Site icon Sambad Pratikhan

সিঙ্গাড়ার ইতিহাস

Advertisements

ভোজনরসিক বাঙালির সন্ধ্যের আড্ডায় তেলে ভাজা থাকবেনা তা কী হয়? গরম গরম তেলেভাজা বলতেই যে নামগুলি মাথায় আসে, তার মধ্যে সিঙ্গাড়া অন্যতম। স্বল্পমূল্যের বহুল জনপ্রিয় এই খাবারটির আবিষ্কারের কাহিনির হাল হকিকতে সাংবাদিক আত্রেয়ী দো

সিঙ্গাড়ার জন্মস্থান নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানান  মতভেদ আছে।একদল ইতিহাসবিদের মতে সিঙ্গাড়া শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ফরাসি শব্দ ‘সংবোসাগ’ থেকে। কিছু ইতিহাসবিদ আবার মনে করেন সিঙ্গাড়ার আবির্ভাব হয়েছিল ভারতেই। গজনবী সাম্রাজ্যের সম্রাটের রাজসভায় পরিবেশন করা হত সিঙ্গাড়া। আবার বিখ্যাত ইরানি ইতিহাসবিদ আবুল ফজল বায়হাকির ‘তারিখ- এ- বেহাগি’ বইটিতে ‘সাম্বাসা’-র উল্লেখ আছে। তাঁর মতে সিঙ্গাড়ার জন্মস্থান ইরান।

ইতিহাসবিদদের মতে ভারতে সিঙ্গাড়ার আবির্ভাব হয় প্রায় ২ হাজার বছর আগে। সিঙ্গাড়ার জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ থাকলেও ভারতে আসার পর এর স্বাদের যে আমূল পরিবর্তন হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। প্রথমে সিঙ্গাড়ার মূল উপাদান ছিল মাংসের কিমা, শুকনো বাদাম জাতীয় জিনিস।অনেক ইতিহাসবিদদের মতে নবম শতাব্দীতে পারস্যের লোকেরা যব ও ময়দার তালের সঙ্গে গাজর, মটরশুঁটি, রসুন ও মাংস মেখে সেঁকে খেত। ষোড়শ শতকে পোর্তুগিজদের হাত ধরে ভারতে আলুর পরিচিতি ঘটে। তখন থেকে সিঙ্গাড়ার মধ্যে আলুর পুর ব্যবহার করা হয়।

পরে সিঙ্গাড়াকে আরও সুস্বাদু করার জন্য এতে লঙ্কা এবং আরও বেশ কিছু মশলা যোগ করা হয়। ভারতে সিঙ্গাড়ার আবির্ভাবের কাহিনিটি একটু অন্যরকম।১৭৬৬ সালে কৃষ্ণনগরের রাজা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের উড়িষ্যা থেকে আগত রাজ হালুইকর গুণীনাথ হালুইকরের ষষ্ঠপুত্র গিরিধারী হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী দেবী আবিষ্কার করেন সিঙ্গাড়া।রাজদরবারে লুচি পাঠাতে গিয়ে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল,তাই বারবার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র তা ফেরত পাঠাচ্ছিলেন।তাই হালুইকরমশাই মিষ্টান্ন বানানোর অনুমতি চেয়ে পাঠান।রাজামশাই মধুমেহ রোগে ভুগছিলেন, তাই হালুইকরের প্রস্তাবে তিনি ক্রুদ্ধ হন এবং মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেন।প্রাণভিক্ষার জন্য অনেক অনুনয় বিনয় করলে, মহারাজ হালুইকরকে তিন দিনের মধ্যে দেশত্যাগ করার হুকুম দেন। তিনদিনের দিন সকালে হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী বেহারা রাজদরবারে এসে মহারাজকে জানান যে তিনি এমনভাবে লুচি তরকারি তৈরি করবেন যে কিছুক্ষণ বাদে খেলেও গরম থাকবে। শুধু তাই নয়, এই জাতীয় লুচি তরকারি কিছুক্ষণ বাদে খাওয়াই ভালো, নাহলে জিভ পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

কাঁচা ময়দার তাল থেকে লেচি কেটে লুচি বেলে তার মধ্যে লুচির জন্য বানানো সাধারণ আলুর তরকারি পুর হিসেবে ভরে সমভুজাকৃতি ত্রিভুজের আকারে গড়লেন। তারপর রাজার হুকুম আসতেই ঔ ত্রিভুজাকৃতি জিনিসগুলো ফুটন্ত ঘিয়ে ভেজে মহারাজকে পরিবেশন করা হল।এরকম নতুন ধরনের খাবার দেখে রাজামশাই বিস্মিত হলে, ধরিত্রী দেবী জানান এই খাবারটির নাম ‘সমভুজা’ এবং এটি সম্পূর্ণ মুখে না ঢুকিয়ে এক কামড় দিয়ে দেখতে বলেন সেটি গরম না ঠান্ডা। সেই সমভুজা উদরস্থ করে মহারাজ প্রীত হন এবং হালুইকরের শাস্তি মুকুব করে তাকে পুরস্কৃত করেন। সেই থেকে শুরু হল সিঙ্গাড়ার যাত্রা। রবার্ট ক্লাইভ ভারতীয় খাবার হিসেবে এই সিঙ্গাড়ার স্বাদ আস্বাদন করেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সৌজন্যেই।

শোনা যায় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি, রামপ্রসাদ প্রতি সন্ধ্যায় আহ্নিক সেরে একথালা সিঙ্গাড়া দিয়ে উদরপূর্তি করতেন। ভাষাবিদদের মতে সমভুজা থেকে রূপান্তরিত হয়ে সিঙ্গাড়া শব্দটি এসেছে। সমভুজা>সম্ভোজা>সিভুসা>সিঁঙুরা(নদীয়ার কথ্য ভাষায়)>সিঙ্গাড়া। বর্তমানে নানান স্বাদের সিঙ্গাড়া পাওয়া যায়, যেমন ক্ষীরের সিঙ্গাড়া, মাংসের সিঙ্গাড়া, ফুলকপির সিঙ্গাড়া, পনিরের সিঙ্গাড়া ইত্যাদি। তবুও আলুর পুর ভরা সিঙ্গাড়ার জনপ্রিয়তা অন্যদেরকে হার মানায়।

 

Exit mobile version