বর্তমান সময়

মাতৃদুগ্ধপান কোনও বিকল্প নয়, এটি একটি দায়িত্ব

0214563

বিশ্ব মাতৃদুগ্ধপান সপ্তাহ উপলক্ষে বিশেষ প্রতিবেদন

breastfededing

আত্রেয়ী দো: দ্যা ওয়ার্ল্ড আ্যলায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং আ্যকশন (WABA) প্রতিবছর ১-৭ ই আগস্ট ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধপান সপ্তাহ’ পালন করে। ১৯৯০ সালে সরকার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) , UNICEF এবং অন্যান্য সংস্থার পর্যালোচনায় এই ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধপান সপ্তাহ’ পালনের ঘোষণা করা হয়। ১৯৯২ সাল থেকে এই ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধপান সপ্তাহ’ পালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে প্রায় ১৭০ টি দেশ এই সপ্তাহটি গর্বের সাথে পালন করে। এই অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য হল মাতৃদুগ্ধপানকে সমর্থন করা, প্রতি পালন করা এবং বিস্তৃত করা। এই বছর অনুষ্ঠানের বিষয় ছিল -“Set up for breastfeeding : Educate and Support”. মাতৃদুগ্ধ শিশুদের জন্য সবচেয়ে প্রকৃষ্ট এবং নিরাপদ আহার। শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত পুষ্টিকর উপাদান মাতৃদুগ্ধে সঞ্চিত থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সদ্যোজাত শিশুকে ‘এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং ‘ করানোর পরামর্শ দেয়। শিশুর ৬ মাস বয়স অবধি মাতৃদুগ্ধ ব্যাতিত অন্য কোনো খাবার এমনকি জল পর্যন্ত খাওয়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনো বিশেষ শারীরিক অসুবিধার ক্ষেত্রে ORS দেওয়া যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে। ৬ মাস পর থেকে কমপক্ষে প্রায় ২ বছর বয়স অবধি শিশুদের স্তন্যপান করাতে হবে। তবে, এই সময়টাতে স্তন্যপানের পাশাপাশি অন্যান্য নরম সহজপাচ্য খাবার অল্প অল্প পরিমাণে খাওয়াতে হবে, যতক্ষণ না শিশুর পেট ভরে। মাতৃদুগ্ধের বিভিন্ন স্তর আছে। যেমন –

cooking recipee

১. কোলোস্ট্রাম: শিশুর জন্মের প্রায় ২-৩ দিনের মধ্যে মায়ের স্তনগ্রন্থি থেকে হলুদ বর্ণের একপ্রকার থকথকে দুগ্ধক্ষরণ হয়। একেই কোলোস্ট্রাম বলে। এটি খুব কম পরিমাণে ক্ষরিত হয়, প্রায় ১০-৪০ মিলিলিটার। প্রতি ১০০ মিলিলিটার কোলোস্ট্রামে ৫৮ কিলোক্যালরি এনার্জি (শক্তি) , ২.৭ গ্রাম প্রোটিন, ৫.৩ গ্রাম ল্যাকটোজ, ২.৯ গ্রাম ফ্যাট(স্নেহ পদার্থ), ৩১মাইক্রোগ্রাম ক্যালশিয়াম থাকে। এছাড়াও, এতে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন যেমন ভিটামিন A, C, K, B12 ,বিভিন্ন অ্যান্টিবডি যেমন IgA, IgM, IgG,ল্যাক্টোফেরিন, লিউকোসাইট,ইত্যাদি থাকে যা শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য আবশ্যিক। এটি সাধারণ দুধের থেকে অনেক আলাদা।

২. ট্রান্সিসনাল / পরিবর্তনকালীন দুগ্ধ: কোলোস্ট্রাম ক্ষরণের পর থেকে প্রায় ২সপ্তাহ এই ধরনের দুগ্ধক্ষরণ হয়। এটিও গাঢ়, ক্রিমের মত হয়। এই দুধ পরিমাণে বেশি নির্গত হয়। এর প্রতি লিটারে ৬৭০ কিলোক্যালরি এনার্জি, ৬৯ গ্রাম শর্করা(মূলত ল্যাকটোজ), ১৫ গ্রাম প্রোটিন, ৩৭ গ্রাম ফ্যাট থাকে।

৩. ম্যাচিউর /পরিণত দুগ্ধ: নবজাতক জন্মের প্রায় ১০-১৫ দিন পরে এই ধরনের দুগ্ধক্ষরণ হয়। এটি সাধারণত সাদা, হলদেটে সাদা বা নীলাভ রঙের হয়ে থাকে। এটি সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ক্ষরিত হয় এবং শিশুর তৃষ্ণা নিবারণ করে। এর প্রতি ১০০ মিলিলিটারে ৬০-৭৫ কিলোক্যালরি এনার্জি, ৬.৯-৭.২ % শর্করা, ০.৮-০.৯% প্রোটিন, ৩-৫% ফ্যাট এবং খনিজ পদার্থ (মিনারেলস) পাওয়া যায়। এই ধরনের দুধ ২ প্রকার। যথা-

