
স্বরূপম চক্রবর্তী: অরুণ দা, সকলের চিরনবীন বুড়ো। সকলকে যিনি এই আদরের নামে ডাকতে ভালোবাসতেন। এই বাংলার সাহিত্য জগতের সকলকে ফাঁকি দিয়ে তিনি আজ অমৃতলোকে। নানা স্মৃতি ভীড় করে আসছে আজ মনের কোনে। মনে পরে, সেইদিনটা, যেদিন প্রথম অরুণ দাকে দেখলাম। আমার সাংবাদিক জীবনের সূত্রপাত যাঁর হাত ধরে যোগাযোগ পত্রিকার সেই সম্পাদক প্রয়াত সমীর ঘোষের পত্রিকা দপ্তরে প্রথম আলাপ। প্রথম আলাপেই আপন করে নিয়েছিলেন। তারপর থেকে শুধুই বুড়ো।
মনে পড়ে যায় রাত ১০ টা নাগাদ চুঁচুড়া স্টেশনের ডাউন প্ল্যাটফর্মের গাছতলায় বসে অরুণ দার সেই বিখ্যাত উক্তি, “পার্টি সদস্য করে মানুষ করে না। ” যে উক্তির জন্য তিনি চক্ষুশুল হয়েছিলেন অনেকের কাছেই তৎকালীন সময়ে। আবার সেই শীতের দুপুরে হুগলির নসিবপুরের কবি সম্মেলনের মঞ্চ ছেড়ে আমাদের মতো কিছু বাউন্ডুলেদের নিয়ে মাঠে গাছতলায় বসে তার সেই বিখ্যাত কবিতা, ” আকাশ থেকে মদ পেড়ে খাই, বাতাস থেকে মদ ছেনে খাই, জল পেয়ে যায় শেকড় বাকড়, নেশা আমার চাকর বাকর, আমি কোনো জঞ্ঝাটে নেই। “
আত্মভোলা এই মানুষটি অকাতরে বিলোতেন তাঁর লেখা। সকলের জন্য তাঁর দরজা ছিল সর্বদা খোলা।
সেই রাতের কথা ভেসে আসছে, যে রাতে আমি অরুণ দা, আর আমার ডাক্তার বন্ধু মৈনাক তিনজনে চন্দননগরের ঐতিহাসিক পানশালা থেকে বেরিয়ে অরুণদার ইচ্ছায় চন্দননগর স্ট্র্যান্ড এর রাণীঘাটে বসে আড্ডা আর সঙ্গে উপরিপাওনা হিসেবে ছিল অরুণ দার উদাত্ত কণ্ঠের গান। তারপর রাত দুপুরে অরুণ দাকে বাড়ি পৌঁছানো।
স্মৃতি বড়ই বেদনাময়। তবুও আজ অরুনের অস্তাচলে তাঁর স্মৃতিচারণ করতে বসে সেই দিনটার কথা না বললে ওনার স্মৃতিচারণ অপূর্ণ থাকবে। যেদিন অরুণ দা আমাকে আমার বৈদ্যবাটির বাড়ি থেকে তুলে হাজির করলেন হাওড়া জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল কুলগাছিয়ার এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। সেদিন আমার জীবনের অন্যতম এক প্রাপ্তি। অরুণদার সঙ্গে এক মঞ্চে।
আবার, প্রয়াত কবি বন্ধু অভির আমন্ত্রণে ওর বাড়িতে রাত্রি যাপন করে পরদিন অভির বাড়ির আমগাছের পাকা আম সহযোগে আমাদের সমবেত সকলের সূরাপান। সেই অভির বিয়ের রাতে হৈ হৈ করে ছোট্ট শিশুর মতো আনন্দ করা মানুষটিই অরুণ কুমার চক্রবর্তী আমার একান্ত বুড়ো বট।
আজও মনে পড়ে, একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে অরুণদার সরাসরি সাক্ষাত্কার অনুষ্ঠান, সঙ্গী এই অধম। আজও মনে পড়ে যায় রবিবারের সকালে দাদার বাড়িতে দাদা, আমি আর মানসদার নির্ভেজাল আড্ডার কথা। সঙ্গে মানসদার খালি গলায় অরুণদার লেখা ‘মন দিলি যৈবন দিলি না….’, ‘ঠিক ঠিক পাখি জানে ….’ গানগুলি।
আবার এক গরমের সন্ধ্যায় অরুণদার বাড়ির ছাদের একদম ওপরে বসে মোমবাতি জ্বালিয়ে কাব্য আলোচনা। সময়ের ও জীবনের জাঁতাকলে জড়িয়ে গিয়ে মাঝে বেশ কিছুদিন যোগাযোগ সম্পুর্ণ বন্ধ ছিল, কিন্তু অন্তরের যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি কোনদিন। আর সেটা হবারও নয়। আজ তুমি নেই, থেকে গেল তোমার সৃষ্টি।
আমার পত্রিকার মান বাড়াতে তুমি নিজে উদ্যোগী হয়ে চালু করেছিলে ‘এ পক্ষের ছড়া’। যেখানে তুমি বলেছিলে,
‘এসো এসো নতুন হাওয়া
এসো জীবনে যৌবনে….
পালাবদল শেষ হয়েছে
চোখ রাখি পরিবর্তনে।’
তুমিই একমাত্র যে চেয়েছিলে রবিঠাকুর কে গ্রামে নিয়ে যেতে, ‘রবি ঠাকুর হে…’ যে কবিতায় সুর লাগিয়ে বাংলা সিনেমা ঋদ্ধ হয়েছে। আজ সকলে তোমাকে চেনে লাল পাহাড়ির স্রষ্টা হিসেবে। আমার কাছে তুমি সেই চিরকালের-চিরনবীন বুড়ো হয়েই থেকে যাবে।
