যা নেমে আসছে, রাস্তার ধারে ‘গার্ড ওয়াল’-এর ওপর বসে আছি, সামনে উঁচু পাহাড় আর পিছনে খাদ ও তার পরেই তিস্তা আর তার সঙ্গে পাশের গাছ আর ইলেকট্রিক তারে বাঁদরের বাঁদরামি। ভয় হচ্ছে উপর থেকে যদি আবার ধ্বস নামে! এক কথায় প্রাণ হাতে নিয়ে বসে ছিলাম। আমাদের দলের কারোর কাছে এক ফোঁটাও জল নেই, এক জনের কাছে আধা বোতল (৫০০ মি.লি. বোতল) ঠান্ডা পানীয় ছিল, তাই দিয়েই কয়েক জনের গলা ভেজানো গেল। আস্তে আস্তে অন্ধকার নেমে এলো, কিছু পরেই শুনলাম কোন ক্রমে মানুষ চলার মতো রাস্তা করা হয়েছে, তখন ঘন অন্ধকার। আমরা মালপত্র নিয়ে চলতে শুরু করলাম, এই রাস্তার সব চেয়ে কঠিন অংশটুকু সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা আমাদের হাত ধরে ও মালপত্র পার করে দিয়েছেন। আমাদের এই ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা মানুষের এই বিপদে যে ভূমিকা নিয়েছেন, যে রকম সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তা এক কথায় ‘অনবদ্য’ বললেও কম বলা হয়।

ধ্বস পার হওয়ার পরেও অনেকটা রাস্তা হেঁটে ‘সেবক লেভেল ক্রশিং’ পার হয়ে সেবক থানার সামনে এলাম, তখন সন্ধ্যা পৌনে সাতটা। থানার বারান্দায় তিনজন পুলিশ কর্মী বসে নিজেদের মধ্যে গল্প করছিলেন। তাঁদের কাছে আটটার মধ্যে নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছানোর জন্য গাড়ীর পাওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা চাইলাম। তাঁরা তাঁদের দায় এড়িয়ে জানালেন সেই সময় কাছেই সেবক রেল ষ্টেশন থেকে নিউ জলপাইগুড়ি রেল ষ্টেশন পৌঁছানোর জন্য ট্রেন আছে, তারপর স্থানীয় লোকেদের থেকে জানা গেল শেষ ট্রেন চলে গিয়েছে। তখন সেখানে একটা বড় গাড়ীর ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে দেড় হাজার টাকা চুক্তিতে আমরা এগারোজন ‘সেবক চেক পোষ্ট’ পর্য্যন্ত এলাম। সেখানে একটা বড় অটো তিনশো টাকায় এবং একটা ছোট অটো দুইশো টাকায় ভাড়া করে যখন নিউ জলপাইগুড়ি রেল ষ্টেশন পৌঁছলাম তখন ষ্টেশনের ঘড়িতে রাত্রি আটটা বেজে দশ মিনিট, দার্জিলিং মেল তার সময় মতো ঠিক আটটায় ছেড়ে চলে গিয়েছে। আগামী কাল ১৬/০৯/২০১৮ তারিখের সকাল নয়টা পঁয়ত্রিশ মিনিটের ‘হলদিবাড়ী সাপ্তাহিক সুপার ফাস্ট’ ট্রেনের দ্বিতীয় শ্রেনীর চেয়ার কারের টিকিটের ব্যবস্থা হোল। সেই সময় আমিতাভ আর স্বরূপম নিউ জলপাইগুড়ি ষ্টেশনের ‘ষ্টেশন মাষ্টারে’র সঙ্গে দেখা করে টিকিটের দাম ফেরত পাওয়ার স্বার্থে ‘পাহাড়ে ধ্বসের জন্য যে আমরা ট্রেন ধরতে পারিনি’ সেই মোতাবেক শংসা পত্র লিখে দেবার জন্য অনুরোধ করে, কিন্তু যেহেতু এই ‘ধ্বস’-এর জন্য ভারতীয় রেল দায়ী নয় তাই তাঁরা শংসা পত্র লিখে দিতে অস্বীকার করেন। তারপর সেই রাতটা কাটানোর জন্য কাছের একটা হোটেলে সদলবলে ঢুকে পড়লাম ।

এখন যাদের কথা না বললে সত্যের অপলাপ হবে তারা হচ্ছে স্বরূপম ও তার স্ত্রী দীপান্বিতা। ওরা যে আমাদের ভ্রমন করাচ্ছে সেটা সমগ্র ভ্রমনের মধ্যে আমাদেরকে বুঝতে দেয়নি। আমাদের একজন হয়ে সমস্ত সুযোগ সুবিধার দিকে যে ভাবে সতর্ক দৃষ্টি রেখে ভ্রমন করালো সেটা এক কথায় তুলনাহীন। অবশেষে  ১৬/০৯/২০১৮ তারিখে রাত্রি সাড়ে নয়টায় কলকাতা ষ্টেশনে পৌঁছে যে যার বাড়ীর পথে রওনা দিলাম ।