ফোর মিল্ক– এর মূল উপাদান হল জল, প্রোটিন এবং বিভিন্ন ভিটামিন।

হিন্ড মিল্ক– এতে বিভিন্ন ভিটামিন, প্রচুর পরিমাণে এনার্জি ও ফ্যাট পাওয়া যায়।

lekha

শিশুদের মাতৃদুগ্ধ পানের প্রয়োজনীয়তা:

১. এতে পর্যাপ্ত পরিমাণ TSH (thyroid stimulating hormones) , থাইরক্সিন, প্যারাথাইরয়েড, কর্টিকোস্টেরয়েড, ক্যালসিটোনিন, এরিথ্রপোয়েটিন, অক্সিটোসিন,গ্রোথ হরমোন রিলিজিং ফ্যাক্টর, ইনসুলিন, প্রোল্যাকটিন ইত্যাদি যা শিশুর বিকাশে অপরিহার্য। ২. মাতৃদুগ্ধে বিভিন্ন অ্যান্টিবডি আছে, যেমন: IgA – এই উপাদানটি বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ক্ষতিকারক প্যাথোজেনের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা জোগায়। ম্যাক্রোফাজ-এটি ব্যাকটেরিয়াদের হজম করে নেয়। কমপ্লিমেন্ট নামক এক প্রকার প্রোটিন সিন্থেসিসে সাহায্য করে যা বিভিন্ন সংক্রামক জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। ল্যাক্টোফেরিন-এটি স্ট্যাফাইলোকক্কাস,  E. Coli এর বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। মাতৃদুগ্ধে আছে হজমে সহায়ক বিভিন্ন উৎসেচক, যেমন আ্যমাইলেজ, লিপোপ্রোটিন লাইপেজ, অক্সিডেসেস, ল্যাক্টো পারক্সিডেসেস এবং লিউকোসাইট মায়েলোপারক্সিডেসেস। এই হরমোনগুলি হজমে সাহায্য করে এবং মাইক্রোবসের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে। ৪. মাতৃদুগ্ধে প্যারা অ্যামাইনো বেঞ্জোয়িক অ্যাসিড (PABA) থাকে যা ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া ইত্যাদি অসুখের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। ৫. মাতৃদুগ্ধ পানে মা ও শিশুর মধ্যে বন্ধন অনেক দৃঢ় হয়। ৬. শিশুর মাঁড়ি শক্ত হয়। ৭. কানের প্রদাহ(Otitis) , শ্বাসনালীর সংক্রমণ,হাঁপানি (asthma) ইত্যাদির সম্ভবনা কমে। ৮. শিশুর খাবারের সঠিক মান ও পরিমাণ বজায় থাকে। ৯. খাওয়ারের কোনো প্বার্শ প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভবনা কম। ১০. Sudden Infant Death Synderome / হঠাৎ শিশু মৃত্যুর সম্ভবনা অনেকাংশে কমে। ১১. মাতৃদুগ্ধ সবসময়ই বিশুদ্ধ ও শিশুর জন্য সর্বোত্তম পানীয়। ১২. মাতৃদুগ্ধ হল প্রস্তুতির ঝামেলা ছাড়াই শিশুর জন্য তৈরি পরিপূরক আহার। ১৩. মাতৃদুগ্ধ পুনর্নবীকরণযোগ্য, এতে ভেজাল থাকার কোনো সম্ভবনা নেই। ১৪. এই পদ্ধতিতে শিশুকে সবচেয়ে কম খরচে উৎকৃষ্টমানের আহার দেওয়া সম্ভব হয়।

breastfededing-2

স্তন্যপান করানোর উপযোগীতা :

১. স্তন্যপান একটি অন্যতম জন্মনিরোধক পদ্ধতি ।

২. এটি প্রসব পরবর্তী রক্তপাতের সম্ভবনা কমায় এবং মাসিক প্রক্রিয়া বিলম্বিত করে।

৩. জরায়ুকে পূর্বের মতো স্বাভাবিক আকারে ফিরে যেতে সাহায্য করে।

৪. প্রসবকালীন অতিরিক্ত ওজন কমাতে সাহায্য করে।

৫. স্তনক্যান্সারের সম্ভাবনা কমায়।

৬. প্রসব পরবর্তী মানসিক অবসাদের সম্ভবনা কমায়।

তাই বলা যেতে পারে, মাতৃদুগ্ধপান কেবলমাত্র বিকল্প নয়, শিশু ও মা উভয়ের জন্যই এটি একটি দায়িত্ব।

new-advtHIRINGadvt-2bokhim-advtFinal advtfor-nws1efab-9a4f02_51435a5163204d4c9eb67ab6f3a56a68mv292a03-9a4f02_3b93dab5c7d14f67afae52ceac3ab2d5mv2advt-1advt-3advt-4latest-advt-of-jotish