Site icon Sambad Pratikhan

কলকাতা ছাড়িয়ে বনেদি বাড়ির পুজোর সুলুক সন্ধান

Advertisements

আজকের পর্বে হুগলি জেলার অন্যতম প্রাচীন জনপদ, সুপ্রাচীন শহর বৈদ্যবাটি, প্রাচীন কালে যে শহর বিখ্যাত ছিলো তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতিতে, সেই শহরের বাড়ির পুজো হিসেবে দ্বিতীয় প্রাচীন পুজো বলে খ্যাত বৈদ্যবাটি আচার্য্য বাড়ি বা হালদার বাড়ির ৩০২ বছরের পুজোর সম্পর্কে আলোকপাত করলেন দিপান্বীতা দাস

তিন শতক অতিক্রম করে যে পুজো আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল

 দিপান্বীতা দাস: শরতের আগমনে আপামর বাঙালি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকে, কবে আসবে সেই দিন। যেদিন থেকে বঙ্গবাসী মেতে উঠবে মাতৃ আরাধনায়। ঘরের মেয়েকে বরণ করে তাঁর যথোপযুক্ত আরাধনা করতে মুখিয়ে থাকে আবালবৃদ্ধবনিতা। আমাদের রাজ্যের বনেদী বাড়ির পুজোর রীতিনীতি, সংস্কার আজও আমাদের কাছে আকর্ষণের। হুগলি জেলার সুপ্রাচীন শহর বৈদ্যবাটি, প্রাচীন কালে যে শহর বিখ্যাত ছিলো তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতিতে, সেই শহরের বাড়ির পুজো হিসেবে দ্বিতীয় প্রাচীন পুজো বলে খ্যাত বৈদ্যবাটি আচার্য্য বাড়ি বা হালদার বাড়ির ৩০২ বছরের পুজো আজও এলাকার জনগণের কাছে সমান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

অবিশ্বাস্য হলেও এখনও এই বাড়ির পুজোয় সন্ধি পুজোর সময়ে একটি পতঙ্গ (বোলতা বা অন্য যে কোনও একটি পতঙ্গ) কোথা থেকে উড়ে এসে দেবী মায়ের ঠিক বুকের মাঝখানে বসে। আমাদের সন্দিহান মন হয়তো এই কথা বিশ্বাস করবে না। কিন্তু এটাই বাস্তব। কোনও রকম প্রাণী হত্যা বা ছাগ বলি এই বাড়ির পুজোয় দেখতে পাওয়া যায় না। বদলে দেখা যায় পাঁচ রকম সব্জি বলি। বৈদ্যবাটির এই বাড়ির পুজোয় অষ্টমীর দিন হয় কাম্য পুজো। এই পুজোয় স্থানীয় মানুষ যাঁদের মনোবাঞ্চা পূরণ হয় তাঁরা কাপড় অর্পণ করে এই বাড়ির দশভুজাকে আরাধনা করেন বলে জানান এই বাড়ির অন্যতম কর্তা শ্রীরামপুর আদালতের উকিল সুখেন্দু প্রসাদ হালদার।

তিনি তাঁদের বাড়ির ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে গিয়ে জানালেন, কিভাবে শেওড়াফুলির রাজা রাঘব রায়ের আনুকুল্যে তাঁদের পূর্বপুরুষের আগমন ঘটে এই বৈদ্যবাটি শহরে এবং তাঁদের বাড়ির এই সুপ্রাচীন পুজোর সূত্রপাত হয়। আজ থেকে প্রায় ৩৫০ বছর আগে হুগলি জেলার গর্জি গ্রাম থেকে বৈদ্যবাটির ইতিহাস প্রসিদ্ধ গঙ্গার তীরবর্তী নিমাই তীর্থ ঘাটে আসেন কার্তিক শরণ হালদার। এই ঘাট সংলগ্ন এলাকায় একটি শিব মন্দির বানাতে গিয়ে রাজার লোকেরা হিমশিম খাচ্ছে যখন, তখন কার্তিক শরণ হালদার মহাশয়ের কথানুযায়ী এবং অনুরোধে মাটির ১০ ফুট নিচ থেকে কালো বিড়ালের হাড় তুলে ফেলার পরেই বানানো সম্ভব হয় এই এলাকার সুবিখ্যাত রাঘবেশ্বর শিব মন্দির। এরপর রাজা হালদার মহাশয়কে নানাভাবে পরীক্ষা করেন এবং হালদার মহাশয়ের ইচ্ছা মত ঐতিহাসিক নিমাই তীর্থ ঘাটের পাশেই থাকার ব্যবস্থা করে দেন, এবং হালদার বাবুর অনুরোধেই রাজা অনুমতি দেন এই বাড়িতে দুর্গা মায়ের আরাধনার।

সেই থেকে আজও অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই বাড়ির দুর্গাপূজা। যদিও মাঝে বেশ কয়েকটা বছর মাতৃ আরাধনা থেকে বঞ্চিত ছিলেন বৈদ্যবাটির এই হালদার পরিবার। না হলে তাঁদের পুজোর বয়স আরও বেশিই হত। বৈদ্যবাটির এই বাড়ির পুজোয় যাঁকে কুমারী করা হয় তাঁকে অতি অবশ্যই ব্রাহ্মণ কন্যা হতেই হবে এবং ওই কুমারীর বয়স ৬ থেকে ১০ বছরের মধ্যেই হতে হবে। আজও এই একই নিয়মে অনুষ্ঠিত হয় এই বাড়ির কুমারী পুজো।

এছাড়াও বৈদ্যবাটির হালদার পরিবারের পুজয্য তিন দিনের ভোগেও রয়েছে এক অভিনবত্ব। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী এই তিন দিন যথাক্রমে ৭, ৮ ও ৯ রকমের ভোগ নিবেদন করা হয় দেবী দুর্গাকে। দশমীর বিকালে বাড়ির কাছের ঐতিহাসিক নিমাই তীর্থ ঘাটেই গঙ্গা বক্ষে দেবীকে বিসর্জন দিয়ে সেই বছরের মত পুজোর পরিসমাপ্তি ঘটে। অপেক্ষায় থাকেন আগামীতে মায়ের আগমনের জন্য এই পরিবারের সকলে এবং প্রতিবেশীরাও।

 

Exit mobile version